লোকমান নেই, লোকমান আছেন…

0
67
Print Friendly, PDF & Email

তিনি আর আসবেন না-এটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু এটা মানতে পারছি না যে, তার হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না- বলছিলেন নরসিংদীর প্রয়াত পৌর মেয়র লোকমান হোসেনের স্ত্রী তামান্না নুসরাত বুবলি।
 
২০১১ সালের ১ নভেম্বর দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত তৎকালীন পৌরপিতা লোকমানের স্ত্রী ও পরিবারের কুশল জানতে শুক্রবার তাদের নরসিংদীর বাড়িতে পৌঁছায় বাংলানিউজ। আর নিজের অবস্থা এভাবেই জানান বুবলি।
 
তিনি শোনালেন অনেক আক্ষেপ ও স্বামীর প্রতি তার অটুট ভালোবাসার কাহিনীও।
 
বুবলি বলেন, এখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেখা পাইনি। ইলিয়াস আলীর স্ত্রীর সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন, তাকে তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন। কিন্তু আমার সে নসিব হলো না। আমার কী অপরাধ জানি না। আমার স্বামীতো বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ছিলেন। অথচ তার স্ত্রী হয়ে আমি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
 
প্রধানমন্ত্রীকে অভিভাবক হিসেবে চান বলে জানালেন বুবলি। তিনি বলেন, আমার স্বামী নাই। দু’টি সন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থায় আছি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীই আমার অভিভাবক হতে পারেন। তিনি আমাকে ডাকলে, সান্ত্বনা দিলে সেটাই এলাকার মানুষদের বলতে পারতাম। তাদের জানাতে পারতাম, প্রধানমন্ত্রী আমার মাধ্যমে আপনাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। মেয়র হত্যার বিচার আপনারা পাবেন। এটা এলাকার মানুষদের জন্যও সান্ত্বনার হতো। এখন সেটাও বলতে পারছি না। সেই সুযোগও আমাকে দিল না।
 
বুবলি আরো বলেন, যারা খুনের সঙ্গে জড়িত, তারা শ্বশুরবাড়ির জামাই হিসেবে আপ্যায়ন পায়। নরসিংদীতে তারা খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়ায়। জনপ্রিয় লোকের খুনের বিচারও যদি না হয়, তাহলে এমন ঘটনা আরও বাড়বে। এভাবে অনেকেই প্রাণ হারাবে। এই বিচার খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। ফ্রিজে খাবার যেমন ঠাণ্ডায় জমে যায়, তেমনি এই বিচার কাজও জমে গেছে, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
 
মিডিয়ার প্রসঙ্গেও কথা বলেন বুবলি। তিনি বলেন, মিডিয়া এই দায়িত্বটা নিতে পারে। তারা চাইলে বিষয়টা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনতে পারে। আমি চাই আমার স্বামীর কীর্তি মানুষ জানুক, মানুষই তার বিচার দাবি করবে। আমি মিডিয়ার সাহায্য চাই।
 
লোকমানের গড়ে যাওয়া সাদা বাড়িটি দেখিয়ে বুবলি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই বাড়ি করেছেন আমার স্বামী। তার স্বপ্ন ছিল, নেত্রী একদিন আসবেন। (একটি নির্দিষ্ট রুমের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন) ঐ রুমটিতে বিশ্রাম নেবেন, নামাজ পড়বেন, বই পড়বেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন তার পূরণ হলো না।
 
অবশ্য নির্বাচনের আগে যদি আসতে পারেন তিনি, তাহলে হয়তো আমাদের বাড়িতে আসবেন। আর তা না হলে আমার ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই কখনো প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আসবেন এখানে, যদি আল্লাহ তাকে ততোদিন বাঁচিয়ে রাখেন- এভাবে প্রত্যাশা প্রকাশ করেন বুবলি। 
 
জানালেন, মেয়ে মিফতাহুল জান্নাত নাজাহ’র বয়স সাত বছর, কেজিতে পড়ছে। ছেলে শাহজেব সালফির বয়স সাড়ে তিন বছর, সামনে কিছু সময় পরে স্কুলে ভর্তি করানো হবে।
 
বুবলি স্বামীর স্মৃতি আওড়িয়ে বলেন, তিনি গাড়ি নিয়ে আসতেন, মাকে, আমাকে, নাজাহ, সালফিকে ডাকতেন। সেই ডাকটার অপেক্ষায় থাকি। এখনো গাড়ি আসে। কিন্তু তার ডাক শুনতে পাই না। তার হাসি, মায়াকাড়া চোখ ভুলতে পারি না।
 
স্মরণ করিয়ে দেন, নভেম্বরের ১ তারিখ তার মৃত্যুর ২ বছর পূর্ণ হচ্ছে। তাকে ছাড়া আমার অবস্থা ডানা ছাড়া পাখির মতো, নিজেকে অধিকার ছাড়া মনে হয়। সময়ের সঙ্গে সব বদলায়। কিন্তু যার যার অবস্থান থেকে তাকে মিস করছি আমরা। তার স্বপ্নগুলো আমার হৃদয়ে আছে, সন্তান ও এলাকাবাসীকে নিয়ে তার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করবো। যতোদিন বাঁচি তাকে ভালোবেসে যাব।
 
রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া রাজনীতিতে থাকা সম্ভব হবে না। তাদের সাপোর্ট বড় হলে রাজনীতিতে আসতে পারি। আমার শাশুড়ি বলেছেন, তুমি তোমার স্বামীর জনপ্রিয়তা ধরে রাখবে, বাচ্চারা বড় হলে রাজনীতিতে আসবে।
 
বুবলি একদিনের স্মৃতি স‌মরণ করে বলেন, আমার স্বামীকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার কিছু হলে আমার কী অবস্থা হবে? সে ছিল খালি গায়ে, লুঙ্গি পরা। শুনেই হাসলো, বললো, মানুষ চেয়ার ছেড়ে তোমাকে বসতে দেবে। আমি তেমন কাজই করে যাচ্ছি। সম্মান নিয়ে থাকবে তুমি।
 
বুবলি বলেন, সেদিনের সেই কথাই সত্যি হয়ে গেল আমার জীবনে। তিনি গেলেন, আর দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে সম্মানও পাই আমি।
 
বুবলি দু’টি সন্তানকে কাছে নিয়ে বলেন, অকালে বিধবা হয়েছি। কিন্তু তার স্ত্রী হিসেবে সম্মানের অধিকারী হয়েছি। এক জীবনেতো সব কিছু পাওয়া যায় না- এটাই নিজেকে বুঝাই।
 
যোগ করেন, লোকমানের মতো কেউ হবে না। তিনি সবাইকে আগে সালাম দিতেন। কখনো তাকে আগে কেউ সালাম দিতে পারেনি।

লোকমান তার মেয়ে নাজাহকে চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন বলে জানান বুবলি। তিনি বলেন, গাইনী ডাক্তার হবে, শেখ হাসিনা ও নারায়ণগঞ্জের আইভির মতো রাজনীতিক হবে নাজাহ- এমন স্বপ্নই তিনি দেখতেন। মাঝে মাঝে মেয়ের রাগ দেখে তিনি বলতেন, তুমি তার রাগ লক্ষ্য করেছো, ঠিক শেখ হাসিনার মতো রাগ তার। নেত্রী যেমন ভালো, তেমনি রাগী।
 
নরসিংদী প্রশাসন প্রভাবিত বলেই বিচার পাইনি: কামরুল
কথা হয় নরসিংদীর বর্তমান পৌর মেয়র লোকমানের ভাই মো. কামরুজ্জামান কামরুলের সঙ্গে। ফোনালাপে তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থা আসামি পক্ষ প্রভাবিত করছে। তড়িঘড়ি করে চার্জশিট দিয়েছে। আমদের পুনরায় তদন্তের আবেদন করতে হয়েছে। মামলা নিয়ে যা হয়েছে দেশে তার কোন নজির নেই।
 
দলের নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ আসামিপক্ষকে সহযোগিতা করেছে, আবার কেউ আমাদের সহযোগিতা করেছে- বলেন কামরুল।
 
লোকমান হত্যা মামলার বাদী কামরুল বলেন, নেত্রীর (শেখ হাসিনা) প্রতি আমাদের পুরো আস্থা আছে। আমরা আশা করি, বিচার পাব।
 
ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়া ও নিজের মূল্যায়ণ করে তিনি বলেন, ভাইয়ার মতো তো পারছি না, তবে চেষ্টা করছি, তার অসম্পূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করতে। সবচে আগে তার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। জনগণ অনেক সাহায্য করছেন।
 
মায়ের সবচে প্রিয় সন্তান হারিয়ে তিনি ভালো নেই: শামীম
লোকমানের সর্বকনিষ্ঠ ভাই শামীম নেওয়াজ নরসিংদী জেলা শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, আমাদের বাবার মৃত্যুর পরে তিনিই (লোকমান) ছিলেন বাবা। সব ভাইকে তিনি এক করে রেখেছেন। তিনি মায়ের সবচে প্রিয় সন্তান ছিলেন। মায়ের কষ্ট বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। মা ভালো নেই, শোক ভুলতে পারেননি।
 
কামরুলের কথারই প্রতিধ্বনি করে শামীম বলেন, আমরা নেত্রীর প্রতি আস্থাশীল। তিনি স্বজনহারানোর বেদনা বোঝেন। বিশ্বাস করি, আমরা বিচার পাব। আসামিরা মামলা নস্যাৎ করতে নাটক সাজাচ্ছে। বাদীপক্ষ হয়েও আমরা এটা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছি।
 
তিনি বলেন, আসামিদের জেলে যেতে হয়নি। মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু লোকমান ভাই খুন হওয়ার পরে প্রায় এক বছর নরসিংদীতে ঢুকতে পারেননি। যেদিন আসে, সেদিন নাকি চার হাজার পুলিশ ছিল তার প্রটেকশনে। এলাকায় অঘোষিত কারফিউ ছিল। তিনি সংক্ষিপ্ত একটি সভা করেন, তাতে আসামিরা তার পাশে সহাবস্থান করেছিল।
 
শামীম আবারও বলেন, মামলা নস্যাৎ করতে তাদের ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা অসহায় বোধ করছি। এলাকাবাসীর প্রথম দাবি তাদের মেয়র হত্যার বিচার। আমরা যেমন পিতা হারিয়েছি, এলাকাবাসীও পিতা হারানোর কষ্ট পেয়েছে। কষ্টে, ক্ষোভে আমরা মামলার শুনানি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছি।
 
উল্লেখ্য, নরসিংদী জেলা পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেনকে ২০১১ সালের ১ নভেম্বর সন্ত্রাসীরা গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। লোকমানের বুকে-পেটে ও হাতে গুলি লাগে।
 
সেদিন জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে একটি দলীয় সভা করার সময় এ ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সভা শুরু হলে রাত ৮টার দিকে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। মুখোশধারী ৭/৮ জনের দুর্বৃত্তদল তাকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়।

তার বুকের বামপাশে দু’টি, পেটে দু’টি এবং বামহাতে একটি গুলি লেগেছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান।

এ ঘটনায় নরসিংদী শহরে দোকানপাট বন্ধ করে দেয় এলাকাবাসী। চরম আতঙ্ক বিরাজ করে শহরে। ট্রেনে আগুন, হতাহতের ঘটনায় টানা বেশ কিছুদিন জেলার পরিস্থিতি থাকে অশান্ত ছিলো।

শেয়ার করুন