বকেয়া বেতন পোশাকের উত্পাদন দর বাড়ানোর দাবি : না.গঞ্জ গাজীপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত

0
56
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশ, সাংবাদিক ও শ্রমিক নেতাসহ অর্ধশতাধিক গার্মেন্ট শ্রমিক আহত হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া মোড়ে অবস্থান নিয়ে ফুজি গার্মেন্ট শ্রমিকরা বকেয়া বেতন, অর্জিত ছুটিসহ বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে পিছু হটে শ্রমিকরা।
একইভাবে গাজীপুরে পোশাকের উত্পাদন দর ও হাজীরা বোনাস বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে দুটি গার্মেন্টের শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।
আমার দেশ-এর স্টাফ রিপোর্টার (নারায়ণগঞ্জ) জানান, গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জের ফুজি গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতা, সাংবাদিক ও পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। বিভিন্ন দাবিতে গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হলে পুলিশের সঙ্গে এ সংঘর্ষ হয়।
গতকাল শহরের চাষাঢ়া শহীদ মিনারের সামনে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় পুলিশ-শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ারও ঘটনা ঘটে। ঘটনার প্রতিবাদে বিকালে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে তাত্ক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার জন্য মালিকদের মদতপুষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে দায়ী করেন।
গত ২৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সড়কে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পাশে অবস্থিত ফুজি নিটওয়্যার গার্মেন্ট বন্ধ ঘোষণা করে দেয় মালিকপক্ষ। এর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯০০ শ্রমিককে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি খুলে দেয়ার দাবিতে একটি শ্রমিক সংগঠন আন্দোলন শুরু করে।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান থেকেই শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেয়া শুরু হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী একেকজন শ্রমিক সব সুবিধাসহ প্রায় ৫০ হাজার করে টাকা পান। ৯০০ শ্রমিকের বেশিরভাগই তাদের পাওনা বুঝে নিয়ে চলে যায়।
বেলা ১টায় কিছু শ্রমিক বেতন-ভাতা না নিয়ে প্রতিষ্ঠানের অদূরে চাষাঢ়া শহীদ মিনারে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে তারা শহীদ মিনারের সামনের রাস্তায় শুয়ে পড়ে বিক্ষোভ শুরু করে। ওই সময় ঘটনাস্থলে থাকা শিল্প পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। শ্রমিকরা তাতে রাজি না হওয়ায় পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়।
স্বল্প সময় স্থায়ী সংঘর্ষে জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, হারুন অর রশিদ, অমল আকাশ, অজয় চৌধুরী, নুরুল ইসলাম, জাহিদ সুজন, রাসেল হোসেন, নাজমুল শুভসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক তরিকুল সুজন জানান, পুলিশ বিনা উস্কানিতে শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে বেতন-ভাতা পরিশোধের পরেও কেন কিছু শ্রমিক কী উদ্দেশ্যে রাস্তার ওপর শুয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেছে, সে ব্যাপারে তিনি স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি।
সদর মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের বলেন, বেতন-ভাতা পরিশোধের পরও কেন শ্রমিকরা রাস্তার ওপর শুয়ে পড়ল বিষয়টি আমাদের বোধগম্য নয়। তিনি দাবি করেন, বেশিরভাগ শ্রমিকই তাদের পাওনা বেতন-ভাতা নিয়ে চলে যাওয়ার পর কিছু শ্রমিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
নিট শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র লেবার স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান জিএম ফারুক বলেন, শ্রমিকদের তাদের পাওনা বেতন-ভাতা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। শেষপর্যায়ে গিয়ে এমন ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত।
এদিকে বিকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত তাত্ক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ঘটনার জন্য মালিকপক্ষের মদতপুষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে দায়ী করেন। সেইসঙ্গে তারা ফুজি গার্মেন্টের শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করার জন্য মালিকপক্ষের কাছে আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ, অঞ্জন দাস, তাছলিমা আক্তার প্রমুখ।
গাজীপুরে দুটি কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ, পুলিশের টিয়ারশেল : এদিকে আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে দুটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা পৃথক দাবিতে গতকাল কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে। এ সময় এক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৬ রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়েছে।
শিল্পাঞ্চল পুলিশের (গাজীপুর জোন) সহকারী পুলিশ সুপার মো. মোশারফ হোসেন জানান, গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকার পানিশাইল মাছিহাতা সোয়েটার কারখানা কর্তৃপক্ষ সোমবার শ্রমিকদের জুলাই মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে। কিন্তু ওইদিন শ্রমিকরা মালের (সোয়েটার) উত্পাদন দর ও হাজিরা বোনাস বাড়ানোর দাবি জানায়। কর্তৃপক্ষ এ দাবি মেনে না নেয়ায় গতকাল সকালে শ্রমিকরা কারখানায় এসে কাজে যোগ না দিয়ে সাত দিনের মধ্যে তাদের মালের পিসরেট ও দৈনিক হাজিরা বোনাস বাড়ানো, ওভারটাইম ও নাইটবিল নগদ প্রদান এবং বাইরের লোক দিয়ে কারখানা শ্রমিকদের হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা ক’দিন আগে এক শ্রমিককে মারধর করার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিও জানায়। একপর্যায়ে সকাল পৌনে ১১টায় তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে পার্শ্ববর্তী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে নেমে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। এতে পুলিশ বাধা দিলে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় পুলিশ ১৬ রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। কারখানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে অর্জিত ছুটির (আর্ন লিভ) টাকা পরিশোধ ও শ্রমিক ছাঁটাই না করার দাবিতে গতকাল দুপুরে গাজীপুরে চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকার টিডিএস সোয়েটার কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে।
শিল্প পুলিশের (গাজীপুর জোন) সহকারী পুলিশ সুপার মো. মোশারফ হোসেন জানান, বার্ষিক অর্জিত ছুটির (আর্ন লিভ) টাকা পরিশোধের দাবিতে গাজীপুরে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার টিডিএস সোয়েটার কারখানার শ্রমিকরা গতকাল বেলা ২টায় কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা আন্দোলন করার কারণে শ্রমিক ছাঁটাই না করারও দাবি জানায়। একপর্যায়ে তারা কারখানার পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে ওই মহাসড়কে যানবাহন আটকে পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে মহাসড়ক থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল শুরু করে। এ ঘটনার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ আগামী ২০ অক্টোবর শ্রমিকদের অর্জিত ছুটির টাকা পরিশোধের ও শ্রমিক ছাঁটাই না করার আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা শান্ত হয়।

শেয়ার করুন