প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সঙ্কট বাড়াবে : বিভ্রান্তি তৈরিতে হাসিনা সরকারের জুড়ি নেই – মূসা : প্রধানমন্ত্রী তার ঘোষণা থেকে সরে এসেছেন – আনিস : লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ব্যাহত হবে – ড. ইফতেখার : আওয়ামী লীগ এখন ফাঁদে পড়েছে – মুজাহিদ সেলিম

0
55
Print Friendly, PDF & Email

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সাম্প্রতিক উদ্যোগের পর আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে সমঝোতার যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সোমবারের বক্তব্যে তা অনেকাংশে তিরোহিত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা তো বহু দূরের কথা, সংসদ এবং মন্ত্রিসভা বহাল রেখেই দশম সংসদ নির্বাচন করা হবে বলে সোমবার সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান পাল্টানোর ফলে রাজনীতিতে আবারও হানাহানির আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। রাজনীতিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘোষণায় রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা আরও কমে গেল। তবে তারা বলছেন, এখনই সবকিছু চূড়ান্ত নয়। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নিতে পারে।
প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, নতুন নতুন বিভ্রান্তি তৈরিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের জুড়ি নেই। এই সরকার জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার দ্বারা নির্বাচিত হয়নি (সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়ী হয়)। বর্তমান সরকার যদি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে নাই চায়, তবে নির্বাচনের সময় তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না।
সোমবার সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সময়ে সংবিধানের আলোকে জাতীয় সংসদ বহাল থাকবে। তবে কোনো অধিবেশন হবে না। মন্ত্রিপরিষদ থাকবে তবে এ পরিষদ কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে না।
এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ব্যাহত হবে। তাই দুটি বড় দলের মধ্যে এ নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
গত ২৩ আগস্ট জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতায় আসার জন্য দু নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে জানান, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বিরোধী দলের যে কোনো প্রস্তাবকে তার সরকার স্বাগত জানায়। আগামী সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দল চাইলে কোনো প্রস্তাব দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এই নমনীয় অবস্থানে দেশে আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রধান দুটো দলের মধ্যে সমঝোতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে সেই আশাবাদ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় বলে সরকার সমর্থক পত্রিকার জরিপে তথ্য এলেও আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের জনসমর্থন তলানিতে ঠেকায় কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে দলটি মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বলেছেন, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা ও তার কাছের লোকেরা জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীও তা যেনে গেছেন, তাই তিনি নিজের ইচ্ছামতো নির্বাচন করতে চান।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগে বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া হবে। এখন তিনি সেখান থেকে সরে এসেছেন। তিনি নির্বাচনকালে একটি বহুদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। সেখান থেকেও তিনি সরে এসেছেন।
আওয়ামী লীগের প্রধান শরিক দলের এই নেতা বলেন, এটা যখন দেখি তখন মনে হয় অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে। তবে আনিসুল ইসলামের ধারণা, ভিন্ন কোনো পরিস্থিতিতে সংসদ আহ্বান করা লাগতে পারে, হয়তো সেজন্যই প্রধানমন্ত্রী সংসদ বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে কিনা।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ৬০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন ডাকার আইন রয়েছে। এখন যদি ৯০ দিন সংসদ বহাল রাখা হয়, অথচ অধিবেশন ডাকা না হয়, তবে তাতে ওই আইনটি কি লঙ্ঘিত হবে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বলেছিল, নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা হবে। কিন্তু সংসদ বহাল রাখা হলে বর্তমান সংসদের এমপিরা নির্বাচনে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রটোকলসহ কিছু বাড়তি সুবিধা পাবেন। এতে সবার জন্য সমান সুযোগ আর থাকছে না। তিনি বলেন, আসলে আওয়ামী লীগ এখন একটি ফাঁদে পড়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই মুখোমুখি অবস্থানে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
গণফোরাম সভাপতি ও প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, আল্লাহর কাছে দোয়া করি নির্বাচন নিয়ে দুই নেত্রী যেন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন। কারণ নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে সমঝোতা না হলে দেশে ভয়াবহ সংঘাতের সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, সদিচ্ছা থাকলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান সহজেই সম্ভব। ৪ লাইনের একটি সংশোধনীর মাধ্যমে দুই মিনিটেই নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। দেশের মানুষ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনমতকে প্রাধান্য দেওয়া। দেশের স্বার্থ আমাদের অবশ্যই ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।

শেয়ার করুন