স্বর্ণ পাচারের নিরাপদ রুট শাহজালাল বিমানবন্দর

0
100
Print Friendly, PDF & Email

হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট। দেশি-বিদেশি চক্র এ বিমানবন্দরকে সোনা পাচারের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে মনে করছে। এ রুট দিয়ে তাই প্রায় প্রতিদিনই চোরাচালান হচ্ছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ। বাংলাদেশে পাচারের পর একইভাবে স্বর্ণের একটি বড় অংশ ফের পাচার হয়ে যাচ্ছে পাশর্্ববর্তী দেশ ভারতে। চক্রের মূল হোতারা সিঙ্গাপুর, দুবাই, পাকিস্তান ও ভারতে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে চোরাচালান।

ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্যমতে, ৩০ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছর ২৩০ কেজি স্বর্ণ আটক করা হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। ২০১২ সালে একই বিমানবন্দর থেকে পাঁচ কোটি টাকার সমপরিমাণ ১১ দশমিক ৬৯ কেজি সোনা উদ্ধার করেছিল শুল্ক কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ শুক্রবার আটক করা হয় ১৮ কেজি ওজনের স্বর্ণ। তবে খুঁজে পাওয়া যায়নি কোনো চালানেরই মালিক। নেপথ্যের রাঘব-বোয়ালরা বরাবরই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আজ পর্যন্ত এসব মামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিও হয়নি। বিমানবন্দরে কর্মরত চোরাকারবারিদের সহযোগী যে কয়েকটি চক্র রয়েছে, এর সদস্যদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শুল্ক কর্মকর্তারা বলছেন, সোনা চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিনই। ধরা পড়ছে কালেভদ্রে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), গোয়েন্দা বিভাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও শুল্ক কর্মকর্তারা বলেছেন, সোনা চোরাচালানে সরাসরি জড়িত বিমান ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ৮ থেকে ১০ হাজার জুয়েলারি দোকানে প্রতিদিনই কেনাবেচা হয়ে থাকে ২৫ কোটি টাকার গয়না। এ পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কারের চাহিদা অন্যের গয়না ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলাম থেকে মেটানো সম্ভব নয়। সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের অন্যান্য স্বর্ণের বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশে মূল্যের হেরফের তেমন নেই। সহজে বহন করা যায় বলেই স্বর্ণকে বেছে নেন পাচারকারীরা। আর বাংলাদেশে খাদ মিশিয়ে গয়না তৈরি হওয়ায় বেড়ে যায় লাভের পরিমাণ। এ কারণে স্বর্ণ চোরাচালান এখন লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ভারতে ডলারের বিপরীতে রুপির মান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে সেখানে পাচার হচ্ছে স্বর্ণ। শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনা পাচারের ঘটনার বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তকারী সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুবাইয়ে বসবাসকারী কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি এ দেশে স্বর্ণ পাঠানোর কাজ করে থাকেন। এই পাচারকারী চক্রের লোকজন অবস্থান করে বিভিন্ন দেশে। মূলত সেখান থেকে যাত্রীকে দিয়ে টাকা কিংবা বিমান টিকিটের বিনিময়ে কখনো ফুলদানির ভেতর, কখনো জুতার ভেতর, কখনো কার্বন পেপারে এ দেশে পাচার করা হয় স্বর্ণের বার।

সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে অস্থায়ী ভিত্তিতে যারা কাজ করে থাকেন, এসব স্বর্ণ উড়োজাহাজ থেকে নামানোর কাজ করে থাকেন তারাই। এর পর বোর্ডিং ব্রিজের পাশে টয়লেটে রেখে আসা হয় স্বর্ণ। আরেকটি দলের কাজ টয়লেট থেকে বিমানবন্দরের বাইরে সেগুলো নিয়ে আসা। অন্য একটি দল পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারসহ অন্যান্য স্থানে ক্রেতাদের কাছে পেঁৗছে দেয় এ চালান। পরিশ্রমের টাকাও সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে নেয় তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এপিবিএনের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরাচালানের ঘটনায় বিমানের প্রকৌশলীরা জড়িত বলে তদন্তে পাওয়া গেছে। ওই ঘটনায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করেছিল শুল্ক কর্তৃপক্ষ। ওই স্বর্ণ পাওয়া গিয়েছিল ২৪ জুলাই নেপাল থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের ডিসি-১০ উড়োজাহাজের কার্গো হোলের একটি প্যানেল বঙ্রে ভেতর থেকে। তিনি বলেন, যারা মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করে থাকেন, তাদের পক্ষে ওই প্যানেল বঙ্রে ঢাকনা (শিট) খুলে রাখা সম্ভব নয়। এটি সম্ভব শুধু প্রকৌশলীদের পক্ষে। তবে এখনো ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। ধরাও পড়েনি কেউ। গত ছয় মাসে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে কিংবা বন্দরের ভেতর বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় একাধিকবার বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার করেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এসব ঘটনায় শুধু বিভাগীয় মামলা হয়েছে।

বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘটনা ঘটলে তারা তদন্ত কমিটি করে থাকে। ১২৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায়ও একইভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রধান আহ্বায়ক বিমানের মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) এম এ মোমিন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হচ্ছে। হয়তো আরও কিছু দিন পর জমা দেওয়া হতে পারে প্রতিবেদনটি।

পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বছরের জানুয়ারি মাসে সাত কেজি স্বর্ণসহ ধরা পড়েছিলেন মো. শফিক নামের একজন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(খ) ধারা অনুযায়ী স্বর্ণ চোরাচালানির সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন। কিন্তু শফিক তিন মাস ছয় দিন জেল খেটে বেরিয়ে আবার যুক্ত হয়েছেন চোরাচালানিতে।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র বলছে, জুলাই মাস থেকে স্মরণকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বর্ণ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। আর এ ক্ষেত্রে গোটা বিমানবন্দরই ছিল চোরাচালান চক্রের নিয়ন্ত্রণে। ৮ জুলাই কুয়েত থেকে আনা ২৫ কেজি স্বর্ণের একটি বড় চালান আটক হলেও এ ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি কাস্টমস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া যখন চলছিল, ঠিক তখনই ধরা পড়ে ১২৪ কেজি স্বর্ণ। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ১৩ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিলেন তদন্তকারীরা। ওই ঘটনার পর থেকে ওই গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা এখনো পলাতক। এদিকে ১২৪ কেজি স্বর্ণ পাচারের ঘটনায় বিমানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকতে পারেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। সর্বশেষ শুক্রবার ১৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। সূত্র জানায়, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর সাড়ে ১৩ কেজি স্বর্ণসহ মনোয়ারুল হক নামের একজনকে গ্রেফতার করে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ। তার তথ্যের ভিত্তিতে পুরান ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী দেবু ও সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী আবুল কালামকে গ্রেফতার করে তদন্ত সংস্থা ডিবি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে বিমানবন্দরে কর্মরত জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মাঠ কর্মকর্তা আবদুল আজিজ শাহ, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা অপারেটর রেখা পারভিন, নিরাপত্তা সুপারভাইজার আলো, নিরাপত্তারক্ষী লাভলী, মোতালেব খানসহ উঠে আসে কয়েকজনের নাম। এর পর আজিজ শাহ, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী কবির আহমেদ, মোরশেদ আলম নামের এক চোরাকারবারি ও তার গাড়িচালক হেলাল মিয়াকে গ্রেফতার করে ডিবি। তবে এদের অনেকেই এখনো পলাতক। তবে শাহজালালে কর্মরত এপিবিএনের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এপিবিএনের যে কর্মকর্তা স্বর্ণের চালানটি ধরেছিলেন, তাকে বিমানবন্দর থেকে বদলি করা হয়েছে অন্যত্র। ওই কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার চাপের মুখে। প্রতিটি চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকছেন বিমানবন্দরে কর্মরত কোনো না কোনো সংস্থার কর্মকর্তা বা সদস্যরা। পরে এগুলো ভালোভাবে তদন্তও করতে দেওয়া হয় না।

শেয়ার করুন