ভবিষ্যতের মঞ্চ তৈরিতে জাতিসংঘে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

0
388
Print Friendly, PDF & Email

ভবিষ্যতের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করতে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে বিশ্বের দেড় শতাধিক রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান আসছেন জাতিসংঘ সদর দফতরে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়ে তারা আলোচনা করবেন ২০১৫ সালের পরের করণীয় নিয়ে। এবারের সাধারণ অধিবেশনের মূল স্লোগান ‘পোস্ট ২০১৫ এজেন্ডা: সেটিং দ্য স্টেজ ফর ফিউচার’।

কেমন চলছে সাধারণ অধিবেশনের প্রস্তুতি, এবারের অধিবেশনে কেমন থাকবে বাংলাদেশের অবস্থান ইত্যাদি নিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রতিনিধি দল নিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক পৌঁছাবেন। যদিও সাধারণ অধিবেশনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার শুরু হবে আরো আগে থেকেই। ২৩ সেপ্টেম্বরের মূল সেমিনারটি হবে প্রতিবন্ধী ইস্যুতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অটিজম নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব থাকায় তিনি নিজেও এ বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। তবে ওই সেমিনারটি কোনো সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের না হওয়ায় সেখানে তিনি অংশ নেবেন না। বাংলাদেশ থেকে আসা প্রতিনিধি দলের কেউ কেউ তাতে অংশ নেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তার সফরসঙ্গী হলে তিনিও এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন। এ দিন আরো দুটি গোলটেবিল আলোচনা থাকবে। তার একটি হবে মন্ত্রী পর্যায়ের। ফলে, এতেও অংশ নেবেন না প্রধানমন্ত্রী।

ড. মোমেন জানান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততা শুরু হবে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে। ওই দিন চারটি ইভেন্টে অংশ নেবেন তিনি। সকালেই ব্রেকফাস্ট মিটিং। হোস্ট সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি জন অ্যাশ।

ড. মোমেন জানান, সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে আসা সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরাই কেবল এই ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীকে দরজায় পৌঁছে দিয়ে তার সফরসঙ্গী অন্যমন্ত্রী বা এমপি কিংবা অন্যরা পাশেরই অন্যকক্ষে ব্রেকফাস্ট করবেন। এটি অনেকটা গ্রুমিং সেশন হিসেবে কাজ করবে বলে জানান তিনি।

সকাল ৯টায় সাধারণ অধিবেশনের উদ্বোধনী। এতে বক্তব্য রাখবেন দুই জন। প্রথমেই ব্রাজিলের ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট দিলমা ভানা রুসেফ এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ হিসেবে ব্রাজিল ঐতিহ্যগতভাবেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সুযোগ পায়। এছাড়া ব্রাজিলই প্রথম জাতিসংঘে একজন স্থায়ী প্রতিনিধি রাখার প্রথা চালু করে; যার পথ ধরে এখানে বর্তমানে সব দেশেরই একজন করে স্থায়ী প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

২৪ সেপ্টেম্বরের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের মধ্যাহ্নভোজ। এতেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর সন্ধ্যায় থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সংবর্ধনা। বিশ্বের দেড় শতাধিক সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট ওবামার আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দুটি কর্মসূচিতেই অংশ নেবেন।

এ সময় তিনি অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আরো আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ পাবেন।

এদিকে, অধিবেশন কক্ষে চলতে থাকবে বিতর্ক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান তাদের বক্তব্য শুরু করবেন। পাশাপাশি চলবে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনীতি বিষয়ক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম।

২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় শুরু হবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) নিয়ে অধিবেশন। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ নেবেন। বাংলাদেশের এমডিজি অর্জনে রয়েছে বড় ধরনের সাফল্য। ফলে, এখানে বার বারই উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের কথা। বিকেল তিনটায় শুরু হবে দেড় ঘণ্টার একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক রাজনৈতিক ফোরামের নেতারা এই বৈঠকে অংশ নেবেন।

ড. মোমেন জানান, টেকসই উন্নয়নের আলোচনা রিও ডি জেনেরিও সম্মেলন থেকে শুরু হলেও এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক এটিই প্রথম। ভবিষ্যত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে, আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে কথা বলবেন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা।

তিনি জানান, এবারের অধিবেশনে এই আলোচনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন আয়োজকরা।

২৬ সেপ্টেম্বর রয়েছে নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক আলোচনা। সারাদিন ধরেই এ নিয়ে আলোচনা চলবে।

ড. মোমেন জানান, ২০১২ সালের অধিবেশনেও এমন আলোচনায় একটি অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি গ্রহণের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন সরকার প্রধানরা। এবারের অধিবেশনে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ চুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ড. মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ চায়, বিশ্বব্যাপী যে অস্ত্র ব্যবসা চলছে, তা নিয়ন্ত্রণ করে, অস্ত্রের পেছনে খরচ কমিয়ে সামাজিক ও মানবতাধর্মী কাজে বেশি বেশি ব্যয় করতে বিশ্বের প্রধানশক্তিগুলো এগিয়ে আসুক। অনেক দেশ এরই মধ্যে এই চুক্তিতে সই করেছে। এবার বিশ্বের অনেক দেশ এই চুক্তিতে সই করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।’

২৭ সেপ্টেম্বর বিকেল তিনটা নাগাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতা। অন্যান্য বছরের মতো এবারও বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৮ তারিখ বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির দেওয়া সংবর্ধনায় অংশ নেবেন তিনি। ওই রাতেই ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ছাড়বেন তিনি।

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভাষণে গুরুত্ব পাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য, ২০১৫ সালের পর টেকসই উন্নয়ন, অভিবাসন ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিবন্ধী সমস্যা, শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তির সংস্কৃতি, প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব মডেল, জনগণের ক্ষমতায়ন, নিরস্ত্রীকরণ, পরমাণু শক্তিমুক্ত পৃথিবী, অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন, শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার প্রভৃতি।

ড. মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৭ শতাংশ শুল্ক নেয়। আমরা তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি তুলবো। দোহা রাউন্ড শেষ না হলেও আমরা এটা চাইবো। তাতে বাংলাদেশ লাভবান হবে।’

তিনি জানান, শুল্ক বাবদ প্রতিবছর বাংলাদেশ ৬৮০ মিলিয়ন ডলার দেয় যুক্তরাষ্ট্রকে। এটা বাতিল করার প্রস্তাব থাকবে। এছাড়া ইমিগ্র্যান্টরা যে রেমিট্যান্স পাঠায়, তার ১৪-১৫ শতাংশ ট্রানজিকশন কস্ট হিসেবে কাটে যুক্তরাষ্ট্র। বছরে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স যায়। এর মধ্যে ট্রানজিকশন কস্ট যদি ১০ শতাংশও কমায়, তাহলে ৬০ বিলিয়ন ডলার বেঁচে যায়; যা নিশ্চিত করা গেলে ওডিএ দরকার হবে না। এ বিষয় দুটি জোর দিয়ে বলা হবে।

ডেভেলপমেন্ট পার্টনারদের এ পর্যন্ত দেওয়া অঙ্গীকারগুলো বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তাদের দশমিক ৭ শতাংশ আয় বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এবারও বাংলাদেশ চাপ সৃষ্টি করবে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের মাধ্যমে।

সর্বোপরি, বিশ্বের কাছে সরকারের সাফল্য তুলে ধরা, অভ্যন্তরীণ চলমান বিষয় নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থানও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় তুলে ধরতে পারেন।

অধিবেশন চলাকালে বেশকিছু ছোট ছোট দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ড. মোমেন জানান, বন্ধুপ্রতিম কিছু দেশ এবং কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, সাধারণ অধিবেশন প্রেসিডেন্ট জন অ্যাশের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক হবে।
এ ছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স সাউদ আল ফয়সলসহ অনেকের সঙ্গেই কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এবারের অধিবেশনে অনেকগুলো সাইড ইভেন্ট হবে জানিয়ে ড. মোমেন বলেন, ‘কোন কোন ইভেন্টে বাংলাদেশ যোগ দেবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’

তবে প্রধানমন্ত্রী এবারে খুব বেশি মিটিংয়ে যেতে চাইছেন না বলে জানালেন তিনি।

আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. মোমেন জানান, জাতিসংঘ সদর দফতরের প্রধান ভবনে যেখানে প্রতিবছর সম্মেলন হয়, সেখানে বসছে না এবারের অধিবেশন। ওই ভবনে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে এবং অধিবেশনের সময়ের মধ্যে তা শেষ হচ্ছে না। এ কারণে এবারে একটি মেক-শিফট ব্যবস্থা নিয়েছেন আয়োজকরা। মূল ভবনের পাশে নর্থ লন ভবনে এই মেক-শিফট অধিবেশন কক্ষ বানানো হচ্ছে।

ড. মোমেন জানান, এই মেক-শিফট ভবনে স্পেস খুব কম। ফলে, সেখানে বেশি জনসমাগম সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, ‘মূল ভবনে অধিবেশনের সময় প্রতিটি দেশের জন্য মূল মঞ্চে অন্তত ছয়টি আসন বরাদ্দ থাকতো। এছাড়া ভিআইপিদের জন্য অনেক আসন থাকতো। প্রতিনিধিদলের, সাংবাদিকদের বসার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু, এবারে এ সব কিছুই বাদ দেওয়া হয়েছে। সীমিত সদস্যদেরই এবারের অধিবেশন ভবনে ঢোকার সুযোগ দেওয়া হবে। কোনো গ্যালারিও থাকছে না। ভিআইপিদের বসার জায়গা থাকবে সীমিত। মূলমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীসহ মাত্র চার জনের বসার সুযোগ থাকবে।

মূল ভবনে প্রবেশ পথ রয়েছে অনেক বেশি। কিন্তু মেক-শিফট ভবনে মাত্র চারটি প্রবেশ পথ থাকছে। এটি একটি অস্থির অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে বলেও আশঙ্কা ড. মোমেনের।

এছাড়াও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কিছুটা আশঙ্কার কথা জানান তিনি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভবনের ভেতরে প্রবেশের বিষয়ে তারা চূড়ান্ত কড়াকড়ি করবে। রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজ দেশ থেকে যেসব নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে আসবেন, তাদেরকেও বাইরে অবস্থান করতে হবে।

মূল ভবনে বুলেটপ্রুফ প্যাসেজ দিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের নেওয়া হতো। কিন্তু, এবারে তা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বিকভাবে স্বল্প পরিসরের কারণে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এ বছরের অধিবেশন কিছু সমস্যা মোকাবেলা করবে বলেই ধারণা জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একে আবদুল মোমেনের।

শেয়ার করুন