রাজনৈতিক অবস্থান জানালেন ইউনূস

0
50
Print Friendly, PDF & Email

দেশে অশান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

এর মধ্যে দিয়ে কার্যত নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন গ্রামীণ ব্যাংকের এই সাবেক এমডি, যিনি এর আগে একবার রাজনৈতিক দল গড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে ইউনূস সেন্টারে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রধান কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় আসারও আহ্বান জানিয়েছেন ইউনূস।

বর্তমান সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পর থেকেই তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের শরিকরা।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে ইউনূস ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ফজলে হাসান আবেদ তত্ত্বাবাধয়ক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বললেও নির্বাচনের মাস পাঁচেক বাকি থাকতে গণমাধ্যমের সামনে এই প্রথম বিরোধী দলের ওই দাবির সঙ্গে সহমত জানালেন ইউনূস।

সংবাদ সম্মেলনে কাদের সিদ্দিকীর পাশে বসা ইউনূস বলেন, “রাজনৈতিক কারণে দেশে অশান্তির কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। কারো ইচ্ছার কারণে এ অশান্তি ঘনিয়ে আসলে দেশের মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না।”

দেশের মানুষ অশান্তি চায় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন হতে হবে।”

সংবিধান অনুযায়ী, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে, যা নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি।

দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মুখোমুখী অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে সমঝোতা ও সংলাপের তাগিদ এলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বিরোধী দলীয় নেতাকে আগে সংলাপের জন্য ডাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রোববার সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে জানিয়ে দিয়েছেন সংবিধান থেকে তার সরকার ‘এক চুলও’ নড়বে না। তিনিই নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকবেন কি না- এ প্রশ্নও এড়িয়ে যান শেখ হাসিনা।

বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন তার দল মানবে না। তবে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কি কি করবে সেরকম প্রতিশ্রুতিও তার বিভিন্ন বক্তব্যে আসছে, যাকে প্রকারান্তরে নির্বাচনী প্রচার বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জোরের সঙ্গেই বলছেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপিও নির্বাচনে আসবে বলে তাদের বিশ্বাস।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে প্রধান দুই দলের সমঝোতা হলে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় কেটে যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ‘তথাকথিত সুশীল সমাজের’ রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বড় ধরনের হোঁচট খাবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে সমাঝোতায় আনার উদ্যোগ নেবেন কি না– এমন প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সমাঝোতার কোনো রাস্তা আমার হাতে নেই।”

আরেক প্রশ্নের জবাবে ইউনূস বলেন, আগামীতে যারাই ক্ষমতায় আসুক তাদের ওয়াদা করতে হবে যে ক্ষমতায় আসার পর তারা লুটপাট, দুর্নীতি, গুম বা  হত্যা করবে না।

“ভোটাররা তাদেরকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে যারা কথায় কথায় ধমক দেবে না।”

 

১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইউনূস ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েও পরে পিছিয়ে যান।

সম্প্রতি নাগরিক সমাজের এক প্রতিনিধি নোবেলজয়ী ইউনূসকে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার আহবান জানালেও তিনি নিরুত্তর থাকেন।

বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থীতা বাতিলের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে নির্বাচন কমিশনের আইন সংশোধনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এ আইন সকল রাজনৈতিক দল মেনে নিয়েছে; তাই এ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে পরিবর্তন করার কোনো মানে হয় না।”

আগামী নির্বাচনের পর সবার সঙ্গে আলোচনা করে তা পরিবর্তন করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।

গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের তদন্ত ও তাদের সুপারিশ প্রসঙ্গে সাবেক এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “দুস্কৃতিকারীরা  দেশে একটি অঘটন ঘটাতে চায়। কিন্তু তা ঘটানোর আগেই আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে কোনো অঘটন ঘটানোর ক্ষমতা কারো নাই।”

সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে ভেঙে টুকরো করার পরিকল্পনা করেছে বলে অভিযোগ করে আসছেন ইউনূস, যাকে মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে ২০১১ সালে অব্যাহতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সমঝোতা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের সমালোচনা করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “একজন প্রধানমন্ত্রী কীভাবে বলেন- একচুলও নড়বেন না!”

কোনো রাজনৈতিক নেতা যখন এমন কথা বলেন, তখন তা ‘স্বৈরতন্ত্রকেও’ হার মানায় বলে মন্তব্য করেন এক সময়ের এই আওয়ামী লীগ নেতা।

‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব নয়’ উল্লেখ করে কাদের সিদ্দকী বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াও আগামী জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়।”

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতির ভাষায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রিক দুটি রাজনৈতিক বলয় ‘সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি থেকে’ অনেক দূরে। তাই নির্বাচনে ‘নিরপেক্ষ রেফারি’ দরকার।

গ্রামীণ ব্যাংকের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “দেশে যখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯ টুকরো করার অপচেষ্টা করছে সরকার। আমরা গর্ব করার মতো দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠানের অখণ্ডতার পক্ষে।”

কেবল দেশে নয়, সারা বিশ্বে কেউ ‘গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের অসৎ উদ্দেশ্যকে’ সমর্থন করবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদের মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান,  সহ-সভাপতি নাসরিন সিদ্দিকী এবং ইকবাল সিদ্দিকী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন