বন্ধু চিনতে ভুল যেন না হয়

0
65
Print Friendly, PDF & Email

‘বন্ধু’ শব্দটি শুনলেই আমাদের স্মৃতিতে ভেসে আসে সেই বন্ধুটির কথা, যাকে হয়তো কখনো ভোলার নয়। এমনই স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়ে মাস্টার্স পড়ূয়া কানিজ বলেনÑ ‘আজো আমার বান্ধবী শারমীনকে ভুলতে পারি না। যদিও স্কুল জীবনের পরে তার সাথে আর যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি, সে কোথায় তাও জানি না। তবে আজো মনে পড়ে আমি যখন কাস সিক্সে ক্যাপটেন ছিলাম, তখন স্যাররা কাস নিয়ন্ত্রণের গুরুদায়িত্ব আমাকেই দিত। মাঝে মধ্যে এত ছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের চুপ করিয়ে কাসকে শান্ত রাখা আমার জন্য মুশকিল হয়ে যেত। তাই এক দিন শারমীন বুদ্ধি করে কাসের সবাইকে ব্যস্ত রাখতে পুতুলের অভিনয় শুরু করে। তার অভিনয় এতটাই চমকপ্রদ আর হাস্যকর ছিল যে, সবার দৃষ্টি সেই দিকে, আর আমিও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।’ এ দিকে মিরপুরের রুমানা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমি কখনোই আমার বান্ধবী অ্যানিকে ভুলতে পারি না। অনার্স পড়তে ঢাকায় যখন নতুন আসি, তখন ঢাকার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না, কোনো কিছু কেনাকাটা করতেও ভয় কাজ করত। তবে অ্যানি সেই সময় আমাকে অনেক সাহায্য করে, তার অবদান কখনো ভোলার নয়। উপকার বা অপকারিতা বন্ধুত্ব যেমন জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তেমনি অনেক েেত্র বন্ধু বাছাই করতে গিয়ে আমরা এমন ভুল করে ফেলি যে, ভালো বন্ধুকে নিজের শত্রু আর খারাপ স্বভাবের মানুষকে নিজের মিত্র ভেবে বসি। এমনই মনোভাব ব্যক্ত করে রুমানা বলেন, ‘আমি তিনটি মেয়ের নাম উহ্য রেখে বাস্তব উদাহরণ দেবো। যাদেরকে আমি নিজ চোখে দেখেছি। ফিজা বেশ ধার্মিক ও শালীন মেয়ে। অনার্সের শুরুতেই সে চাইত তার ধারণার সাথে মিলে এমন মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করবে। তাই সে তারই মতো ধ্যান ধারণা শিরিনের মধ্যে পেয়ে তার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়। এ দিকে শিরিনের এলাকার এক মেয়ে মুক্তার সাথে শিরিনের আগে থেকেই বন্ধুত্ব থাকায়, ফিজাও মুক্তার সাথে মিশতে থাকে। তবে কিছু দিনের মধ্যে সে মুক্তার আচরণে সন্দেহজনক প্রভাব ল করে। পরে জানতে পারে এবং নিশ্চিতও হয় যে মুক্তা মূলত বিভিন্ন ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করে, ঘোরাঘুরি করে, সম্পর্ক গড়ে তোলে। মুক্তার এমন অনৈতিক আচরণের কথা শিরিনকে জানায়। তবে শিরিন তার কথায় কান দেয় না বরং ফিজা শিরিনের মধ্যেও পরিবর্তন ল করে। মুক্তার মতে, এসব আধুনিক যুগের স্টাইল যা সে শিরিনকেও বোঝায়। এ দিকে শিরিনের কাছে ফিজার সত্য-সুন্দর কথা ভালো লাগেনি, বরং সেও মুক্তার সাথে একমত হয়।’ দেখা যাচ্ছে, আমরা প্রায়ই বন্ধু নির্বাচনে ভুল করে বসি। ভালো বন্ধুকে নিজের শত্রু মনে করে তাদের পরামর্শকে উপো করি। ফলে আমাদের নির্বুদ্ধিতা, অজ্ঞতাই যেন আমাদের অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। বন্ধু নির্বাচন বন্ধু নির্বাচনের েেত্র বিচণতার পরামর্শ দিয়ে ইডেন কলেজের কামরুন্নেসা বলেন, ‘আসলে বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উল্লেখ করে ইমাম গাজ্জালী রহ: বলেছেন, ‘এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করো যার মধ্যে পাঁচটি গুণ আছে। ১. বুদ্ধিমত্তা, ২. সৎ-স্বভাব, ৩. পাপাচারী না হওয়া, ৪. বিদয়াতি না হওয়া ও ৫. দুনিয়াসক্ত না হওয়া। কারণ যে বুদ্ধিমান হবে সে বিপদে তার বন্ধুকে ভালো উপদেশ দেবে, বিপদ কাটিয়ে ওঠার সুষ্ঠু পরামর্শ দেবে, আর যেহেতু মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাই বন্ধু পাপাচারী না হলে সেও তার বন্ধুকে ভালোর দিকে চলার পরামর্শ দেবে।’ এ দিকে ‘বিদয়াত’ মানেই হলো ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর আবিষ্কার, যা মানবজীবনকে বিশৃঙ্খল করে দেয়। আর সবশেষ দুনিয়াসক্ত বন্ধু সারা দিন দুনিয়ায় কিভাবে শুধু ফায়দা লোটা যায়, সেই চিন্তায় মগ্ন থাকে। ভালো-খারাপের বিবেচনা করবে না, তাই যার মধ্যে ওপরের এই পাঁচটি গুণ আছে তার থেকেই বন্ধুত্ব করা শ্রেয়। তবে এটিও ঠিক, বন্ধুর এমন গুণাগুণ বুঝতে হলে নিজেকেও ভালো গুণের অধিকারী হতে হবে। তা না হলে আমরা ভালোকে খারাপ ভেবে বসব।’ ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব বর্তমানে সহশিা হোক কিংবা কর্মস্থল বা সামাজিক ওয়েব ব্রাউজিংÑ ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। যদিও সমলিঙ্গের বন্ধুত্বের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বন্ধুত্বের পার্থক্য থাকছে। আর নিজের নিরাপত্তার খাতিরেই সেই পার্থক্যটি বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের মধ্যকার বন্ধুত্ব নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মলি বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের মধ্যকার বন্ধুত্ব হোক তবে সেটি নিঃস্বার্থ হতে হবে। আজকাল দেখছি বন্ধুত্ব নামক পবিত্র সম্পর্কটি তেমন থাকছে না, বরং বন্ধুত্বের সেই শৃঙ্খল ভেড়ে পড়ছে।’ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া কিংবা বন্ধুত্বের সম্পর্কটি ভিন্ন মাত্রায় রূপ নেয়ার ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বলেন, ‘একসাথে পড়তে গিয়ে অনেক ছেলের সাথেই কথা হতো, হাসিঠাট্টা হয়। তবে কোনো ছেলেকেই বন্ধুর বেশি মনে করতাম না। একবার কাস টিচার এক প্রজেক্টে গ্রুপ করে দিলেন। এ দিকে আমরা তিন-চারজন মিলে প্রজেক্টের কাজ মোটামুটি সেরেই নিয়েছিলাম, এরই মধ্যে গ্রুপের এক বন্ধু আরো বুঝতে চেয়ে তার মেসে যেতে বলে। আমিও সরল মনে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে তার মেসে গিয়ে উঠি। সেখানে এক ঘণ্টার মতো থেকে কথাবার্তা হলো, পরে বিদায় নিয়ে বাসায় আসার পর দেখি মোবাইলে সে আমাকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। আমি পুরো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। আমার ভুল ছিল তার মেসে যাওয়া, অতিরিক্ত মেলামেশা করা, যা আমি বন্ধু হিসেবে করলেও সে সেটিকে নিয়েছে অন্যভাবে।’ এ দিকে এমন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক নেটওয়ার্কেও। কলেজের এক তরুণী বলেন, ‘আমি ফেসবুকে যখন প্রথম অ্যাকাউন্ট খুলি তখন তেমন ধারণা ছিল না, আর আমার আত্মীয়দের মধ্যে ততটা কেউ ফেসবুকিং করত না। এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে শুনে অ্যাকাউন্ট করি। এ দিকে বিভিন্ন অপরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে আর আমি মোটামুটি প্রায় সবাইকে আমার ফ্রেন্ড লিস্টে গ্রহণ করি। তেমনি ফেসবুকে এক ছেলেকে বন্ধু হিসেবে অ্যাকসেপ্ট করায় প্রথমে সে মেসেজ দিয়ে ‘কেমন আছো’ দিয়ে কথা শুরু করে, পরে ব্যক্তিগত ও অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তাও শুরু হয়। আমার স্ট্যাটাসে তার ব্যঙ্গাত্মক কমেন্ট করাও কেন জানি আমি হালকাভাবেই নেই। পরে সে আমাকে নিয়ে কবিতা বানাতে শুরু করে। এতে আমি নিজেও তার প্রতি কিছুটা আসক্ত হয়ে পড়ি। মনে মনে স্থির করি, ছেলেটি বিয়ের প্রস্তাব দিলে সরাসরি চিন্তা করে দেখব। আমি সেই আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু তা আর হয়নি। বরং এক দিন কথার ধরন পাল্টে আমাকে মেসেজ করে, ‘আপু তোমার কলেজের একটি মেয়ের সাথে আমার বিয়ের কথা চলছে…’ আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কয়েক মাসের মধ্যে তার বিয়েও হয়ে যায়। সে আমার সাথে অন্যায় করেছে, তা তো দেখলামই আর আমার ভুল ছিল যে আমি অপরিচিত এক ছেলের সাথে অতিরিক্ত ফালতু আলাপ করে, তাকে নিয়ে চিন্তা করে, নিজের মূল্যবান আবেগকে নষ্ট করেছি। এ দিকে পরে নেটে তার বন্ধুদের মাধ্যমে জানলাম, সেই ছেলেটার স্বভাবই নাকি এমন। না জানি আমাদের সমাজে বন্ধুত্বের নামে এমন কত ঘটনা লুকিয়ে আছে। তাই বিবিএর শিার্থী ঊর্মী বলেন, ‘আসলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না, যা হয় তা হলো প্রেম’। তবে এ প্রসঙ্গে একটু ভিন্ন মত পোষণ করে মেডিক্যাল পড়ুয়া ইশমাম বলেন, ‘আমি ছেলেমেয়ের মধ্যকার বন্ধুত্বের বিরোধী নই, তবে এই ব্যাপারটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্য আমার সন্তানকে যদি শিা দিতে বলা হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আন্তরিক হওয়ার শিা দেবো এবং তাদের সেই গুণাবলির প্রতি অনুপ্রাণিত করব, যা সে তার জীবনসঙ্গীর মধ্যে দেখতে চায়। আসলে একসাথে কাজ করতে গিয়ে ভালোবেসে ফেলা সমস্যা নয়, বরং যে সময়টা নিজের জীবন গড়ার সময় অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়সে, অসময়ে খারাপ মনোভাবের লোককে ভালোবেসে ফেলা এবং অপকর্ম করে, মা-বাবার অবাধ্য হওয়াই মূলত সমস্যা। যদিও কোনো মা-বাবা তার সন্তানের খারাপ চান না। ভালোই চান। আর ফেসবুকের প্রসঙ্গে বলতে এ েেত্র আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যারা মেসেজ দিয়ে ফালতু কথা বলে তাদের ব্লক করে দেয়া উচিত। আর আমরা যেমন অপরিচিত কোনো মানুষের হুট করে গৃহ প্রবেশকে মেনে নিতে পারি না, তেমনি আমাদের উচিত নয় প্রাইভেট স্ট্যাটাসগুলো পাবলিক করে রাখা, বরং কাস্টম সেটিং করে নিজের পরিচিত ফ্রেন্ডের মধ্যে সীমিত রাখা উচিত। তবে হ্যাঁ, প্রোফেশনাল স্ট্যাটাস সবার সাথেই শেয়ার করা যায়।’ এ দিকে ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্বের প্রতি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে মালিবাগের রাবেয়া বলেন, ‘আসলে মেয়েদের সাথে যত ঘনিষ্ঠভাবে মেশা যায়, নিশ্চয়ই ছেলে বন্ধুর সাথে সেভাবে মেশা ঠিক হবে না। তাই এ ব্যাপারে আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে।’ বন্ধুত্ব সম্পর্কটি বেশ চমৎকার। কিছু কথা থাকে যা শুধু বন্ধুকেই বলা যায়। যদিও আমাদের মধ্যকার নির্বুদ্ধিতা, অবিবেচনাসুলভ আচরণের জন্য আজকাল বন্ধুত্ব হতে আর ভাঙতে সময় নিচ্ছে না, যেমনটি বলেছেন মাস্টার্সের ছাত্রী মিতা। এ দিকে এটিও ঠিক, পরিচর্যা ছাড়া যেমন একটি ছোট চারা ঠিকভাবে বেড়ে ওঠে না, তেমনি বন্ধুত্বেও পরিচর্যা না করলে তা টিকে থাকে না। না, শুধু এক দিন নয়, বরং মাঝে মধ্যে ফোনে কিংবা বাসায় গিয়ে কিংবা পারস্পরিক গিফট দেয়া-নেয়া করলেও বন্ধুত্বের বাঁধনটি মজবুত হয়। যেই শক্তিশালী বাঁধন অসাধ্যকে সাধন করতে সহায়ক। এমনকি একজোট হয়ে নিতে পারে কোনো মহৎ উদ্যোগ।

শেয়ার করুন