ভুয়া সনদে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা ভোগ করে অন্য দেশ

0
41
Print Friendly, PDF & Email

ভুয়া জিএসপি সনদ দিয়ে ভিনদেশি পণ্য বাংলাদেশের নামে রপ্তানি হচ্ছে। আর জিএসপি সুবিধার জন্য এই ভুয়া সনদ দেওয়া হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ার পর এখন ইইউতে এ ধরনের ভুয়া সনদে পণ্য রপ্তানি নতুন হুমকি সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি এড়াতে অনলাইনে জিএসপি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় ইউরোপে জিএসপি বহাল রাখতে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, এরই মধ্যে অনলাইনে জিএসপি সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কারিগরি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কোনো রপ্তানিকারককে জিএসপি সনদের জন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোয় (ইপিবি) ধরনা দিতে হবে না। ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র থেকেই অনলাইনে আবেদন করে এই সনদ সংগ্রহ করতে পারবেন। এর ফলে জিএসপি সনদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠছিল তা বন্ধ হবে বলে মনে করছে সরকার।
জানা গেছে, ভুয়া সনদ দিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) পণ্য রপ্তানির সময় গত চার বছরে বাংলাদেশের ৫৮৩টি অবৈধ রপ্তানি চালান আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহজনক চালান আটক হয়েছে আরও ৭২১টি। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এসব চালান আটক করা হয়। সূত্র জানায়, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে রপ্তানি পণ্যে শতভাগ বিশেষ শুল্ক সুবিধা (জিএসপি) পাচ্ছে। ‘আর্মস বাট এভরিথিং’ সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের অস্ত্র ছাড়া যে কোনো পণ্য রপ্তানিতে কোনো শুল্ক দিতে হয় না। আর এই সুবিধাটি নিচ্ছেন বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। তারা চীন ও শ্রীলঙ্কার মতো যেসব দেশ জিএসপি সুবিধা পায় না সেসব দেশের পণ্য ইপিবি থেকে ভুয়া জিএসপি সনদ নিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে রপ্তানি করছেন। এতে একদিকে যেমন প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতা দেশগুলো, তেমনি হুমকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা। সূত্র আরও জানায়, ভুয়া জিএসপি সনদে ভিনদেশি পণ্য রপ্তানির অভিযোগ ওঠার পর ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে তদন্তে আসছে ইউরোপিয়ান এন্টি-ফ্রট অফিস বা ওএলএএফ। মূলত বাংলাদেশ থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশের বিপরীতে জারিকৃত জিএসপি সনদের সত্যতা এবং সন্দেহজনক রপ্তানি কার্যক্রম নিয়ে ওই টিম তদন্ত করে। ওই তদন্তে বাংলাদেশের জিএসপি সনদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনিয়মের প্রমাণ পায় সংশ্লিষ্ট টিম। জিএসপি সনদ নিয়ে অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করতে চলতি বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশকে চিঠি দেয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। এদিকে, জিএসপি সনদ নিয়ে অনিয়ম বন্ধ করতে ইপিবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ‘এন্টি ফ্রট’ কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির সুপারিশে অনিয়ম বন্ধে অনলাইনে জিএসপি সনদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জিএসপি সনদ অনলাইনে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, এর ফলে এটি নিয়ে এত দিন যে অনিয়ম, জালিয়াতি হয়েছে তা বন্ধ হবে। তিনি বলেন, ইপিবির একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ভুয়া সনদ দিয়ে ভিনদেশের পণ্য বাংলাদেশের নামে রপ্তানি করতে সহায়তা করেছেন। ফলে ইইউতে জিএসপি সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সময় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রসঙ্গত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশ বাংলাদেশকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কসুবিধা দিচ্ছে। ওই সুবিধার আওতায় ইইউভুক্ত ২৭টি দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে জিএসপি সনদ ইপিবি থেকে ইস্যু করা হচ্ছে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, জাপান, রাশিয়া, তুরস্ক, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, বেলারুশ ও কানাডা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কসুবিধা দেয়। তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে এই দেশগুলোয় জিএসপি সনদ ইস্যু করা হয়। ইইউতে পোশাক রপ্তানির বিপরীতে ২০১২ সালে ইপিবি থেকে মোট ২ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭টি জিএসপি সনদ ইস্যু করা হয় বলে জানা গেছে।

শেয়ার করুন