ঐশীসহ তিনজন রিমান্ডে : দুই বন্ধুকে খুঁজছে পুলিশ

0
53
Print Friendly, PDF & Email

নিজস্ব ও আদালত প্রতিবেদক: জন্মদাতা মা-বাবাকে কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি বিপথগামী ঐশী, বাসার মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করতে সে পেশাদার ডাকাতের মতোই আলমারি খুলতে মায়ের কোমরের চাবির গোছা কাটতে রান্নাঘর থেকে বঁটি এনেছিল। পরিকল্পিতভাবে পরপর দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সে প্রায় এক লাখ টাকা ও মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়। পুলিশের ধারণা, এ ঘটনার সঙ্গে তার অন্ধকার জগতের একাধিক সঙ্গী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। এ রহস্য উদ্ঘাটনে গতকাল ঐশীসহ তিনজনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পল্টন থানার মামলাটি ডিবি পুলিশের সহায়তায় তদন্ত চলছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যায় ঐশী। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিজ হাতে হত্যাকারী সে। ‘ডিস্কো’ বারে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। আসক্ত ছিল ইয়াবা ও গাঁজায়। রাত করে ঘরে ফেরা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। তার এই অন্ধকার জগতের সহযোগী ছিল কয়েকজন বখাটে বন্ধু। এর মধ্যে মিজানুর রহমান রনি নামে এক বন্ধুকে শনিবারই গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গতকাল আটক করা হয়েছে তার আরেক বন্ধু পারভেজকে। এছাড়া মাদক ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের আরও দুই সঙ্গী জনি ও অন্য একজনকে খুঁজছে গোয়েন্দা পুলিশ।
এদিকে গতকাল ঐশী, তাদের গৃহকর্মী খাদিজা খাতুন সুমি ও বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে আদালতে সোপর্দ করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। ঐশীর পক্ষে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন করা হলে আদালত তা নাকচ করে দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, মেয়েটির অনেক বখাটে বন্ধুবান্ধব ছিল। বখাটে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সে নিজেও বখে হয়ে যায়। এই বখাটেপনা থেকে ফিরিয়ে আনতে মা-বাবা তাকে বাসা থেকে একা বের হতে দিত না। এ কারণেই মা-বাবার প্রতি ক্ষোভ ছিল তার। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই তাদের হত্যা করে সে।
মনিরুল ইসলাম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মতে, ঐশী নিজেই তার মা-বাবাকে হত্যা করেছে। উদ্ধার করা ছুরিটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত হয়েছে। আর আলমারি খুলতে মায়ের কোমরের চাবির গোছা কাটতে রান্নাঘর থেকে বঁটি এনেছিল সে। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার বন্ধুদের কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্য কারও সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পড়ার সময় বছরদুয়েক আগে থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে ঐশী। তখন থেকেই বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে সে। এর আগে জনি নামে এক তরুণের সঙ্গে ঐশীর পরিচয় হয়। জনির মাধ্যমে পরিচয় হয় পুরান ঢাকার ডিজে ও ড্যান্সার তরুণ রনির সঙ্গে। এই দু’জনের সঙ্গে ঐশী নিয়মিত ডিজে পার্টিতে অংশ নেওয়া ও মাদক সেবন শুরু করে। ২০১১ সালে তাকে ভর্তি করা হয় অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। সেখানে পরিচয় হয় পারভেজ ও অপর এক তরুণের সঙ্গে। তারা সবাই মিলে যৌথ আড্ডায় মিলিত হতো। আড্ডায় নিয়মিত চলত ইয়াবা ও গাঁজা সেবন। প্রথম দিকে ঐশীর মা-বাবা বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঐশীর মা-বাবা তার বেপরোয়া জীবনযাপন, রাত করে ঘরে ফেরা-এসব নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য তার চলাফেরায় বিধি-নিষেধ আরোপ করেন। এটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় মা-বাবার জন্য। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর মাদক সেবন করতে না পেরে ছটফট করতে থাকে ঐশী। এ সময়ই সে মা-বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
ঊর্ধ্বতন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বাসায় এক ধরনের বন্দি থাকলেও ঐশীর মোবাইল চালু ছিল। সে মোবাইলে নিয়মিত বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে ঐশীর বন্ধুদের কেউ কেউ জড়িত রয়েছে। এজন্য তার বন্ধুদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে ঐশীর সঙ্গে তার একাধিক বন্ধুর ঘন ঘন যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের কোনো পর্যায়ে বন্ধুদের কারও অংশগ্রহণ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাঁচ দিনের রিমান্ড : গতকাল দুপুরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ঐশী রহমান, গৃহকর্মী খাদিজা খাতুন ওরফে সুমি ও ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান ওরফে রনির ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহীদুল্লাহ প্রধান রিমান্ড আবেদনে হত্যাকাণ্ডে ঐশীর সঙ্গে আর কেউ যুক্ত ছিল কি না তা জানার জন্য ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ঐশী ও রনির আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের প্রার্থনা করেন। শুনানি শেষে মুখ্য মহানগর হাকিম মিজানুর রহমান জামিনের আবেদন নাকচ করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে শুনানি শুরুর আগে কালো বোরখা ও মেরুন চাদর পরিহিত ঐশী এজলাসে দাঁড়িয়ে বলে, ‘মা-বাবার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। আমার হাঁপানি আছে।’ এ সময় ঐশীকে ঘৃণাভরে এক নজর দেখার জন্য সাধারণ মানুষ, বিচারপ্রার্থী, আদালতের কর্মচারী, পুলিশ ও আইনজীবীরা ভিড় করেন। অনেকেই এ সময় নানা মন্তব্য করেন এবং তার দিকে থুথু মারেন। রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঐশী মাদকাসক্ত ছিল। মাদকাসক্ত বন্ধু-বান্ধরা মিলেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাদের সবার পরিচয় জানতে এবং হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাহাবুব হাসান রানা, চৌধুরী মোহাম্মদ গালিব রাকিব ও রেজাউর রহমান টিঙ্কু আদালতকে বলেন, ঐশী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে। সে নাবালিকা এ অবস্থায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই শুনানি স্থগিত রেখে তাকে কিশোর আদালতে নেওয়া হোক। আর জিজ্ঞাসাদের প্রয়োজন হলে তাকে কারা ফটকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। শুনানিতে তারা আরও বলেন, যে পরিবার ও সমাজ ঐশীদের তৈরি করে তাদের বিচার হওয়া দরকার।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়ে সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) এসআই গফফারুল আলম আদালতকে বলেন, ঐশী তার মা-বাবাকে বন্ধুদের সহযোগিতায় হত্যা করেছে মর্মে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডে তার আর কোনো বন্ধু অংশ নিয়েছিল কি না এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
ঐশীর বিচার হবে কোন আদালতে : মা-বাবাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিজ হাতে ছুরিকাঘাত ও জবাই করে হত্যাকারী ঐশীর বিচার প্রক্রিয়া এবং রিমান্ড নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ধানমণ্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ও-লেভেলপড়ুয়া ঐশীর বয়স আঠার বছরের নিচে বলে ধারণা করছেন সবাই। এ কারণে তাকে কিশোর আদালতে ও কিশোর সংশোধনাগারে না পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঐশী ও গৃহকর্মী সুমিকে আনুমানিক ১৮ বছর বয়স হিসেবে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, ঐশীর জন্ম হয়েছে ১৯৯৬ সালে। সে অনুযায়ী তার বয়স ১৮ বছর ছুঁই ছুঁই। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, বয়স বিবেচনায় নিয়েই ঐশী ও গৃহকর্মী সুমিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এদিকে গতকাল দিনভর কন্যার হাতে মা-বাবার খুন হওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই ঐশীকে ‘সাইকো’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তবে কেউ কেউ ঐশীর একার পক্ষে হত্যাকাণ্ড ঘটানো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এসবিতে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ তাদের ২নং চামেলীবাগের বাসার ৫/বি ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ছোট ভাই ঐহি ও গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় নিহত দম্পতির বড় মেয়ে ঐশী। দু’দিন নিখোঁজ থাকার পর গত শনিবার দুপুরে ঐশী নিজেই পল্টন থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেয়। আটকের পর ঐশী নিজেই তার মা-বাবাকে হত্যার কথা স্বীকার করে।
এদিকে মাহফুজের এতিম ছেলে ঐহি ঢাকায় তার খালার বাসায় আছে। তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। তাকে নিয়েই এখন স্বজনদের যত উদ্বেগ।
গতকাল ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের মরাগাঙ্কান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে দম্পতির লাশ দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

শেয়ার করুন