উচ্চশিক্ষা হবে মাতৃভাষায়

0
93
Print Friendly, PDF & Email

মাধ্যমিক অর্থাৎ দ্বাদশ শ্রেণি শেষে উচ্চশিক্ষা স্তর শুরু হবে। সাধারণ শিক্ষা ক্ষেত্রে স্নাতক, মাদ্রাসায় ফাজিল, চিকিৎসা শিক্ষায় এমবিবিএস, প্রকৌশল শিক্ষায় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অন্যান্য শিক্ষার ক্ষেত্রে স্নাতক বা তদূর্ধ্ব সমমানের অন্য কোনো ডিগ্রি। সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হবে।
উচ্চশিক্ষা হবে মাতৃভাষায়। তবে উচ্চশিক্ষায় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজির ব্যবহার অব্যাহত থাকবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় রচিত রেফারেন্স বই বাংলায় অনুবাদ করার জন্য জাতীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্নাতক পর্যায়ের সব কোর্সে বাধ্যতামূলকভাবে ১০০ নাম্বারের ইংরেজি পড়তে হবে। এমন বিধান রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ‘শিক্ষা আইন-২০১৩’-এর খসড়া। জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই আইন প্রণয়ন করছে। এই খসড়ার ওপর সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সব স্তরের মানুষের মতামত, সুপারিশ, পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে দেশে বর্তমানে চালু থাকা উচ্চ মাধ্যমিক (একাদশ-দ্বাদশ) স্তরকে বাদ দেয়া হয়েছে। আইনে শিক্ষায় তিনটি স্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে_ প্রাথমিক স্তর (প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি), চার বছর মেয়াদি মাধ্যমিক স্তর (নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি) এবং তৃতীয়টি হবে উচ্চশিক্ষা। এ প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষা স্তরের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক ও চার বছর মেয়াদি মাধ্যমিক স্তরের প্রস্তাব প্রকাশিত হয়েছে।
৬৫টি ধারা সংবলিত ২৫ পৃষ্ঠার খসড়া আইনে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিবন্ধন ও পাঠদানের অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করাসহ দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদ- অথবা এক বছরের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করা হবে। শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্ধারণ করতে হবে। বেতন ও অন্যান্য ফি যৌক্তিক হারে নির্ধারণ করার জন্য সরকার একটি রেগুলেটরি কমিশন গঠন করবে। এ আইন ভঙ্গকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদ- অথবা এক বছরের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করা হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলাদেশে কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার বা টিউটোরিয়ার কেন্দ্র পরিচালনা করা যাবে না। অন্যথায় অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে। একই সঙ্গে অপরাধী ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর কারাদ- অথবা দশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- অথবা উভয় দ- দেয়া হবে।
খসড়া আইনে আরো বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ খোলা বাধ্যতামূলক করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির জন্য দেশে এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক মানের তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হবে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানে স্বল্প মেয়াদি ইন্টার্নশিপ করতে হবে।
আইন শিক্ষায় সাধারণ এলএলবি কোর্সের মেয়াদ দুই বছরের পরিবর্তে হবে তিন বছর। আইন শিক্ষায় মাস্টার্স কোর্সের মেয়াদ হবে দুই বছর। পর্যায়ক্রমে তিন বছরের এলএলবি কোর্সের পরিবর্তে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চার বছর মেয়াদি এলএলবি অনার্স ডিগ্রি কোর্স চালু করা হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইন বিষয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি থাকবে। আইন কলেজে সন্ধ্যাকালীন শিক্ষা কার্যক্রমের পরিবর্তে পূর্ণকালীন শিক্ষা চালু এবং কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ নিয়মিত ও পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণার জন্য দেশে ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ স্থাপন করা হবে। আইন কলেজের মান নিশ্চিত করতে বার কাউন্সিল ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করা হবে।
প্রকৌশল শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, দক্ষ প্রকৌশলী সৃষ্টির লক্ষ্যে পাবলিক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তজার্তিক মানে উন্নীতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজনে একাধিক শিফটে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হবে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এবং কারিগরি ডিপ্লোমা উত্তীর্ণদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল, কৃষি ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে ক্রেডিট সমন্বয় ও ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে। প্রকৌশল শিক্ষার উন্নয়নে চেম্বার অব কমার্স, চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ এমপ্লয়েজ ফেডারেশন এবং সেবা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা হবে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি, রসায়ন, বস্ত্র, পাট, চামড়া, সিরামিক ও গ্যাস শিল্পে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে উপযুক্ত প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন নতুন অনুষদ চালু করা হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষা আইনে বলা হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষায় সাধারণ ধারার অনুরূপ চার বছর মেয়াদি ফাজিল অনার্স এবং এক বছর মেয়াদি কামিল কোর্স চালু করা হবে। ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে শিক্ষাক্রম অনুমোদন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি ও পরীবিক্ষণ এবং পরীক্ষা পরিচালনার জন্য দেশে একটি এফিলিয়েটিং ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
আইনে চিকিৎসা শিক্ষা ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মেডিকেল কলেজের মান যাচাই ও নতুন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদনে দেশে ‘মেডিকেল অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ গঠন করা হবে। স্বাস্থ্য সেবার আধুনিকায়নে দেশের মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেক্ট্রোমেডিকেল ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়ো ফিজিক্স, মেডিকেল ইনফরমেশন সায়েন্স, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি এবং ফিজিওথেরাপিসহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমসাময়িক ফলিত বিষয় অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হবে। নার্সিং কলেজে বিএসসি ও এমএসসি নার্সিং কোর্স খোলা হবে। সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে নার্সিং ও প্যারামেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করা হবে। আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত হোমিওপ্যাথিক, ইউনানি এবং আয়ুর্বেদী চিকিৎসা ব্যবস্থারও উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
কৃষি শিক্ষার আধুনিকায়নে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশ বিজ্ঞান, জৈব প্রযুক্তি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, সম্পদ অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা, ভূমিস্বত্ব ও ব্যবস্থাপনা, পুষ্টি বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে নতুন নতুন কোর্স সংযোজন করা হবে। উচ্চতর কৃষি শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নয়নের জন্য কৃষি শিক্ষাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে।
আইনে বলা হয়েছে, চার বছরের স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রিকে উচ্চশিক্ষার স্তরে শিক্ষকতা পেশায় নূ্যনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রয়োজন হবে। স্বায়ত্তশাসিত বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে যোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারবে।

শেয়ার করুন