সরকারের সাফল্য বর্ণনা করে রাজধানী জুড়ে টাঙানো বিলবোর্ডগুলো প্রচ- সমালোচনার মুখে সরিয়ে ফেলা শুরু হয়েছে। ঈদের আগে উন্নয়ন কর্মকা-ের ফিরিস্তি তুলে ধরে বিভিন্ন সড়কে সেগুলো টাঙানোয় নজিরবিহীনভাবে রাতারাতি ঢাকা নগরীর বিলবোর্ডগুলো দখল হয়ে যায়। প্রায় ২শ’ বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রায় ২ হাজার বিলবোর্ড সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের বিবরণে ছেয়ে গেলেও কারা এসব প্রচার করেছে, বিলবোর্ডগুলোতে তার কোন তথ্য নেই। মহানগরীর প্রায় ৮৫ ভাগ বিলবোর্ডে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের উপর এগুলো টাঙানো হওয়ায় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপর বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এজেন্ডা বহির্ভূত আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড থেকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের বিজ্ঞাপন অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে রাজধানীজুড়ে সরকারের সাফল্যগাথা সংবলিত বিলবোর্ড আগামী নির্বাচন পর্যন্ত বহাল রাখার পক্ষে একাধিক মন্ত্রী দাবী জানালেও তা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে সরকারের সাড়ে চার বছরের সাফল্যচিত্রসূচক নজিরবিহীন এই প্রচারণা নিয়ে মিডিয়াসহ নানা মহলের সমালোচনার কারণে এগুলো সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যে ক’দিন বিলবোর্ড ছিল, বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকে সে ক’দিনের ভাড়া দিয়ে দেয়া হবে বলেও খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের সাফল্য প্রচারের এই কৌশলে নতুনত্ব থাকলেও উন্নয়ন কর্মকা-ের যে বিবরণ দেয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত জনগণের। এ ব্যাপারে এই মুহূর্তে কিছু বলার নেই। তবে তথ্যগত ভ্রান্তি বা মারপ্যাঁচ যা-ই বলা হোক, তেমন কিছু থাকলে মানুষ বিভ্রান্ত হবে এবং ফলাফলও ইতিবাচক হবে, এমন মনে করা যায় না। এছাড়া যে প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রচারণার এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা না করে অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটা হতে পারত। তা করলে সরকার ও সরকারী দলের ভাবমর্যাদার দিক দিয়ে শোভন হত এবং জনগণের কাছে এই প্রচারণার গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেত। এছাড়া বিজ্ঞাপনী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এজন্য অনাকাক্সিক্ষত ক্ষয়ক্ষতিতে পড়তে হত না। উল্লেখ্য, মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গক্রমে এ মন্তব্য করেছেন যে, মন্ত্রণালয়গুলো স্ব স্ব উদ্যোগে পৃথকভাবে বিলবোর্ড ভাড়া নিয়ে যথাযথ নিয়মে তাদের প্রচার চালাতে পারে। শুধু রাজধানী নয়, বিভাগ ও জেলা শহরের আকর্ষণীয় জায়গাগুলোতে বিলবোর্ড দেয়া যেতে পারে। সন্দেহ নেই, এটাই এক্ষেত্রে হতে পারে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া। যাহোক, শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্যগাথা প্রচারের নিয়ম-প্রক্রিয়া সম্পর্কে বোধোদয় ঘটেছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রচারণায় রাজধানীতে বিলবোর্ডে যা বিজ্ঞাপিত হয়েছে, তার কোন কোন বিষয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রচারণাকালে সেসব সংশোধিত হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কোন মারপ্যাঁচ বা কৌশল কাক্সিক্ষত নয়। কেননা তাতে এ প্রচারণায় যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তা বিপরীত ফলই বয়ে আনতে পারে।
দেশে বিলবোর্ড সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ আইন-বিধি না থাকায় এবং যতটুকুও বা আছে, তা-ও বাস্তবে মানা না হওয়ায় এবং এক্ষেত্রে খবরদারি বা জবাবদিহিতা না থাকায় রাজধানীসহ সারাদেশে অসংখ্য অবৈধ বিলবোর্ড প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আড়াল ও সড়কপথে যানবাহন চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন বিলবোর্ডের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। ইতিপূর্বে হাইকোর্টও অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ছাড়াও দেশের বড় শহর ও জেলা শহরগুলোতেও অবৈধ বিলবোর্ডে কোন না কোনভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে থাকা এক শ্রেণীর লোকের নামে নানা উপলক্ষে নিজস্ব সচিত্র শ্লোগানাদি প্রচার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় সন্ত্রাসী-খুনি-মাস্তানরাও এক সময় নেতা-কর্মী হয়ে উঠছে। ডিজিটাল বিলবোর্ডের প্রচারণায় দুর্জনের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া লাভের এই প্রক্রিয়া যেমন গণতন্ত্রসম্মত নয়, তেমনি সমাজ ও দেশের রাজনীতির জন্যও নিঃসন্দেহে চরম অশুভ। এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় লাভকারী সন্ত্রাসী, দুর্জন ব্যক্তিরা যে সংশ্লিষ্ট দলের কাঁধে অনিবার্য বান্ধব হয়ে উঠে চরম দায় চাপিয়ে দেয়, এটাও এখন আর বিশদ বলার অপেক্ষা রাখে না। শীর্ষ রাজনীতিবিদদেরও এব্যাপারে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। সারাদেশে এ ধরনের যেসব বিলবোর্ড রয়েছে, সেসবও সরকারী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত অপসারণ করতে হবে। নানা ছলছুঁতায় নিছক ব্যক্তিকেন্দ্রিক অযৌক্তিক প্রচারণা যাতে বিলবোর্ডে স্থান পেতে না পারে, সেজন্য উপযুক্ত নজরদারিমূলক স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।






