বেতনের চার-পাঁচ গুণ অর্থ ওভারটাইম তুলছেন ৩০০০ কর্মচারী

0
80
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা ওয়াসার প্রায় ৩ হাজার কর্মচারী বেতনের দ্বিগুণ, তিন গুণ বা চার গুণ অর্থ ওভারটাইম হিসেবে নিচ্ছেন বছরের পর বছর। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজ না করেও তারা ওভারটাইম তুলছেন বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। নভেম্বর থেকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এসব কর্মচারীর প্রতি মাসের ওভারটাইম নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কাজ করুক আর নাই করুক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ওভারটাইম হিসেবে মাস শেষে ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। প্রতি মাসে ওভারটাইম বাবদ ঢাকা ওয়াসার ব্যয় হচ্ছে অন্তত ৫ কোটি টাকা।

৬ নম্বর জোনের পাম্প অপারেটর ইসমাইল হোসেনের মূল বেতন স্কেল ৭ হাজার ৫৭০ টাকা। সাকল্যে তিনি বেতন পান ১৩ হাজার ৭৬২ টাকা। এই বেতন ছাড়া গত জুলাই মাসে তিনি ওভারটাইম পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৯৮ টাকা। ওভারটাইম ও বেতন মিলে পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৮৬০ টাকা। মূল বেতনের প্রায় পাঁচ গুণ অর্থ পেয়েছেন ওভারটাইম বাবদ। এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. তাকসিম এ খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান রহমতউল্লাহ বলেন, কিছু দিন আগে আমিই বিষয়টি প্রথম বোর্ড মিটিংয়ে তুলি। এর আগে কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামাননি। বোর্ডে তোলার পর একজন অতিরিক্ত সচিব বললেন, আমরা তো কল্পনাই করতে পারিনি ওয়াসায় এভাবে বেতনের তিন-চার গুণ টাকা ওভারটাইম হিসেবে দেওয়া হয়। আরেকজন অতিরিক্ত সচিব বললেন, ওয়াসার পাম্প অপারেটররা তো দেখছি সচিবের চেয়ে বেশি বেতন পাচ্ছেন। তারা ওয়াসার এমডির কাছে এর ব্যাখ্যা চাইলেন। এমডি বললেন, দীর্ঘ দিন থেকেই এমনটা চলে আসছে। তখন সিদ্ধান্ত হলো, এই তুঘলকি ওভারটাইম বন্ধ করতে হবে। বছরের পর বছর এটা চলতে পারে না। তখন বলা হলো, এটা বন্ধ করতে হলে শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ দিতে হবে। তখন প্রশ্ন উঠল জনবল নিয়োগ দিতে গেলেই সিবিএ নেতারা বাধা দেন। সিবিএ নেতাদের সঙ্গে আমি কথা বললাম। তাদের বললাম, এখানে চাকরি যারা পাবে, তারা তো এ দেশেরই মানুষ। আপনাদের আমাদেরই আত্দীয়। তারা আমার কথায় একমত হলো। তখন মন্ত্রণালয় বলল, আগে যাই থাক, এটা তো বছরের পর বছর চলতে পারে না। এই ইলিগ্যাল বেনিফিট বন্ধ করতে হবে। কারণ তারা কাজ না করেও ওভারটাইম নিচ্ছে বলে অভিযোগও আছে। পরে বোর্ডে ওয়াসার শূন্য পদ পূরণের সিদ্ধান্ত হলো। এমডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ একজন ১১ হাজার টাকার চাকরি করে মাসে ৩৩ হাজার টাকা ওভারটাইম নেবে এটা হতে পারে না। বছরের পর বছর এটা চলতে দেওয়া যায় না। এখন এটাকে প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম রায় ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ গোলাম আহমেদ বলেন, অনেক দিন ধরেই এ রকম অবস্থা চলে আসছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার একজন সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বলেন, এই ওভারটাইম ঢাকা ওয়াসার ঘাড়ে বিষফোঁড়ার মতো জেঁকে বসেছে। এমনও ঘটনা আছে, প্রতিদিন ডিউটি ৮ ঘণ্টা। কিন্তু ওই দিনই একজনের নামে ১৪ ঘণ্টা ওভারটাইমের বিল যোগ হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেই তোপের মুখে পড়তে হতো। হিসাব বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা সুবিধা নিয়ে এ ব্যাপারে চুপ থাকছেন। তিনি আরও জানান, শ্রম আইন অনুযায়ী একজনের ওভারটাইম প্রতিদিন ৬ ঘণ্টার বেশি হতে পারে না। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় মূল বেতন স্কেলের আট ভাগের দেড় গুণ অর্থ ওভারটাইম হিসেবে একজন কর্মচারী পেতে পারেন। অথচ ওয়াসায় এ নিয়ম মানা হয় না। ওভারটাইমের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ অর্থ নির্ধারণ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে একজন কর্মচারীর দৈনিক কর্মঘণ্টার চেয়ে ওভারটাইমই বেশি হয়। এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা ওয়াসায় বর্তমানে প্রায় ২ হাজার শূন্যপদ রয়েছে। এসব শূন্য পদের বিপরীতে বিভিন্ন সময়ে লোক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যখনই উদ্যোগ নেয়, তখনই সিবিএ নেতারা প্রশাসনকে জিম্মি করে ফেলেন। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আর লোক নিয়োগ দিতে পারে না। ওভারটাইম বাণিজ্যও বন্ধ হয় না। এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি মো. হাফিজউদ্দিন বলেন, মনে করেন একটি পাম্পের জন্য তিনজন পাম্প অপারেটর প্রয়োজন। ওয়াসার আছে একজন। তার ডিউটি আট ঘণ্টা। তারপর পাম্পে থাকবে কে? এখন বাকি ১৬ ঘণ্টা যদি তাকেই থাকতে হয়, তাহলে তো তাকে বাড়তি ১৬ ঘণ্টার ওভারটাইম দিতে হবে। আর ওয়াসার সঙ্গে সিবিএর একটি চুক্তি আছে, অন্য সময়ে ডিউটির দ্বিগুণ অর্থ ওভারটাইম হিসেবে দেওয়ার। এ জন্যই শ্রমিকরা বেতনের চেয়ে কয়েক গুণ অর্থ ওভারটাইম হিসেবে পান। গাড়িচালকদের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। কোনো অফিসার যদি অতিরিক্ত সময় ডিউটি করেন, তাহলে তার গাড়িচালককেও থাকতে হয়। কাজেই গাড়িচালক বা অফিস সহকারীও বেতনের চেয়ে বেশি ওভারটাইম পেতে পারেন। আমরা শ্রমিক রাজনীতি করি। আমাদেরকে শ্রমিকদের স্বার্থই দেখতে হবে। আমি তো চাই শ্রমিকরা আরও বেশি বেতন পাক। ঢাকা ওয়াসার আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা ওয়াসায় কাজ নাই মজুরি নাই (কানামনা) ভিত্তিতে সাড়ে তিনশর মতো কর্মচারী আছেন। এসব কর্মচারীর কোনো ওভারটাইম দেওয়া হয়নি। তারা চাকরি স্থায়ী করার জন্য অনেক চেষ্টা-তদবির করেছেন। কিন্তু ওয়াসা কর্তৃপক্ষ উল্টো তাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ স্থায়ী লোক নিয়োগ দিলে এসব কর্মচারীর ওভারটাইম সঙ্কুচিত হতে পারে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ওয়াসা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, যাদের নামে ওভারটাইমের বিল হচ্ছে, তাদের কাউকেই বিকাল ৫টার পর কর্মস্থলে পাওয়া যায় না। কিন্তু মাস শেষে দেখা যায় সকাল ৯টায় অফিস শুরুর আগে দুই ঘণ্টা ওভারটাইম ও অফিস শেষ হওয়ার পর পাঁচ ঘণ্টা ওভারটাইমের বিল তার নামে যোগ হয়েছে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, গত আট-দশ মাস হলো প্রত্যেক কর্মচারীর ওভারটাইমের বিল ফিঙ্ড করে দিয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। যে যাই ওভারটাইম করুক না কেন প্রত্যেক বিভাগীয় প্রধান প্রতি মাসে ওই পরিমাণ সময়ের ওভারটাইম লিখে দেন। এই ওভারটাইমের পেছনে ঢাকা ওয়াসার প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে অন্তত ৫ কোটি টাকা। তিনি জানান, একজন প্রথম শ্রেণীর অফিসার বেতন পাচ্ছেন ২৫ হাজার টাকা। তার ওভারটাইমের কোনো বিল হয় না। অথচ তার ড্রাইভার পান ৬০ হাজার টাকা। এতে অফিস শৃঙ্খলা রক্ষা করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাসের কর্মচারীদের মাসিক বেতন ও ওভারটাইমের নথি থেকে দেখা গেছে, মো. আলী নামের একজন গাড়িচালকের মূল বেতন স্কেল ১১ হাজার ৫৫৫ টাকা। সাকুল্যে তিনি বেতন পান ১৯ হাজার ২৮০ টাকা। অথচ এ মাসগুলোতে তিনি ওভারটাইম পেয়েছেন ৩৯ হজার ৪৩৬ টাকা। বেতন ও ওভারটাইমসহ প্রতি মাসে তিনি তুলেছেন ৫৮ হাজার ৭১৬ টাকা। আলমগীর হোসেন মোল্লা নামের একজন ফোরম্যানের বর্তমান বেতন স্কেল ১৩ হাজার ১১০ টাকা। মোট বেতন ১৯ হাজার ১৩০ টাকা। অথচ ওভারটাইম পাচ্ছেন ৩৭ হাজার ৯০০ টাকা। একইভাবে দেখা গেছে, গাড়িচালক মণ্ডল মিয়ায় বেতন ১৯ হাজার ১৩০ টাকা। অথচ ওভারটাইম পাচ্ছে ৩৭ হাজার ৯০০ টাকা। পাম্প অপারেটর মো. হারুনের বেতন ১৬ হাজার ৭২১ টাকা। ওভারটাইম পাচ্ছেন ২৯ হাজার ৪৮৭ টাকা। ফোরম্যান মজিবুর রহমানের বেতন ২১ হাজার ৫৪৫ টাকা। ওভারটাইম পাচ্ছেন ৩৫ হাজার ২৫১ টাকা। পাম্প অপারেটর আলী আহমেদ ভুইয়ার বেতন ১৬ হাজার ১১৩ টাকা। ওভারটাইম পাচ্ছেন ৩৩ হাজার ২৯৫ টাকা। অন্য কর্মচারীদেরও ওভারটাইম পাওয়ার চিত্র একই রকম।

শেয়ার করুন