‘তোমরা বাঁচান বাহে মোক’

0
102
Print Friendly, PDF & Email

মোক একনা গরু ‘দেও বাহে মুই এ বয়সে ঘানি টাইনবার না পাং। ওজার দিনোত ঘানি টানি ওজা আছোং শরীর আর চলে না। মুই মাইষে হয়ে একনা গরুর অভাবে পোয়া আইত থেকে সানজোত তেলের ঘানি টানি একনা তেল বেছে ওজা খুলুং। মোক তোমরা বাচান বাহে, মোক তোমরা বাচান। মুই বাইচপার চাং।’- এ আকতি লালমনিরহাটের খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের কালমাটি আনন্দ বাজার গ্রামের আবুল কাশেম তেলীর। বাপ দাদার পেশা ঘানি টানা। একটি গরুর অভাবে ৭৫ বছর বয়ষে মানুষ হয়েও ঘানি টানছেন তিনি। তিস্তা নদী নিয়ে গেছে বসতবাড়ি ও ঘানি টানা একটি গরু। একটি গরুর অভাবে কাশেম এখন নিজেই করছেন গরুর কাজ। গরু নেই তার কষ্ট ও হতাশা তেলের ঘানি টানবে কে। পেটের দায়ে গরুর কাজ করছেন ৭৫ বছর বয়সের কাশেম ও তার ৫০ বছরের স্ত্রী হাজরা খাতুন। নেই বয়স্কভাতার কার্ড। ৭৫ বছর বয়সে বয়স্ক ভাতার কার্ড না পেয়ে তিনি আর কত বয়সে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাবেন তা তিনি নিজেও জানেন না। কাকডাকা ভোর থেকে পেটের দায়ে ঘানি টানেন কাশেম ও তার স্ত্রী। মানুষ হয়েও পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখতে গরুর কাজ করেন তারা। কখনও হাজরা খাতুন ঘানি টানেন আবার কখনও বৃদ্ধ স্বামী ঘানি টানেন, সরিষা মাড়াই করে চালান সংসার। লালমনিরহাটের তিস্তা পাড়ের কালমাটি আনন্দ বাজার পল্লীতে এই পরিবারটির মানবেতর জীবন যাপন। একটি গরুর অভাবে নিজে ঘানি টেনে সরিষা মাড়াই করে তেল বিক্রি করে কাটাচ্ছেন দিন। দু’মুঠো অন্নের জন্য স্বামী-স্ত্রীকে করতে হচ্ছে এক অমানবিক কায়িক শ্রম। তারপরও মিলছে না অন্নের সংস্থান। একবেলা খেতে পারলেও আর এক বেলা থাকতে হয় অর্ধাহারে অনাহারে। নিরুপায় পরিবারটি নীরবে কাঁদলেও মিলছে না সমাধান। তবুও বাঁচতে হয়, বাঁচতে হচ্ছে এভাবেই। খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের দারিদ্র ও নিভৃত পল্লী তিস্তা পাড়ের কালমাটি আনন্দবাজার গ্রাম। এটি লালমনিরহাট সদর উপজেলার একটি গ্রাম। জেলা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে আবুল কাশেম তেলির বাড়ি। পূর্বপুরুষের পেশা গাছ মাড়াই করে তেলের ব্যবসা। আর তেলের ব্যবসার ঘানি টানার জন্য নেই গরু। একটি গরু থাকলেও তিস্তার পানিতে ভেসে গেছে। ব্যবসা চালাতে এখন তেলের ঘানি টানার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছেন স্বামী-স্ত্রী। রমজান মাস সারাদিন ঘানি টেনে চলে না তাদের শরীর। বৃদ্ধ বয়সে তেলের ঘাটি টেনে রাতে ঘুমাতে পারে স্বামী-স্ত্রী। শরীর টনটন করে। রোজা রেখে তেলের ঘানি টানা কষ্টের ঘানি না টানলে তাদের পেটে আহার যাবে না। মাঝে মাঝে ঘানি না টেনে থাকলে তাদের পরিবারের কারও পেটে ভাত জোটে না। এক কন্যা আর ২ পুত্র শিশু নিয়ে তাদের সংসার। অভাব অনটন আর দারিদ্রতা তাদের প্রতিদিন তাড়া করে ফিরে। অর্থের অভাবে কিনতে পাচ্ছে না একটি বলদ গরু। তিস্তা নদী তাদের বসতবাড়ি কেড়ে নিয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে কালমাটি আনন্দবাজার গ্রামের আজিজার রহমানের এক খণ্ড জমিতে খড়ের ঘর তৈরি করে কষ্টে কাটাচ্ছে দিন। তারা বলেন, ২০ বছর থেকে  ঘানি টানছেন স্বামী-স্ত্রী। কখনও নাতনীকে বসিয়ে দেন ঘানিতে। নাতনীকে ঘানিতে বসিয়ে বুড়া-বুড়ি টানেন ঘানি। ৫ কেজি সরিষা থেকে সোয়া কেজি তেল উৎপন্ন হয়। এই তেল আর খৈল বিক্রি করে প্রতিদিন আয় হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। তা দিয়েই টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে সংসার চলছে তাদের। তার উপরও বোঝা বইতে হয় আবুল কাশেম ওষুধ কিনতে। গ্রামের লোকজন তাদের কাছ থেকে পাচ্ছেন খাঁটি সরিষার তেল। বাড়িতে অন্য গ্রামের মানুষও আসেন তেল কিনতে। বাড়ি থেকে বিক্রি হয়ে যায় সব তেল। আবুল কাশেম বলেন, ‘বাপই মোক একনা গরু দেও, মুই এ বয়ষে ঘাটি টাইনবার  না পাং।’ কাশেম তেলীর স্ত্রী হাজরা খাতুন বলেন, ‘মোর স্বামী সারা দিন ঘানি টানিয়া আইতোত ঘুমবার পায় না। গরুর কাজ মাইষে করলে কি বাঁচা যায়। দয়া করে হামাক একনা গরু দিয়ে সাহায্য করেন, না হইলে মোর স্বামীক বাঁচান।’

শেয়ার করুন