মাগফেরাতের মাহে রমজান : রোজা ছিল আগের যুগেও

0
139
Print Friendly, PDF & Email

রমজানুল মোবারকের আঠারতম দিন আজ। সারাদিন পরিপূর্ণ উপোস ও সংযম করে আমরা সিয়াম সাধনা করি বা রোজা রাখি। রোজার এই বিধান এই উম্মতের জন্যই নজিরবহির্ভূত একটি আমল নয়। কিছু কিছু ভিন্নতাসহ এরকম বিধান আগের যুগেও ছিল। ছিল বিভিন্ন নবীর উম্মতদের মাঝেই। রমজান মাসব্যাপী রোজা ইসলামী শরিয়তের অন্যতম ভিত্তি। অবশ্যপালনীয় এই বিধানটি আমাদের জন্য বহু সৌভাগ্যের কারণ ও উপলক্ষ। কিন্তু রোজা বা উপোস করে কাটানো—এই চর্চা একদম নতুন একটি চর্চা বা ধারণা নয়। বিভিন্ন জাতির ওপর রোজা ফরজ ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই।
অনেকে আবার নিজেদের পক্ষ থেকেই রোজার বিধান অবলম্বন করে নিয়েছে। সংযম চর্চার শাশ্বত সৌন্দর্যই এতে ফুটে ওঠে। মানুষের মধ্যে যে কুপ্রবৃত্তি রয়েছে, তা মানুষকে অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে
আত্মরক্ষার জন্য, আত্মশুদ্ধি লাভের জন্য এবং উন্নততর আদর্শের অনুসারী হওয়ার জন্য রমজানের রোজা পালনের বিধান দেয়া হয়েছে। মানুষ যেন কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে, শরিয়তের বিধান মেনে চলতে পারে এবং যাবতীয় অকল্যাণকর কাজ থেকে আত্মরক্ষা করে আল্লাহ তায়ালার অনন্ত অসীম রহমতের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে—এ উদ্দেশ্যেই মাহে রমজানের সিয়াম বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। রমজানের সিয়াম সাধনা হলো সত্যিকার অর্থে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের সাধনা। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী নবীদের শরিয়তেও। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কারিমে ঘোষণা করেন—‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের প্রতি সিয়াম বিধিবদ্ধ করা হলো যেমনিভাবে সিয়াম বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর’ (বাকারা : ১৮৩)।
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক জাতির মধ্যেই প্রচলিত ছিল সিয়াম বা রোজা নামের এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি। প্রথম নবী হজরত আদম (আ.)-এর শরিয়তে সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছিল বলে তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া যায়, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীর শরিয়তেই চান্দ্র মাসের ১৩-১৪-১৫ তারিখে সিয়ামের বিধান ছিল। ‘আইয়ামে বিজ’ নামে এই সিয়াম প্রসিদ্ধ। তাফসিরবেত্তারা বলেছেন : হজরত নুহ (আ.) থেকে শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর যুগেই প্রতি মাসে তিনটি করে সিয়ামের বিধান ছিল। শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাসব্যাপী রমজানের সিয়ামের বিধান দেয়া হলে মাসিক তিনটি সিয়ামের অবশ্যপালনীয় বিধান রহিত হয় (তাফসিরে ইবনে কাসির)। এখন এ বিধানটিকে নফল করে দেয়া হয়েছে।
বিশুদ্ধ হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, হজরত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে মদিনার ইহুদিরা সিয়াম পালন করত মহররম মাসের আশুরার দিনে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদিনায় হিজরতের পর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতে পেলেন, ইহুদিরা আশুরার সিয়াম পালন করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কিসের সিয়াম পালন করছ? তাদের পক্ষ থেকে জানানো হলো, এ এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবী হজরত মুসা (আ.) ও তার জাতিকে ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং ফেরাউন ও তার দলবলকে সলিল নিমজ্জিত করেন। হজরত মুসা (আ.) এ দিনটির স্মরণে সিয়াম পালন করেছিলেন। আমরাও তার অনুসরণে এই সিয়াম পালন করছি। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জবাব শুনে বললেন : হজরত মুসা (আ.)-এর বিষয়ে তোমাদের চেয়ে আমরা অধিকতর হকদার। এরপর তিনি আশুরার সিয়াম পালনের নির্দেশ দিলেন (বুখারি ও মুসলিম শরীফ)।
যেহেতু রোজার প্রচলন ছিল সব নবীর যুগেই, তাই এর তাত্পর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। একই সঙ্গে এতে এ সত্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রোজার ক্ষুত্-পিপাসা ও নৈতিক সংযমের কষ্টটা একদমই নজিরবিহীন নয়—যা কেবল এই উম্মতকে দেয়া হয়েছে। বরং এ জাতীয় ত্যাগ ও সাধনার একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে এবং নানাবিধ কল্যাণের কারণেই এ বিধানটি অনেক পরিমার্জিত ও সংহত পন্থায় পালনের জন্য এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই আসুন, তাত্পর্যমণ্ডিত রোজার এই বিধান যথাযথভাবে পালন করে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অগ্রসর হই।

শেয়ার করুন