মিসরে মুরসি সমর্থকদের ওপর সেনাদের গুলিতে নিহত ১৪০ : গুলিবিদ্ধ ৫ সহস্রাধিক, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ব্রাদারহুডের

0
35
Print Friendly, PDF & Email

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকদের ওপর আরও একটি গণহত্যা চালিয়েছে দেশটির আমেরিকা-পালিত সেনাবাহিনী। সেনাদের গুলিতে শনিবার ফজরের নামাজের আগে অন্তত ১৪০ নিরস্ত্র মুরসি সমর্থক নিহত এবং ৫ সহস্রাধিক লোক আহত হয়েছেন।
হতাহতের বেশিরভাগই ঘটেছে রাজধানী কায়রোর নসর সিটিতে। এছাড়া দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়ায়ও অন্তত ১০ জন নিহত এবং বহু লোক আহত হয়েছেন।
মিসরের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বুধবার সেনাশাসনের সমর্থনে দেশবাসীকে শুক্রবার রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানানোর পর ইসলামি ব্রাদারহুডও মুরসির সমর্থনে এবং সেনাশাসনের প্রতিবাদে শান্তিপূূর্ণ সমাবেশের ডাক দেয়। পাল্টাপাল্টি সমাবেশের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিক্ষোভরত মুরসি সমর্থকদের ওপর এ গণহত্যা চালালো সেনাবাহিনী।
সিসির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেশ কিছু মানুষ তাহরির চত্বরে সমবেত হয়। অন্যদিকে মুরসি সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখান নাসর সিটিতে। শুধু কায়রো নয়, আলেক্সান্দ্রিয়াসহ মিসরের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ দেখান মুরসির সমর্থকরা।
মুরসির সমর্থক ইসলামি ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, সেনাবাহিনী ও পুলিশের নির্বিচার গুলিতেই বেশিরভাগ মানুষ মারা গেছে। আর নিরাপত্তা বাহিনীর আক্রোশের শিকার হয়েছে মূলত মুরসি সমর্থকরাই। তারা বলেছে, তাদেরকে হত্যার জন্যই গুলি চালানো হয়েছে।
গত ৮ জুন এই নসর সিটিতেই ফজরের নামাজরত মুরসি সমর্থকদের ওপর আরও একটি গণহত্যা চালিয়েছিল পুলিশ ও সেনাবাহিনী। ওই সময় অন্তত ১০৩ জন মুরসি সমর্থক নিহত হয় বলে জানিয়েছে ব্রাদারহুড। তবে সরকার বলছে নিহতের সংখ্যা ৫৪।
মোহাম্মদ মুরসিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্বহালের দাবিতে শুক্রবার কায়রোর নসর সিটিতে তার হাজার হাজার সমর্থক সমবেত হন। সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এ সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতারা। দলটির শীর্ষ নেতা মোহাম্মাদ বাদিয়ি বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন।
বিক্ষোভের অজুহাতে মিসরের ইতিহাসে প্রথম অবাধ নির্বাচনে জয়ী প্রেসিডেন্ট মুরসিকে উত্খাত করে সেনাবাহিনী। অথচ তিনি ১ বছরেরও কম সময় দেশ শাসন করার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক ও মিসরের বামপন্থীরা মুরসি সমর্থকদের ওপর হামলা চলাচ্ছে। এতে শুক্রবারের আগ পর্যন্ত অন্তত দুই শতাধিক মুরসি সমর্থক নিহত হয়েছে।
শুক্রবার শেষ বেলা থেকে শুরু করে সারারাত ধরে সংঘর্ষ চলে। রাতের অন্ধকারেই শতাধিক মানুষ নিহত হয়। ইসলামি ব্রাদারহুড বলেছে, শুধু শনিবার সকালেই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তাদের ৩১ জন সমর্থক নিহত হয়েছে।
রাব্বা আল-আদাবিয়া মসজিদের কাছে গতকাল সকালেও সংঘর্ষ চলার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সেখানকার রাস্তায় ব্যাপক রক্তের দাগ দেখা গেছে।
গত ২৮ জুন থেকেই মুরসি সমর্থকরা এ এলাকায় অবস্থান ধর্মঘট করছিলেন। তাদের হটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে কিনা তার পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে গতকাল খুব ভোরে মিসরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেছেন, এ মসজিদের আশপাশে যে অবস্থান ধর্মঘট চলছে তার ইতি টানা হবে। তিনি দাবি করেন, আইনি পন্থায়ই এ অবস্থান ধর্মঘটের ইতি টানা হবে।
ওই এলাকা থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে এবং গোটা এলাকা কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে গেছে। ইসলামি ব্রাদারহুডের মুখপাত্র গেহাদ আল-হাদ্দাদ বলেছেন, মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী আহত করার জন্য নয়, বরং হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছুড়ছে।
ইখওয়ানের প্রবীণ নেতা সাদ আল-হোসাইনি বলেন, মসজিদের এলাকা থেকে ইখওয়ানের সমর্থকদের হটিয়ে দেয়ার জন্য এ ধরনের তত্পরতা চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। তিনি আরও জানান, ‘গত পাঁচ ঘণ্টা ধরে ওখান থেকে তরুণদের সরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। তরুণরা বলছে, আমরা রক্তমূল্য দিয়েছি, তাই ওখান থেকে পিছিয়ে আসব না।’
এদিকে ইখওয়ানের সমর্থকদের নির্বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মিসরের জনগণ। সেনাবাহিনীর বিশেষ করে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আস-সিসি মিসরের জনগণ হত্যায় মেতে উঠেছেন বলে মনে করছে তারা।
মুরসিকে উত্খাতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও নিন্দা জানানোর জন্য গোটা মিসরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। মিসরের সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তাজা গুলি ব্যবহার করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় সংঘর্ষে আজ খু্ব সকালে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে।
ব্রাদারহুডের মুখপাত্র আহমেদ আরেফ বলেছেন, তারা মিসরজুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন এবং সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো আলোচনায় বসবেন না। ব্রাদারহুডের শীর্ষস্থানীয় নেতা আল-বেলতাগি গতকাল বলেছেন, ‘সেনা অভ্যুত্থানের ওপর হয় বিজয় অথবা শাহাদাত্।’
মিসরের সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আদলি মনসুর এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সর্বশক্তি দিয়ে বিশৃঙ্খলা দমন করা হবে।

শেয়ার করুন