তারেক রহমানের অ্যাকশন প্লান

0
134
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনের আগে নিজের অ্যাকশন প্লান ঘোষণা করেছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে উন্নয়নের সাত দফা রূপরেখা তুলে ধরেছেন তিনি। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা, কৃষি খাত, শিল্পায়ন, পরিবেশ ও পর্যটন শিল্প, রাজধানীর যানজট নিরসন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। বিএনপির নেতারা বলছেন, পরিবর্তনের রাজনীতির স্বার্থে বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি।

বুধবার লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে তারেক রহমান বাংলাদেশ নিয়ে তার উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রায় এক ঘণ্টার বক্তৃতায় চলমান রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি কথা বলেননি তিনি। এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেছেন, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য কেবল ক্ষমতায় যাওয়া নয়, ক্ষমতা যাওয়া একটি লক্ষ্য মাত্র। তবে এ মুহূর্তে নির্বাচনের আগে প্রধান কাজ একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করা। নির্বাচন হতে হবে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে। বাংলাদেশের জনগণ চায় নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় দেশে-বিদেশে যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতির পরিবর্তন একান্ত জরুরি। পরিবর্তনের রাজনীতির স্বার্থেই দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। নানা ফোরামে সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনাও করছেন। কোনো কোনো নেতা নিজেদের ধারণাগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরছেন এবং জনমতও যাচাই করছেন। তবে এ বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আসেনি।

সেন্ট্রাল লন্ডনের গুয়োম্যান হোটেলে আয়োজিত ইফতার মাহফিলপূর্ব এ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুস। সভা পরিচালনা করেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কায়সর আহমদ। ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে আসার পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশ্য সভায় বক্তৃতা করলেন তারেক রহমান। ইফতার মাহফিলে যুক্তরাজ্য বিএনপির চার শতাধিক নেতাকর্মী ও সুধীজন অংশ নেন। বক্তব্যের মাঝে মাঝে থেমে তিনি নিজের পরিকল্পনার বিষয়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মতামত নেন। তার প্রতিটি পরিকল্পনাই প্রশংসিত হয়।

সভায় বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে অতীত না ঘেঁটে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, অতীতমুখিতা নয়, দৃষ্টি দিতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব নয়। কিভাবে উন্নয়ন সম্ভব এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। আমাদের অনেকের ধর্মবিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক আদর্শ আলাদা হতে পারে কিন্তু আমরা সবাই বাংলাদেশী, আমরা সবাই দেশকে ভালোবাসি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তার বক্তৃতায় কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও পর্যটন, রাজধানীর যানজট, পানি, বিদ্যুৎসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজস্ব চিন্তা এবং পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে লন্ডন থেকেই নিজের অ্যাকশন প্লান ঘোষণা করলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে যা বিশ্বমানের নাগরিক জন্ম দেবে। মাতৃভাষার পাশাপাশি অবশ্যই ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দেন তিনি। এছাড়াও তৃতীয় ও চতুর্থ ভাষা হিসেবে স্প্যানিশ, ফ্রান্স, জার্মান ম্যান্ডারিন এসব ভাষা শেখার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষাকে বাস্তবমুখী করতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতিরও পরিবর্তন দরকার বলে মত দেন তিনি। তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করলে শুধু একটি শিক্ষিত জাতিই গড়ে উঠবে না, বেকারত্ব কমবে। বাড়বে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা। এর ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫ বছরের ব্যবধানে ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করাও অবাস্তব নয়।

কৃষি খাত প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এ খাতে প্রথমেই প্রয়োজন একটি তথ্যভা-ার গড়ে তোলা। কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি ভর্তুকিসহ যাবতীয় তথ্য এখানে সংরক্ষিত থাকবে। কৃষকদের সার্বিক দিক থেকে সহযোগিতা দিতে হবে। তারেক রহমান বলেন, সারা বিশ্বে কৃষি প্রযুক্তির বাজার কমপক্ষে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের। সেই মার্কেটে এক পার্সেন্ট ব্যবসা নিতে পারলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রধান তিন উপাদান চারা ও বীজ, সার ও কীটনাশক, সরঞ্জামের আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন মূল্যের সঙ্গে ১০-১৫ শতাংশ লাভ ধরে বিক্রয় মূল্যের বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। স্বাধীন কৃষিবান্ধব মূল্য নির্ধারণ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। কৃষকদের জীবনমানের উন্নয়নের কথাও বলেছেন তিনি।

শিল্পায়ন সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন, গার্মেন্ট খাতে শ্রমিকদের বেতন, কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তা এ বিষয়গুলোর সমাধান এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে যেসব আইটেম পাঠানো হয় এ শিল্পে রফতানির তালিকায় আরও নতুন আইটেম যোগ করার সুযোগ রয়েছে। এ শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৪৫ বিলিয়ন ডলার আয় করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। গার্মেন্ট শিল্পের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের শিল্পের ৯১ শতাংশ ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এসব শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং সরকারি প্রণোদনা দেয়া দরকার। ধোলাইখালসহ দেশের যেসব স্থানে যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে, সেসব ব্যবসাকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় এনে কৃষি যন্ত্রপাতি, আবাসন খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল এবং জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পকে পৃথক চারটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে পর্যটকের সংখ্যা প্রতি বছর ১ লাখ থেকে ৫ লাখে উন্নীত করা সম্ভব। এ বিষয়ে তিনি তার বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কক্সবাজারে একটি সিলিকন বিচ সিটি কিংবা সুন্দরবনকে ঘিরে ওয়াটার বেইস সাফারি নির্মাণ করা যেতে পারে।

রাজধানীর যানজট নিরসনেও তিনি তার পরিকল্পনার কথা জানান। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঢাকার চারপাশের এলাকার সঙ্গে দ্রুতগতির রেললাইন নির্মাণ, ওভারপাস এবং স্যাটেলাইট সিটি তৈরি, বিকেন্দ্রীকরণ এবং নগরায়ন।

ইন্টারনেটের আউটসোর্সিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে দেশে কয়েকটি আইটি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেখানে স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একসঙ্গে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ডেভেলপ এবং প্রযুক্তিগত গবেষণা করবে। ইন্টারনেট সহজলভ্য করতে ব্যান্ডউইডথের দাম কমানোরও পক্ষপাতী তিনি। পর্যটন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে কক্সবাজারকে ‘সিলিকন বিচ সিটি’ এবং সুন্দরবনকে ‘সাফারি পার্ক’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ খাতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশাল পরিমাণে লাভবান হতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্বায়নের এই সময়ে টিকে থাকার জন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আরেকটি সাবমেরিন কেবল বসানোর পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ কমিয়ে এটিকে আরও সহজলভ্য করতে হবে। একটি আইটি পার্ক স্থাপনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, একটি দেশে কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনায়ন জরুরি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে এর অর্ধেকও নেই। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পরিবেশ রক্ষায় কমপক্ষে পাঁচ কোটি বৃক্ষ রোপণ করা হবে। তিনি বলেন, সবাই মিলে প্রচেষ্টা নিলে বাংলাদেশ একটি রফতানিমুখী বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আর নগরায়ন ও পানির বিকল্প উৎস নিয়ে নিজের ভাবনাও তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের জানান।

তারেক মনে করেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে পাঁচ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স বর্তমানের ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করে এক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে চান তিনি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। একে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের তরুণদের গুগল, মাইক্রোসফট, স্যামসং, ইন্টেল, সনি, এলজির মতো কোম্পানিতে কাজ করার মেধা ও যোগ্যতা আছে বলে আমি মনে করি।

তারেক রহমান বলেন, এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে দেশে এ মুহূর্তে থাকা ৩ কোটি কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ১ কোটির নিচে নেমে আসবে। কর্মজীবীর সংখ্যা সাড়ে ৫ কোটি থেকে ৮ কোটিতে উঠবে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা ৩১ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নেমে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামীতে নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই। সুতরাং নেতারা আমাদের এখন নির্বাচনমুখী হওয়ার চেয়ে উচিত হচ্ছে কীভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় সেটি নিশ্চিত করা। তারেক রহমানের সার্বিক এ ভাবনা প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, তারেক রহমান দীর্ঘসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে মাঠ নেতাদের মতামত নিয়ে দল ও দেশ পরিচালনায় একটি রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি বাতিল হওয়া নির্বাচনটি স্বাভাবিক নিয়মে অনুষ্ঠিত হলে ওই রূপরেখাকে বিএনপি কাজে লাগাত। কিন্তু ১/১১ পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। ওই রূপরেখায় আরও পরিবর্তন এনে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা ভাবছে বিএনপি। এটা বাস্তবায়ন হলে এ দেশ ও দেশের মানুষের প্রভূত উন্নয়ন ঘটবে।

শেয়ার করুন