নির্বাচনের সময় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চায় ইসি

0
69
Print Friendly, PDF & Email

সংসদ নির্বাচন চলার সময় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চেয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে সুশীল সমাজের তীব্র সমালোচনার পরেও সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে আরপিওতে। আর সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল ও প্রার্থীর (দলীয়) প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে দলের হাতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিধান রাখা হয়নি। এবারে নির্বাচনে দলের জন্য সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। তবে দলীয় প্রধানের নির্বাচনী প্রচারণার খরচ দলের ব্যয়সীমার আওতামুক্ত থাকবে এবং দলীয় প্রধানের ব্যয়সীমার কোনো উল্লেখ নেই। ছোট-বড় মোট ৮৭টি জায়গায় পরিবর্তন এনে গতকাল নির্বাচন কমিশন আরপিও আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। জানতে চাইলে এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, আরপিওর সংশোধনী প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, দশম সংসদ নির্বাচনে দল বা জোট একটি আসনে যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে কেবল তিনিই প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। ওই আসনে দলের বা জোটের অন্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। আর নির্বাচনের সময় প্রার্থী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও ক্ষমতা দিচ্ছে ইসি। ১২ নাম্বার ধারার ৩এ(বি) উপধারায় সংশোধনীতে বলা হয়েছে, দল থেকে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিল করা হবে ইসিতে। এ ক্ষেত্রে একাধিক বৈধ প্রার্থী ঘোষণা হলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে একজন প্রার্থীকে দল চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে। আর বাকিদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়েছে বলে গণ্য হবে। এর ফলে কারও বিদ্রোহী হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ নির্বাচন করতে চাইলে আগে থেকেই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। এর আগে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ক্ষমতা প্রার্থী বা তার এজেন্টের হাতেই ছিল। দল বা জোট কাউকে চূড়ান্ত মনোনয়ন না দিলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। কিন্তু এখন মনোনয়নপত্র দাখিল ও প্রত্যাহারের চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে দলের হাতে। আর দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ধরে নেবে ইসি। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে দেখা গেছে, ৪৪ (ই) ধারায় নির্বাচনের সময় বিভাগীয় পুলিশ কমিশনার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার ও তার অধস্তনকে ইসির পরামর্শ মোতাবেক বদলি করার বিধান করা হচ্ছে। একই ধারায় আরও বলা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের যে কোনো বিভাগ বা দফতরের অধীনে যে কোনো চাকরিজীবীকে বদলির জন্য তার যথাযথ কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অনুরোধ করবে ইসি। লিখিত ওই পত্রটি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে বদলির কার্যকর ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অনেক সময় বদলির আদেশ দিলেও কার্যকর হতে নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যায়, তাই এ ধরনের সংশোধন আনা হচ্ছে বলে প্রস্তাবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধারা ১২ (ঈ)-তে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীরা প্রার্থী হতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর অধীনে যে কোনো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরাও প্রার্থিতায় অযোগ্য হবেন। উপধারা ৮৬ (এ) যুক্ত করে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময় যদি কোনো ব্যক্তি ইসির নির্দেশ না মানে বা ভঙ্গ করে তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। উপধারা ৮৬ (বি)-তে বলা হয়েছে, কোনো বিভাগ বা দফতর বা এসব দফতরের যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি ইসির নির্দেশ না মানে বা ভঙ্গ করে তবে তাকেও একই দণ্ডে দণ্ড দেওয়া যাবে। এদিকে কোনো সরকারি চাকরিজীবী যদি কোনো অপকর্ম করেন, তবে তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর দণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। ১৫ (২) উপধারায় বলা হয়েছে, এখন থেকে মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক শুধু বাতিল নয়, গ্রহণ করার বিরুদ্ধেও আপিল করা যাবে। অর্থাৎ কোনো জনপ্রিয় নেতা যদি দল থেকে বের হয়ে গিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, সে ক্ষেত্রে ঝামেলায় পড়তে হবে তাকে। কারণ তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করলেও তা বাতিলের জন্য আপিল করা যাবে। দলের ভেতর শৃঙ্খলা আনার জন্য সংশোধনী প্রস্তাবে এ বিধান রাখা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আগে শুধু ঋণখেলাপির মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা যেত। এখন গ্যারান্টারকেও একই অপরাধে অপরাধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিলেও মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান করা হচ্ছে। আগের চেয়ে জামানতও বাড়ানো হচ্ছে। এখন প্রার্থীকে ২০ হাজার টাকা জামানত দিতে হবে। এদিকে নির্বাচনী ব্যয় পুনর্নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য সংশোধন আনছে ইসি। এ ক্ষেত্রে দলগুলোকে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে যে কোনো তফসিলি ব্যাংকে নতুন হিসাব নাম্বার খুলতে হবে। হিসাব নাম্বারটি মনোনয়নপত্রের সঙ্গেই ইসিতে জমা দেওয়ার বিধান করা হচ্ছে। নির্বাচনের যে কোনো ব্যয় এ হিসাব থেকেই চালাতে হবে প্রার্থীকে। আরপিও মোতাবেক নির্বাচনে দলের জন্য সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। তবে যে দলের প্রার্থীর সংখ্যা দুই শর উপরে থাকবে তারাই কেবল এ ব্যয় করতে পারবে। যাদের প্রার্থীর সংখ্যা এক শর বেশি কিন্তু দুই শর কম সে দলের ব্যয়সীমা হচ্ছে ৩ কোটি টাকা, যে দলের প্রার্থীর সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি কিন্তু এক শর কম সে দলের ব্যয়সীমা ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, আর যে দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫০-এর কম সে দলের ব্যয়সীমা ৭৫ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য দেড় লাখ টাকা ধরে প্রত্যেক দলের ব্যয়সীমা গণনা করা হবে। ৪৪ সিসি-৩-এর ডি উপধারায় নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, দলীয় প্রধানের নির্বাচনী প্রচারণার খরচ দলের ব্যয়সীমার আওতামুক্ত থাকবে। তবে দলীয় প্রধানের ব্যয়সীমার কোনো উল্লেখ নেই। তিনি যত ইচ্ছা তত ব্যয় করতে পারবেন। এদিকে প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচের সীমাও বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৫ লাখের পরিবর্তে ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে কমিশন। অনুদানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। আগে কোনো ব্যক্তি দলকে ৫ লাখ টাকা অনুদান দিতে পারতেন, এখন তা ১০ লাখ টাকা বা তার সমপরিমাণ সম্পদ বা সেবা দিতে পারবেন। আর কোনো কোম্পানি বা সংগঠনের কাছে থেকে কোনো দল সর্বোচ্চ ২৫ লাখের পরিবর্তে ৫০ লাখ টাকা বা তার সমপরিমাণ সম্পদ বা সেবা নিতে পারবে।

শেয়ার করুন