সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করুন : প্রধানমন্ত্রী

0
96
Print Friendly, PDF & Email

ত্যাগ ও সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে তাদের ১৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করুন : প্রধানমন্ত্রী
গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন ২০১৩ উদ্বোধনকালে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। বাসস।

শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের তাদের বিভিন্ন জনমুখী কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের নির্দেশ দেন। প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করা, জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। শেখ হাসিনা রমজান মাসে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির যে কোনো অপচেষ্টা রোধে ডিসিদের নির্দেশ দেন। তিনি ‘চাহিদা, মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত নজরদারির নির্দেশ দেন।’ সরকারের সেবাসমূহ পাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণ যাতে লাঞ্ছিত এবং বঞ্চিত না হয় সে জন্য বিশেষ মনোযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের উপদেশ দেন। তিনি বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন ও পাচার এবং মাদকের অপব্যবহার বন্ধ, যৌতুক, ইভ টিজিং ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি রোধে আপনাদের কাজ করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী সব স্তরে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া বন্ধ এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় মানসম্পন্ন শিক্ষার বিস্তার ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ভূমি রক্ষায় দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ওপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, কৃষি উৎপাদ বৃদ্ধির জন্য সার, বীজ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী খাদ্য শস্য দূষণমুক্ত রাখতে এবং ভেজাল খাদ্যপণ্য বাজারজাত বন্ধে আরও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে উৎপাদনকারীদের আরও উৎসাহিত করতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় এবং এ ক্ষেত্রে আইন ও শাসনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্পর্কে আপনাদের জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শেখ হাসিনা স্থানীয় সীমিত সম্পদ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমবায় কর্মকাণ্ড আরও জোরদারে পদেক্ষেপ গ্রহণের জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার-২০১০-এর ভিত্তিতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায় বিচার পেতে ও মামলা জট কমাতে গ্রাম্য আদালত কার্যকর করতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ করার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তার সরকার সারা দেশে উন্নয়ন ছড়িয়ে দিতে চায়। তিনি এ জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র্য লোকদের জীবনমান উন্নয়ন করা আমাদের লক্ষ্য এবং আমরা তাদের জন্য রাজনীতি করি। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভূইয়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার এএম শামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. তোফাজুল হোসেন, যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও ভোলার ডিসি খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সচিব, বিভাগীয় কমিশনার এবং পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিচারিক ক্ষমতা চেয়েছেন ডিসিরা : মোবাইল কোর্টের পরিধি বৃদ্ধি করে সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা চেয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। গতকাল ডিসি সম্মেলনের প্রথম দিনে উদ্বোধন শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জনপ্রশাসনবিষয়ক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের কাছে এ দাবি জানানো হয়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের সময় পুলিশ সুপার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দিয়েছেন ডিসিদের।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত অধিবেশনে জেলা প্রশাসকরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষমতা চান। ডিসিরা বলেন, বিচার বিভাগকে সহায়তা করার জন্য তারা সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা চাচ্ছেন। বিদ্যমান আইনে কেউ দোষ স্বীকার না করলে ম্যাজিস্ট্রেটরা শাস্তি দিতে পারেন না। মাঠ প্রশাসনে (জেলা প্রশাসকের দফতরে) তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের পদ ও পদবি পরিবর্তনের কারণে একটা বৈষম্য তৈরি হওয়ায় মাঠপর্যায়ে অসন্তোষ আছে। এ বিষয়টি তুলে ধরে সমাধান চাওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এইচটি ইমাম বলেন, জেলা প্রশাসকরা সংক্ষিপ্ত বিচারের (সামারি ট্রায়ালের) ক্ষমতায় চেয়েছেন। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ক্ষমতা দেওয়া হলে নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের এক করা হবে কিনা জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, এ নিয়ে প্রশ্নই ওঠে না, জুডিশিয়াল তো সম্পূর্ণ আলাদা, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আলাদা, জুডিশিয়াল পে-কমিশন আলাদা।পদ-পদবি নিয়ে অসন্তোষ সম্পর্কে এইচটি ইমাম বলেন, এ সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা যায় সেগুলো আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে মাঠপর্যায় প্রতিটি জায়গাতেই একটি টিম না হলে কাজ হয় না। এ টিমের মধ্যে গরমিল থাকলে জনগণ, সরকার ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং টিম যাতে ভালোভাবে কাজ করে সম্মেলনের শেষ দিকে এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা মূলত জেলাভিত্তিক নানা সমস্যা তুলে ধরেছেন। যেমন দিনাজপুরের ডিসি বাংলাবান্দা স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন কেন্দ্র চালুর সুপারিশ করেছেন। এ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান শিকদার।

যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকরের সময় সতর্ক থাকার নির্দেশ : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত অধিবেশনে ডিসিরা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, অনেক জেলায় মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় এ জন্য ভিন্ন জেলায় গিয়ে আনতে হয়। যত দ্রুত সম্ভব সব জেলায় পাসপোর্ট অফিস বসানোর প্রস্তাব করা হয়। অনেক জেলায় কারাগারের জীর্ণ অবস্থা। নতুন কারাগার নির্মাণের সুপারিশ করেছেন তারা। এসব বিষয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু বলেন, এমআরপি যাতে সব জেলায় পাওয়া যায় সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারাগার ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় শীঘ্রই কার্যকর শুরু হবে। এ রায় কার্যকরের সময় অতীতের মতো জামায়াত-শিবির চক্র আঘাত হানতে পারে। এ আঘাত মোকাবিলায় জেলা পুলিশ সুপার, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে এদের মোকাবিলা করার নির্দেশ দিয়েছি। একই অধিবেশনে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বৈঠকে জানানো হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের দাফনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ চাওয়া হবে সে পরিমাণ অর্থ দেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি কোনো জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পৃথক সমাধিস্থল করতে চাইলে আর্থিকসহ সব ধরনের সহায়তা দেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মুক্তিযোদ্ধারা কোনো জেলায় মুক্তিযোদ্ধা তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিলে সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেবে মন্ত্রণালয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি : শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বৈঠকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। অধিবেশন শেষে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় ক্ষমতাবান ও স্থানীয়দের হস্তক্ষেপ নিয়ে তারা (ডিসি) কথা বলেছেন। পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। আমরা তা করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া দক্ষ ও যোগ্যদের স্বচ্ছতার সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে জেলা প্রশাসকরা দাবি জানিয়েছেন বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তবে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার বিষয়ে জেলা প্রশাসকরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানান নাহিদ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আফসারুল আমিনের সভাপতিত্বে সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদ, শিক্ষা সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী আখতার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন