শিক্ষকদের গ্রুপিং-রাজনীতিতে ধ্বংসের পথে জাবি

0
73
Print Friendly, PDF & Email

শিক্ষকদের গ্রুপিং রাজনীতির কারণে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিহিংসা থেকেই গ্রুপিংয়ে লিপ্ত শিক্ষকরা ধ্বংস করছেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবান জীবন।

বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাদের আটটি গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত হওয়া থেকেই তা বোঝা যায়। শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালানোর চেয়ে এসব গ্রুপ ব্যস্ত উপাচার্য ও শিক্ষক সমিতির মধ্যে রাজনীতি নিয়ে। আর এ রাজনীতি চলছে দু’বছর ধরে।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, উপাচার্য এক মাস ধরে নিজ বাসভবনেই বসিয়েছেন অস্থায়ী অফিস।

রাষ্ট্রপতির নিয়োগ দেওয়া দেশের অন্যতম প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে শিক্ষক সমিতি তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই আন্দোলনে মূল খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালন করছেন গত বছর আন্দোলনের মুখে বিদায় নেওয়া সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির। দায়িত্ব পালনকালে যে ২৫০ শিক্ষক তিনি নিয়োগ দিয়েছেন, তারাই তার শক্তি (ম্যান পাওয়ার) হিসেবে কাজ করছে।
 
সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রুপের এই আন্দোলনের কারণে বেশ কিছু সময় ধরে একাডেমিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিল। এখন ক্লাস ও পরীক্ষা চললেও বন্ধ রয়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ব্যানারে চলমান আন্দোলনে শিক্ষকরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগ এনে তার পদত্যাগ দাবি করছেন। ১৯ জুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ২০ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। ফলে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি আটকে রয়েছে এবং এ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
 
২০ জুনের নির্ধারিত সিন্ডিকেট সভা, ২১ জুনের বার্ষিক সিনেট অধিবেশন সভা বাতিল করা হয় শিক্ষকদের অবরোধ কর্মসূচির কারণে। এছাড়া নিয়মিত একাডেমিক কাউন্সিলের সভা না হওয়ায় এমফিল, পিএইচডির ভর্তি আটকে আছে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ এনে আন্দোলন চালিয়েছিলেন শিক্ষকরা।
 
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় ক্যাম্পাসে ভাঙচুরের নেপথ্যে থাকা অপরাধীদের বিচার না করা, সংবাদ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মর্যাদাহানির বক্তব্য প্রদান, শিক্ষক সমিতির দাবির মুখে একবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে পুনরায় তা প্রত্যাহার, শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় প্রহসনের বিচার, শিক্ষকদের সম্পর্কে ‘অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, অযোগ্য প্রার্থীকে পদোন্নতি দেওয়ার অপচেষ্টা, ভর্তি কার্যক্রমে অনিয়ম, একাডেমিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব না দেওয়া, প্রক্টরিয়াল বডির সম্পূর্ণ পরিবর্তন না করা এবং সিন্ডিকেট সভায় নির্বাচিত সদস্যকে অপমানিত করা।

বর্তমান উপাচার্যের আদি কর্মক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াতেও জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগরের অনেক শিক্ষক সেটি মানতে চাচ্ছেন না। আবার বড় একটি অংশ উপাচার্যের পক্ষেও রয়েছেন।
 
মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিয়েই নোংরা রাজনীতিতে নেমেছেন শিক্ষকরা। প্রশাসনিক পদগুলো বণ্টনের ক্ষেত্রে উপাচার্য ও শিক্ষক সমিতির মধ্যে দ্বন্দ্ব অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। উপাচার্যের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসতে রাজি নয় সমিতি। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরতদের পালে হাওয়া দিচ্ছে অধ্যাপক সলিমুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম।
 
আবার শিক্ষক সমিতিও কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির নীল ও সাদা দল ছাড়াও নীল দলের শিক্ষকরা আরো কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। রয়েছে অধ্যাপক হানিফ আলী এবং অধ্যাপক কামরুল আহসানের পৃথক গ্রুপ।
 
আবার শিক্ষক মঞ্চের ব্যানারে বাম ঘরানার শিক্ষকরা উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনকে দেখছেন শিক্ষক সমিতির অসৎ উদ্দেশ্য হিসেবে।
 
সমিতি সূত্র বাংলানিউজকে জানান, সম্প্রতি সমিতির সাধারণ সভায় শিক্ষক সমিতি তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের পক্ষে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু পরে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেটি অস্বীকার করেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, আলোচনায় বসতে শিক্ষকদের মোট পাঁচ বার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
 
প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করায় শিক্ষক সমিতির কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নীল দলেরই চারজন শিক্ষক, যারা সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

এদিকে, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের মধ্যে আরো একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় উপাচার্যের পদত্যাগ বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন সাধারণ শিক্ষক পর্ষদের ব্যানারে শিক্ষকদের একটি অংশ। ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ রেজা এ অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তার স্বাক্ষর করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়, উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অশোভন বলে তারা এ ধরনের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন।
 
এই দু‘টি অংশের এ ধরনের বিবৃতি প্রদানকে শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন বানচালের একটি কৌশল বলে মনে করছেন শরীফ এনামুল কবিরপন্থি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী ও প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের নেতা সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আমির হোসেন।
 
উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষক সমিতির বর্তমান সভাপতি অজিত কুমার মজুমদারের জড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে পদসংক্রান্ত গুঞ্জনই শোনা যায়।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ  মতিন গ্রুপে ছিলেন অজিত কুমার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উপ-উপাচার্য পদ অধ্যাপক মতিন পাওয়াতে আন্দোলনে নামেন তিনি।

চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ আন্দোলনের পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। প্রশাসনিক ভবন অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আমি মনে করি শিক্ষক সমিতির বোধোদয় হবে এবং এই বেআইনি অবরোধ তারা তুলে নেবেন। যেসব শিক্ষক আন্দোলন করছেন, তারা আলোচনায় বসতে রাজি নন। উপাচার্যের অপসারণ হলেই যদি সব সমস্যার সমাধান হতো, তবে তাই করতাম।’

শেয়ার করুন