প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ পাবেন

0
89
Print Friendly, PDF & Email

দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হলে এবং প্রধানমন্ত্রী যদি দলের প্রধান থাকেন, সে ক্ষেত্রে তিনি ও তাঁর মনোনীত ২০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা নেতা দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী আচরণবিধির যে খসড়া তৈরি করেছে, তাতে এই সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আচরণ-বিধিতে এই সুযোগ রাখা হলে তা হবে বৈষম্যমূলক। এতে নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীন দল বাড়তি সুযোগ পাবে। অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ পাবেন অন্যান্য দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
জানতে চাইলে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, আচরণবিধি এমন হলে নির্বাচনী প্রচারণায় সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে না। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রচারণায় বাড়তি সুযোগ পাবেন। এতে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট হবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হওয়ায় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।
কমিশন সচিবালয় সূত্র জানায়, এই সংশোধনীর ফলে নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের আদেশে কমিশন সচিবালয় থেকে একটি খসড়া আচরণবিধি প্রণয়ন করে তা গত রোববার কমিশনের বৈঠকে উত্থাপন করা হয়।
প্রস্তাবিত আচরণবিধির ২২ ধারায় বলা আছে, সংসদের সাধারণ নির্বাচন বা শূন্য আসনের নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমপদমর্যাদার সরকারি সুবিধাভোগী কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণা বা কাজে অংশ নিতে পারবেন না। তবে একই পদধারী ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রার্থী হলে নিজ এলাকায় প্রচারণার ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য এই বিধান প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া দলীয় প্রধান এবং তাঁর মনোনীত ২০ জন নেতা বা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।
বিদ্যমান আচরণবিধিতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমপদমর্যাদার সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। অতীতে সংসদ ও সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় প্রচারণায় সমান সুযোগ পাওয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি।
কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সংবিধানের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত আচরণবিধি চূড়ান্ত রূপ পেলে সরকারপ্রধান ও দলীয় প্রধান যদি একই ব্যক্তি হন, সে ক্ষেত্রে তিনি সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দেশব্যাপী প্রচারণা চালানোর সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের মনোনীত ২০ জন নেতা/ব্যক্তির তালিকায় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও চিফ হুইপ এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা স্থান পেলে তাঁরাও দেশব্যাপী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বিরোধী দল এ ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবে না।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচনে সব প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেওয়া। প্রধানমন্ত্রীকে যদি বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়, সেই সুযোগ অন্য দলের নেতাদেরও দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের আইন অনসুরণ করা যেতে পারে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে প্রার্থী হলে তিনি সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না। কিন্তু বর্তমান কমিশন যে প্রস্তাব করেছে, তা নিজেদের চিন্তায় করেছে বলে আমার মনে হয় না। অন্যদিক থেকে যে নির্দেশ আসে, তাঁরা সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।’
তবে নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আচরণবিধিতে যাতে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে, সেই বিধানই রাখা হবে। অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু থাকলে তা অবশ্যই বাদ দেওয়া হবে।
সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যাচার, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য নিষিদ্ধ: প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে অন্যান্য ক্ষেত্রেও আরও কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। ৮ বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে কোনো ব্যক্তি কেব্ল টেলিভিশন, প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো প্রচারণা চালাতে পারবে না। মুঠোফোনের এসএমএসের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা যাবে না। অশ্লীল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ই-মেইল পাঠানো নিষেধ। এ ছাড়া ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কোনো মিথ্যাচার চলবে না। ৯ বিধিতে বলা আছে, পোস্টারে প্রার্থীর কোনো অনুষ্ঠান বা মিছিলে নেতৃত্বদান অথবা প্রার্থনারত ভঙ্গিমার কোনো ছবি ছাপানো যাবে না। প্রার্থী নিবন্ধিত দল বা জোটের মনোনীত হলে পোস্টারে তাঁর অনুকূলে বরাদ্দ করা প্রতীক, তাঁর ছবি, দলীয় প্রধানের ছবি বা জোটপ্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন। প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে কোনো ব্যক্তি মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো যাবে না।
প্রস্তাবে নির্বাচনী ‘পোস্টার’-এর সংজ্ঞায় কাগজ, কাপড়, রেক্সিন বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমসহ অন্য কোনো মাধ্যমে তৈরি করা প্রচারপত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র, ব্যানার ও বিলবোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব সময় বলতে সংসদের মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিন থেকে নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কে বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে, মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার দিন থেকে পরবর্তী নির্বাচনের ফল গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কে নির্বাচন-পূর্ব সময় বোঝানো হয়েছে।

শেয়ার করুন