আবারও ফৌজদারি কার্যবিধির আগের ক্ষমতা চাইবেন ডিসিরা

0
78
Print Friendly, PDF & Email

প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করার পর সংক্ষিপ্ত বিচারসহ ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) অন্তত সাতটি ধারার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য আবারও প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসকেরা (ডিসি)।
সরকারের শেষ সময়ে কাল মঙ্গলবার থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ডিসি সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বিশেষ ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য চাওয়া হবে ঝুঁকি ভাতা। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য পুলিশের মতো রেশন-সুবিধা চালুর প্রস্তাব করা হবে।
আগামীকাল থেকে ঢাকায় শুরু হতে যাওয়া তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনের বিষয়ে অন্তত ২০ জন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের এই ভাবনা ও প্রস্তুতির তথ্য জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া বাকিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন।
জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘দিনবদলের সনদ’ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তার একটা মূল্যায়ন এ সম্মেলনে করা হবে। সরকারি নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তারা এ জন্য এ সম্মেলনকে বেশ তার্যাপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইতিমধ্যে সব বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের কাছ থেকে সম্মেলনে আলোচনার জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে সরকারের সব মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও বিভাগীয় কমিশনাররা উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষ হলে বাকি পর্বগুলো সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে হবে। সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছরই ডিসিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। এটা কোনো দাবি আদায়ের ফোরাম নয়। যেসব বিষয় আলোচনার উপযোগী, সেগুলোই কেবল এখানে আলোচনা হবে।
এই সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হবে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের আরপিও যথাযথভাবে পালন করা। ভোটকেন্দ্রগুলোতে যাতে ভোটাররা সুশৃঙ্খলভাবে এসে ভোট দিতে পারেন, সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের আগাম ব্যবস্থা নেওয়া।
ফৌজদারি কার্যবিধির বেশ কিছু ক্ষমতা ফিরে পেতে চেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন রংপুর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসকেরা। বিচার বিভাগ আলাদা করার পর থেকেই আরও কিছু বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবি করে আসছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের হাতে যদি কিছু ক্ষমতা না থাকে তাহলে আমাদের কাজ করতে সমস্যা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে যেকোনো অপরাধের বিচার দ্রুত হয়, ইভ টিজিংয়ের ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা দেওয়ায় আমরা এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে এমন ক্ষমতা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না।’
কয়েকজন জেলা প্রশাসক জানান, বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পর মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য তাঁরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা বাড়াতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১৫৬ (আমলযোগ্য মামলার তদন্ত), ১৫৯ (তদন্ত বা প্রাথমিক অনুসন্ধান করার ক্ষমতা), ১৯০(১)(এ)(বি)(সি) (ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়া তর্যাপরবর্তী কিছু ক্ষমতা), ১৯১ (আসামির আবেদনক্রমে মামলা হস্তান্তর), ১৯২(২) (প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক কোনো মামলা আমলে নেওয়া ও বিচারসংশ্লিষ্ট কিছু ক্ষমতা), ২০২ (পরোয়ানা দান স্থগিত রাখা) এবং ২৬০-২৬৫ (সংক্ষিপ্ত বিচারসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষমতা) ধারায় ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ার চান। ডিসিরা দাবি করেন, এসব ধারা প্রয়োগের ক্ষমতা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একাধিক জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁরা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আগের মতো ক্ষমতা না থাকায় পুলিশ জেলা প্রশাসনের কোনো কথা শুনতে চায় না। এতে অনেক ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে।
রংপুরের ডিসি ফরিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসিকে জেলা পুলিশ, জেলা বিশেষ শাখা (এসবি), র্যাব ও আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে জেলা পুলিশ ও এসবির প্রতিবেদন ডিসিরা পেলেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন তাঁরা পান না। এতে করে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার্যাক্ষণিকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সমস্যা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ঝুঁকি ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক। যুক্তি হিসেবে তাঁরা বলেছেন, মাঠ প্রশাসনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ত্রাণতর্যাপরতা পরিচালনাসহ জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। এ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঝুঁকি ভাতা পেলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তা পান না।
জেলা প্রশাসনের আওতাধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য পুলিশ বিভাগের মতো রেশন প্রথা চালুর প্রস্তাব করেছেন নাটোরের জেলা প্রশাসক। তিনি বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের জন্য বিশেষ ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকির্যাসাবিমা চালুসহ সন্তানের শিক্ষা ভাতা চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি। পাবনার জেলা প্রশাসক সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানোসহ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর মতো বেতন-ভাতা ও রেশন দেওয়া এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
টাঙ্গাইলের ডিসি আনিসুর রহমান প্রস্তাব করেছেন, প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা সরকারি স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আদালত অবমাননার মামলার মুখোমুখি হওয়াসহ বিভিন্নভাবে নাজেহাল হয়েছেন। এ ধরনের মামলার সব খরচও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া হোটেল ও রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স ফি বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক তাঁর প্রস্তাবে বলেছেন, সচিবালয় কিংবা মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের একনাগাড়ে বহাল না রেখে পর্যায়ক্রমে মাঠে ও সচিবালয়ে পদায়ন করা প্রয়োজন। এতে কর্মকর্তারা মাঠ ও কেন্দ্রে কাজ করার সমান সুবিধা পাবেন।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক আনিস মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, হাওর এলাকা হওয়ায় ওই এলাকার মানুষের বছরের একটা সময় কোনো কাজ থাকে না। তখন অনেকেই জুয়া খেলে দিন পার করেন। বিদ্যমান জুয়া আইনে শাস্তি মাত্র ২০০ টাকা জরিমানা। তিনি এই জরিমানা ও শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
কুমিল্লা ও বগুড়ার প্রশাসকেরা প্রস্তাব দিয়েছেন, সরকারের স্বার্থে জিপি, পিপি নিয়োগ ও তাঁদের দায়িত্ব/ক্ষমতাসংক্রান্ত বিষয়গুলো নীতিমালার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক তাঁর প্রস্তাবে আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী নারীদের জন্য অপেক্ষা, প্রার্থনা ও বাচ্চাদের খাওয়ানোর কক্ষ নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়নি তবে সুযোগ পেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলবেন বলে প্রথম আলোকে জানান একাধিক ডিসি। একজন ডিসি বলেন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে নিয়োগ দেবে? পুলিশ সদর দপ্তর, নাকি উপজেলা চেয়ারম্যান, না সাংসদ? দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বছরের পর বছর ওসিদের একই এলাকায় রেখে দিচ্ছেন। কোনো অপরাধের জন্য বদলি করা হলেও পরে তাঁরা ফিরে আসছেন আগের কর্মস্থলে। ফিরে এসে তাঁরা আর ডিসিদের কোনো কথাই শুনছেন না।
উত্তরাঞ্চলের একজন জেলা প্রশাসক বলেন, কাজ করার ক্ষমতা দিতে হবে। দেখা যাচ্ছে, কোনো এলাকায় বন্যা হলো, দুই বান্ডেল টিন লাগবে। সাংসদের সুপারিশ ছাড়া ওই টিন দেওয়া যাবে না। কিন্তু সাংসদ গিয়ে বসে আছেন ঢাকায়। এর সুরাহা কী?
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, জেলা পর্যায়ে যেসব বেসরকারি সংস্থা কাজ করে, সেগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো এখতিয়ার নেই। এ বিষয়ে ডিসিদের প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন।

শেয়ার করুন