পরস্পরবিরোধী অবস্থানে অনড় আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতারা : লন্ডনে মানবাধিকার নিয়ে সেমিনার

0
87
Print Friendly, PDF & Email

রাজপথে সহিংসতার বদলে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত পোষণ করলেও নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে অনড় রয়েছেন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। বুধবার রাতে লন্ডনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে তাদের এই অনড় অবস্থান প্রকাশ পায় বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
হাউস অব লর্ডসের একটি কমিটি কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারের আয়োজক ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে অভিহিত করে উভয় দলকে স্থানীয়ভাবে এর সমাধান খুঁজে নেয়ার আহ্বান জানান। তবে বিএনপি বলেছে, দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয় এবং সে ক্ষেত্রে দেশে যে অনিশ্চয়তা ও সংকট তৈরি হবে, তা এড়াতে হলে বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুদের উদ্যোগী হতে হবে।
সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার উদ্যোগটি যথার্থ এবং এই উগ্রবাদীদের উত্থানের চেষ্টাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি। এ সময়ে সাম্প্রতিককালের সহিংসতার কিছু ছবিসংবলিত ‘বাংলাদেশে জামায়াতের ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত’ এবং ‘একটি দুঃস্বপ্ন : বিএনপি-জামায়াত জোটের নৃশংসতা, সহিংসতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ’ শীর্ষক দুটি ইংরেজি প্রকাশনা সভায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের রাজনীতির কারণে সাম্প্রতিক সহিংসতার বিষয়ে বিএনপির প্রতি আওয়ামী লীগের অঙুলি নির্দেশের জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জামায়াতের কোনো কাজের দায়িত্ব বিএনপির নয় এবং সে বিষয়ে তাদের কাছেই জবাবদিহি চাওয়া উচিত। তা ছাড়া বিএনপি হেফাজতের প্রতিনিধিত্বও করে না।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট লর্ড অ্যাভবেরি। কো-চেয়ার ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বাংলাদেশবিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির চেয়ারম্যান এবং কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অ্যান মেইন এমপি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের মধ্যে ছিলেন দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও কার্যক্রম বিষয়ে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক লর্ড কার্লাইল, ব্যারোনেস মঞ্জিলা পলাউদ্দিন, রুশনারা আলী ও জেরেমি করবিন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ড. চার্লস ট্যানক।
আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারসহ আবদুল মতিন খসরু, সাবের হোসেন চৌধুরী ও তারানা হালিম বক্তব্য দেন।
বিএনপির পক্ষে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শমসের মবিন চৌধুরী, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নিতাই রায় চৌধুরী, আবদুল মান্নান, নাসিরুদ্দিন অসীম, নওশাদ জমির ও মনীষ দেওয়ান বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশবিষয়ক গবেষক আব্বাস ফয়েজ সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার বিষয়ে বাংলাদেশে তার সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
সেমিনারের শুরুতে লর্ড অ্যাভবেরি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির পথে যেসব সমস্যা প্রকট রূপ লাভ করেছে, সেগুলো তুলে ধরেন। লর্ড অ্যাভবেরি রাজপথে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রবণতাকে সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অভিহিত করে এই ধারা পরিত্যাগ করে সংসদে তা সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্য সমস্যাগুলোর মধ্যে কর ফাঁকি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সমস্যার কথা উল্লেখ করে লর্ড অ্যাভবেরি আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার কথা বলেন। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক জরিপে বাংলাদেশে দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, দুর্নীতির শীর্ষে রাজনৈতিক দলের অবস্থান এবং তারপর পুলিশ ও বিচার বিভাগের অবস্থান উদ্বেগজনক।
পদ্মা সেতুর প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে লর্ড অ্যাভবেরি বলেন, অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার বিষয়ে ‘ওপেন ডেমোক্রেসি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বলেন, এ ক্ষেত্রেও দুর্নীতিই প্রধান কারণ। কেননা, ভবন নির্মাণের অনুমতি ও তদারকিতে দুর্নীতি রয়েছে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে লর্ড অ্যাভবেরি বলেন, এই বিচার আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারেনি। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিফেন র‌্যাপের পরামর্শ অনুসরণে ব্যর্থতার কারণে এই বিচারের রায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তিনি ধর্মীয় উগ্রবাদ, বিশেষ করে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলেও উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লেবারদলীয় এমপি রুশনারা আলী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধে ব্রিটিশ এমপিদের দলে টানার চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে করে উল্টো ফল হচ্ছে। ব্রিটিশ এমপিদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে উৎসাহী হন না এই আশঙ্কায় যে, তিনি যে মতপ্রকাশ করবেন তা কারও পছন্দ না হলে তাকে দলীয় পক্ষপাতিত্বের জন্য অভিযুক্ত করা হবে। লেবার পার্টির আরেকজন এমপি জেরেমি করবিন নির্বাচনী প্রচারণা যেন রক্তপাত না ঘটায়, সেদিকে নজর দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে এইচটি ইমাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সাম্প্রতিক লন্ডন সফরকালে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই বলে যে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যে নিয়মে নির্বাচন হয়, সেই নিয়মেই বাংলাদেশে নির্বাচন হবে।
এর জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এমন কোনো গণতান্ত্রিক দেশ নেই, যেখানে বিরোধী দলের নেতাদের বারবার নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয়, সভা করতে দেয়া হয় না এবং সমাবেশ ভেঙে দিতে পুলিশ সরাসরি গুলি ছোঁড়ে। অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাতেই ভালো নির্বাচন হয় এবং সাম্প্রতিক নগর নির্বাচনগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে যে রায় এসেছে তার অন্যতম কারণ, তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে সরকারের অবস্থানকে জনগণ সমর্থন করে না।
এইচটি ইমাম এবং দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উভয়েই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বাংলাদেশে সম্ভব হলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করে বলেন, বিএনপি সংসদে ফিরে আসায় আবারও রাজনীতি আলাপ-আলোচনার ধারায় ফিরে এসেছে।
নির্বাচনকালীন প্রশাসন বিষয়ে বিএনপি প্রস্তাব উত্থাপনের পর তা প্রত্যাহার করে নেয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, এর ফলে আলোচনার একটা সুযোগ নষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা সাম্প্রতিক নগর নির্বাচনগুলোয় বিএনপির সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, এসব নির্বাচন প্রমাণ করেছে, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও স্বাধীন গণমাধ্যমের নজরদারির মধ্যে নির্বাচনে কোনো অনিয়ম করা সম্ভব নয়। সে কারণেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই।
জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, গত ডিসেম্বরে হাউস অব লর্ডসে অনুষ্ঠিত একই ধরনের সেমিনারে সমঝোতা হয়েছিল যে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে দুই দলের মধ্যে সংলাপ হবে। কিন্তু তা হয়নি বরং সংকট ঘনীভূত হয়েছে। তিনি জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব সংলাপের উদ্যোগ নিয়ে তার বিশেষ দূত তারানকোকে দুবার বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। তারানকো প্রধানমন্ত্রীসহ উভয় দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সংলাপের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই আশাবাদে পানি ঢেলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থানের বিপদ সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানরাও তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। তবে এ বিষয়ে বিএনপির নেতারা কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সংকট নিয়েও ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানরা উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিষয়ে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান।
যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের প্রায় সবাই বলেন, মানবতাবিরোধী এই ঘৃণ্য অপরাধের বিচারের উদ্যোগকে তারা সব সময় সমর্থন করলেও বিচার-প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় আইনবিদ লর্ড কার্লাইল বলেন, ব্রিটিশ আইনজীবীদের মধ্যে এ বিষয়ে সাধারণভাবে ধারণা জন্মেছে যে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণে ব্যর্থ হওয়ায় এই বিচারের রায়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ ছাড়া মৃত্যুদ-কে সমর্থন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সূত্র : ওয়েবসাইট

শেয়ার করুন