ও ছিল আমার দুরন্ত এক পাগল ছেলে

0
95
Print Friendly, PDF & Email

সুন্দর পরিপাটি দ্বিতল বাড়িতে প্রবেশ মুখে কালো রঙের লোহার গেট। ভিতরে ঢুকতেই একটি তেঁতুল, শিমুল ও নারকেল গাছ। নিচতলার প্রধান ফটকের সামনে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের প্রতিচিত্র। শুক্রবার তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বৃহস্পিতবার পল্লবীর বাসায় কথা হয় তার মা আয়েশা ফয়েজের সঙ্গে। কুশল জিজ্ঞাসা করতেই বলেন, বৃদ্ধ মানুষ, এ বয়সে আর কেমন থাকবো? ১৯৩০ সালের ২৩শে মার্চ আমার জন্ম। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। নিজেই প্রিয় ছেলের প্রসঙ্গ তোলেন। বলেন, ও ছিল আমার দুরন্ত এক পাগল ছেলে। পাগলামি করতে খুব ভালবাসতো। তবে সে পাগলামিটা ছিল আনন্দের এবং সৃষ্টি সুন্দরের। ভাল কিছু সৃষ্টি করলে আমাকে প্রথমে জানাতো। আমি ওকে উৎসাহ দিতাম। আমার প্রতি খোকার বড় টান ছিল বলতেই তার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে।  তিনি আরও বলেন, মায়ের  চোখের সামনে না ফেরার দেশে চলে গেছে খোকা। কোনদিনই মায়ের কাছে ফিরবে না। মায়ের চোখের সামনে ছেলের মৃত্যুর দুয়ারে প্রস্থান অনেক কষ্টের। এখন আমার বেঁচে থাকার প্রতিটি সময় বেদনাদায়ক। একজন সন্তান হারানো মায়ের পক্ষে সম্ভব সেই যন্ত্রণা অনুভব করার।  ঘুমের ঘোরে এখনও খোকাকে স্বপ্নে দেখি। ও আমাকে মা বলে ডাকে। খোকার ডাকে রাতে অনেক সময় ঘুম ভেঙে যায়। রাত্রি জাগি। মনে হয় আমার খোকা আসছে। আবার নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ি। হুমায়ূন আহমেদের ছেলেবেলার একটি স্মৃতি প্রসঙ্গে বলেন, ছোটবেলায় বৃষ্টির পানিতে ভেজার জন্য তার মেদি জ্বর হয়। আজকের দিনের মতো সুচিকিৎসার ব্যবস্থা তখন ছিল না। খোকার শরীরের তাপমাত্রা দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এ সময় ছেলে মাকে চিনতে পারেনি। শরীর এতটাই ভেঙে গিয়েছিল মা হয়ে ছেলেকে আমিও চিনতে পারিনি। ছেলের বিভিন্ন লেখা প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের সময়ে নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছি কম। খোকার লেখার বিভিন্ন বই আমাকে পরিবারের সদস্যরা পড়ে শুনিয়েছে। আমি নিজের থেকে ওর যত বই পড়েছি ভাল লেগেছে। হয়তো নিজের ছেলে বলে ওর প্রতিটি লেখা আমার কাছে প্রিয় ও ভাল লেগেছে। কিন্তু খোকার পাঠক ভক্তদের যদি লেখা ভাল লেগে থাকে সেখানেই হুমায়ূন পরিবারের সার্থকতা।
আয়েশা ফয়েজ বলেন, আমাকে প্রায় বলতো, মা মানুষকে কেন দুনিয়া ছেড়ে যেতে হয়! এত অল্প সময়ে সমাজকে ভাল কিছু দেয়া যায় না। কৌতূহল প্রকাশ করে বলতো, মা আমি তোমার কাছে থাকতে চাই। আমাকে আঁকড়ে ধরে রেখো। আমি মরতে চাই না। কিন্তু মৃত্যুকে কখনও ধরে রাখা যায় না। আমিও পারিনি। আমার চোখের সামনে খোকা চলে গেছে। কেবল একরাশ স্মৃতি নিয়ে অসহায় মা হয়ে বেঁচে আছি।  চোখের পলকে একটি বছর পার হতে চলেছে। আপনারা সকলে আমার সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। কবরে যেন ওর আত্মা শান্তিতে থাকে। আমার প্রয়াত সন্তান হুমায়ূনের ইচ্ছা ছিল একটি ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরি করার। সেটা সে তৈরি করতে পারেনি।
হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে আপনার কোন ইচ্ছা আছে কি? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, একটি হুমায়ূন স্মৃতি মিউজিয়াম। বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের কথা সকলকে মনে রাখার জন্য প্রয়োজন এ মিউজিয়াম।  যেখানে থাকবে হুমায়ূনের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থ। তার ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিসপত্র, তার নির্মাণ করা নাটক, সিনেমা, গান এবং লেখকের স্টিল ক্যামেরার ছবি।
এদিকে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে মিরপুরের পল্লবীর বাসায়  কোরআন খতম, এতিমদের জন্য ইফতার, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে তার পরিবার। এ ছাড়া নুহাশ পল্লীতে এতিম শিশুদের জন্য ইফতার ও রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে বলে পরিবারিক সূত্র জানায়। ২০শে জুলাই ধানমন্ডি বেঙ্গল গ্যালারিতে বাংলাদেশ প্রকাশক সমিতি বিকাল চারটায় হুমায়ূন স্মৃতিচারণ করে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এ প্রসঙ্গে বিপন্ন উদ্ভিদ গবেষক ও সংরক্ষক প্রফেসর আখতারুজ্জামান চৌধূরী জানান, ‘নুহাশ পল্লী এবং একজন হুমায়ূন আহমেদ’ নামে একটি বই খুব শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সারমর্ম প্রসঙ্গে বলেন, নুহাশ পল্লীতে দুর্লভ প্রজাতির অনেক ওষধি গাছ আছে। দেশের অন্য কোথাও তার সন্ধান দুর্লভ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, হুমায়ূন আহমেদের ৬৪তম জন্মদিনকে স্মরণ করতে বইয়ে ৬৪টি বিরল জাতের গাছের বিবরণ থাকছে। এ ছাড়া গ্রন্থে হুমায়ূন আহমেদের পিতা শহীদ ফয়েজুর রহমান আহমেদ ডায়েরি, তার পরিবারের অতীত ও বর্তমান, হুমায়ূন আহমেদের নাটক, গান, ছবি সকল তথ্য সঙ্কলন করা হয়েছে বইতে। বইটির ভূমিকা লিখেছেন আয়েশা ফয়েজ।

শেয়ার করুন