চট্টগ্রাম আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন সাজ্জাদ ফের আলোচনায়

0
91
Print Friendly, PDF & Email

প্রায় এক দশক পর আবার আলোচনায় চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন সাজ্জাদ আলী খান। এক সময়কার মূর্তিমান আতংক, র‌্যাব ও পুলিশের তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ এই শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশ ছেড়ে পালিয়েছে ৯ বছর আগে। গত বছরের নভেম্বরে ধরা পড়ে ভারতে। এরপর থেকে বন্দি রয়েছে দিল্লির তিহার কারাগারে। অনেক চেষ্টার পর বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ‘মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি’ এবং বহুল আলোচিত ভয়ংকর এই টপ টেররকে হাতে পাচ্ছে বাংলাদেশ। বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শীর্ষসন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সঙ্গে সাজ্জাদকেও ফেরত দিচ্ছে ভারত। বিনিময়ে উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অনুপ চেটিয়ার বিনিময়ে সুব্রত ও সাজ্জাদকে হস্তান্তরের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। গত দুদিন ধরে নয়াদিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেও বন্দি প্রত্যর্পণের বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যে কোনো দিন সুব্রত-সাজ্জাদ ও অনুপ চেটিয়াকে নিজ নিজ দেশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদকে নিয়ে চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। র‌্যাব-পুলিশ-গোয়েন্দারা অপেক্ষায় রয়েছে কখন সাজ্জাদকে দেশে ফেরত আনা হবে। ভয়ংকর এই শীর্ষসন্ত্রাসীর নৃশংসতা আর নানা অপকীর্তির কথা আবারও সবার মুখে মুখে ফিরছে। দেশে আনার পর তার পরিণতি কি হবে তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। কারণ সারা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি এই সাজ্জাদ। যদিও এসব ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে নারাজ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, বন্দি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শীর্ষসন্ত্রাসী সাজ্জাদ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল। তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে। যেহেতু সাজ্জাদের প্রায় সব মামলা চট্টগ্রামে, দেশে ফেরত আনার পর হয়তো চট্টগ্রাম পুলিশের হাতে দেয়া হতে পারে। যদিও তা নিশ্চিত নয়।
কারণ পুরো বিষয়টিই মনিটরিং করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে জানান, সাজ্জাদ কখন গ্রেফতার হয়েছিল, কয়টি মামলা আছে, সাজা সংক্রান্ত সব ডকুমেন্ট চেয়েছিল পুলিশ সদর দফতর। এরপর সাজ্জাদকে হস্তান্তর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে আর কিছু জানানো হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতে পালিয়ে থাকা ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা সে দেশের সরকারকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে সবার ওপরে ছিল সুব্রত বাইন ও সাজ্জাদের নাম। ভারত যদি তাদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয় তাহলে তা হবে বন্দি প্রত্যর্পণের প্রথম ঘটনা। এরমধ্যে একজন আবার চট্টগ্রাম আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সাজ্জাদ। সে কারণে তাকে নিয়ে চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা।
সাজ্জাদ দেশে না থাকলেও চট্টগ্রামে বরাবরই সক্রিয় তার সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। গত বছরের আগস্ট মাসে অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেলসহ সাজ্জাদের দুই সহযোগী সরওয়ার ও ম্যাক্সনকে নগরীর অক্সিজেন এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছিলেন সিএমপির বায়েজিদ থানার তৎকালীন ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম। ওসি মহিউদ্দিন সেলিম যুগান্তরকে জানান, শীর্ষসন্ত্রাসী সাজ্জাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১৮টি। সে দুবাই পালানোর পর তার পক্ষে সেকেন্ড ইন কমান্ড ম্যাক্সন ও সরওয়ারই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করত। প্রবাসীরা জমি কিনলে এক দফা, বাউন্ডারি ওয়াল তুললে এক দফা, বাড়ি করলে আরেক দফা চাঁদা দিতে হয় তাদের। অনেক সময় দেশে, আবার অনেক সময় বিদেশে পেমেন্ট হয়। নাসিরাবাদ, বায়োজিদ, অক্সিজেন এলাকার সব ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এমনকি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরও প্রাণ ভয়ে সাজ্জাদের বাহিনীকে চাঁদা দেয়। ওসি মহিউদ্দিন সেলিম জানান, দুবাইয়ে পলাতক অবস্থায় এক গুজরাটি মেয়েকে বিয়ে করে সাজ্জাদ। সে সুবাদে দুবাই-ভারত আসা যাওয়া করত। এরই ফাঁকে গত বছর নভেম্বর মাসে ইন্টারপোলের হাতে ধরা পড়ে।’
জানা গেছে, সাজ্জাদ সর্বশেষ গ্রেফতার হয়েছিল ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর।
নগরীর চালিতাতলী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের পর সহযোগী দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার আজরাইল দেলোয়ারসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একে-৪৭ রাইফেল। তিন বছর কারাভোগ শেষে সাজ্জাদ ২০০৪ সালে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার র‌্যাব গঠন করে অভিযান শুরু করলে সাজ্জাদ দুবাইয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহুল আলোচিত পাঁচলাইশ ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান হত্যাকাণ্ডেও নেতৃত্ব দিয়েছিল সাজ্জাদ ও আরেক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার ফাইভ স্টার জসিম। এর কিছুদিন পর নগরীর বহদ্দারহাট মোড়ে মাইক্রোবাসে ব্রাশফায়ারে ছাত্রলীগের ৮ নেতাকে হত্যা করে সাজ্জাদের নেতৃত্বে সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা। যা দেশ-বিদেশে এইট মার্ডার নামে পরিচিত। এ মামলায় আদালত সাজ্জাদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

শেয়ার করুন