কক্সবাজার এইডস ঝুঁকিতে

0
206
Print Friendly, PDF & Email

কক্সবাজার এইডস ঝুঁকিতে রয়েছে। এই জেলায় পেশাদার-অপেশাদার যৌনকর্মী ও মাদকাসক্তদের অবাঁধ যৌনাচারের কারণে বর্তমানে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা ৬৯ জন বলে জানা গেছে। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত এইডস আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২৫-২৬ জন। এইচআইভি-এইডস নিয়ে কাজ করা সংগঠন চট্টগ্রাম আশার আলো সূত্রে জানা গেছে ভয়াবহ এ চিত্র। তবে কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজারে এইচআইভি-এইডস আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ জন। এইডস আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার কোন তথ্য তাদের জানা নেই।

যে জরিপই সত্য হোক, কক্সবাজার যে ভয়াবহ এইডস ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এ নিয়ে কারও কোন দ্বিমত নেই। জেলার যৌনকর্মী ছাড়াও পর্যটন শহর হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে টাকা আয়ের উদ্দেশ্যে যৌন কর্মীদের ব্যাপক হারে কক্সবাজার আগমন এই ঝুঁকির অন্যতম কারণ। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে ৩২ শতাংশ যৌনকর্মী এইডস রোগে আক্রান্ত। কক্সবাজারের সর্বত্র রোহিঙ্গাদের ছড়াছড়ি। এ কারণেও কক্সবাজারকে এইডস রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে মনে করা হয়।

কয়েক বছর আগে কয়েকটি এনজিওর এইচআইভি-এইডস নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে অনেক এনজিও এইডস বিরোধী কার্যক্রম ও প্রচারণা থেকে তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে জেলায় ভাসমান এনজিওদের নিয়ে কাজ করা একমাত্র এনজিও দুর্জয় নারী সংঘ তাদের কাজকর্ম চালিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য তেমন সাফল্য তাদের নেই। এরা কাজ করে মূলত ভাসমান যৌন কর্মীদের নিয়ে। শহরের কলাতলীতে নোঙর নামক একটি এনজিও মাদকাসক্তদের মধ্যে এইচআইভি ঝুঁকি কমাতে কাজ করে। মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করতো পদক্ষেপ নামের আরও একটি সংগঠন।

পরে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এসকাস নামের আরেকটি সংগঠন মাদকাসক্তদের নিয়ে এবং সিলেট যুব একাডেমি নারী যৌন কর্মীদের নিয়ে কাজ করে। বন্ধু সোশ্যাল ফেয়ার (এমএফএম) নামক একটি এনজিও সমকামীদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি কমাতে কাজ করছে।
এছাড়া মেরিস্টোপ, সূর্যের হাসি ক্লিনিক, এফপিএবি নামক এনজিওগুলো স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এইডস নিয়ে কাজ করে বলে জানা গেছে। এদিকে বিদেশী সাহায্য সংস্থা ইউএফএআইডির সহায়তায় বেসরকারি পর্যায়ে নোঙর এইডস শনাক্তকরণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে এলেও গত সেপ্টেম্বর থেকে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে নোঙরের পরিচালক দিদারুল আলম রাসেদ বলেন, বিদেশী সাহায্য সংস্থা ইউএফএআইডির সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় টেস্টসহ অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

কার্যক্রম চালু অবস্থায় নোঙর থেকে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৩শ’র মতো মানুষকে বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। তিনি এইডস শনাক্তকরণ সহ এ পর্যন্ত তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৭ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্তকরণ করার কথা জানান। তিনি জানান, শনাক্ত করা রোগীকে তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে আশার আলোতে পাঠিয়ে দেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেসরকারি পর্যায়ে আশার আলো এনজিও এইডস আক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য কাজ করে থাকে। আশার আলো চট্টগ্রাম অফিসের ডিভিশনাল কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ আলী জানান, কক্সবাজারে ভয়াবহভাবে এইডস বিস্তার লাভ করছে।

তিনি জানান, গত মে মাস পর্যন্ত কক্সবাজারে এইচআইভি-এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৯ জন। এ পর্যন্ত এ রোগে মারা গেছে ২৫ জন। বাকিরা তাদের চিকিৎসা সেবা নিয়ে গেছেন বলে জানান তিনি। এদিকে ভাসমান যৌনকর্মী ছাড়াও বিদেশ থেকে অনেকেই এইডস আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরে আসছেন। যাদের অনেকেই বিদেশে অবস্থানের সময় সেখানকার যৌনকর্মীদের সঙ্গে অবাঁধে মেলামেশা করে এসব রোগ দেশে বহন করে এনেছে। এইচআইভি সংক্রামক রোগ হওয়ায় এসব ব্যক্তির কারণে তাদের স্ত্রীদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এইচআইভি নিয়ে কাজ করা এনজিওদের কাছ থেকে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ২ হাজারের মতো যৌনকর্মী রয়েছে।

যাদের বেশিরভাগের এইচআইভি সম্পর্কে স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই। ফলে এদের মধ্যে কতজনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস রয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও সমকামীদের বিষয়টি অনেকেই জানে না অথবা জানলেও লজ্জায় অনেকেই মুখ খোলে না বলেও জানা যায়।
গত ১১ই জুলাই বিকেলে কক্সবাজারের অভিজাত হোটেল ওশান প্যারাডাইসের সম্মেলন কক্ষে এইচআইভি-এইডস ঝুঁকিতে জনসংখ্যা, আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য রোধে মিডিয়ার করণীয় শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

পিএল এইচআইভি নেটওয়ার্ক, ভোরের কাগজ, সেক্সওয়ার্কারস নেটওয়ার্ক এবং ইউএন এইডস বাংলাদেশ যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় প্রধান রিসোর্সপার্সন ছিলেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, দৈনিক ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। তিনি বলেন, শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি মানেই নিশ্চিত মৃত্যু এমন ধারণা মানুষের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তা মোটেও সঠিক নয়।

একজন মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে তার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে এটি কোন ভয়াবহ রোগ নয়। শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের জীবাণু থাকলেও সঠিকভাবে চিকিৎসা করালে ১৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত অনেকেই বেঁচে থাকতে পারেন।
এইচআইভি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মুনির আহমেদ জানান, এইডস রোগীদের নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। তাই রোগীরা সহজে অন্য রোগীদের মতো খোলামেলাভাবে চিকিৎসকদের কাছে আসতে চান না। গোপনীয়তার মধ্যে চিকিৎসা করান। ফলে রোগটি নিয়ে মানুষের মাঝে এখনো আতঙ্ক এবং লজ্জা ও হীনমন্যতা রয়েছে।

কর্মশালায় ইউএনএইডসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১২ সালে এইচআইভি আক্রান্ত ৩৩৮ জন এবং এইডস আক্রান্ত ১০৩ জন রোগী চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১৩ জন পুরুষ, ১১৮ জন নারী। অন্যান্য (হিজড়া) ৭ জন।
ইউএনএইডসের মতে, ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাবিশ্বে ২ হাজার ৮৭১ জন এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছে। এইডস রোগে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২০১ জন। আর এ রোগের কারণে মারা গেছে ৩৯০ জন। সংস্থাটি জানায়, রাজধানী ঢাকায় প্রায় ২ কোটি লোকের বাস হলেও সেখানে এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন ১২৮ জন। এর বিপরীতে চট্টগ্রামে প্রায় ৭০ লাখ লোকের বসবাস।

এখানে এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত শনাক্ত করা হয়েছে ৮৪ জন। ঢাকার আনুপাতিক হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগে এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা উদ্বেগজনক। ইউএনএইডসের সোস্যাল মোবিলাইজেশন এন্ড পার্টনারশিপ অ্যাডভাইজার ও এইচআইভি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মুনির আহমেদ বলেছেন, শুধু যৌন মিলন নয়, নেশাগ্রস্তদের সুই সিরিঞ্জের মাধ্যমেও এইচআইভি সংক্রমিত হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজার পর্যটন শহর হওয়ায় মাদকদ্রব্যের ব্যবহার আশঙ্কাজনক। মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যাও বিপুল। মাদকসেবীরা ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে।

ইনজেকশনে মাদক সেবনের কারণেও এইচআইভি ছড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করে। ফলে মাদকসেবীরা সবচেয়ে বেশি এইচআইভি ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকসেবীও একজন রোগী। চিকিৎসার মাধ্যমে তাদেরও ভাল করে তোলা যায়।
ইউএনএইডসের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৪ জন, খুলনা বিভাগে ৬০ জন, সিলেটে ৪১ জন, বরিশালে ১২ জন ও রংপুরে ২ জন এইচআইভি এইডসের রোগী রয়েছেন।

ইউএনএইডসের দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে বিবাহিতদের সংখ্যাই বেশি। শতকরা হারে ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। অবিবাহিতদের মধ্যে এ সংখ্যা ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, এইচআইভি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সচেতন করতে না পারলে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. কাজল কান্তি বড়ুয়া জানিয়েছেন, কক্সবাজার এইডসের জন্য বিপজ্জনক এলাকা।

শেয়ার করুন