আমি কাঁদছি কেন?

0
74
Print Friendly, PDF & Email

আজ আমি বারবার চোখ মুছছি কেন? আমার পাশের রুমে বসে জাহিদ রেজা নূর কেন কাঁদছেন, আমি জানি। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তিনি, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন, পাঁচ বছর বয়সের সেই অন্ধকার ভোরটাকে তিনি জীবনেও ভুলতে পারবেন না, যখন তাঁদের দরজায় ধাক্কা পড়ল, আলবদররা ধরে নিয়ে গেল তাঁর পিতাকে, সেই ঘাতকদের বিচার হোক, তাঁরা তো চাইবেনই। ৪২ বছর পরে বিচারের রায় তো তাঁদের কাঁদাবেই।

কিন্তু আমি কেন কাঁদি। আমি দুর্বল-চিত্তের লোক। আমি সব সময় ন্যায়-বিচার চাই, ইনসাফ চাই, জাস্টিস চাই বলে চিত্কার করেছি, কখনো ফাঁসি চাইতে পারি নাই। নিষ্ঠুরতা জিনিসটা আমার মধ্যে একটু কম আছে।

কিন্তু আজকে আমার চোখ বারবার ভিজে যাচ্ছে।

আমি গত ২০ বছরে পাবলিকলি, একেবারে লোকসমক্ষে ও ক্যামেরার সামনে, কেঁদেছি মাত্র একবার। আপনারা জানেন, আমি ‘মা’ নামের একটা উপন্যাস লিখেছি। সেই বইয়ে আজাদ নামের এক যুবকের কথা আছে, যার বন্ধু ছিল রুমী, বদি, জুয়েল, কাজি কামাল, হাবিবুল আলম। পাকেচক্রে আজাদও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেয়। ১৯৭১ সালের ২৯ ও ৩০ আগস্ট ঢাকা শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘিরে ফেলে। আজাদদের বাড়িতে গোলাগুলি হয়েছিল, কাজি কামাল গুলি করে নগ্নদেহে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। আজাদ ধরা পড়েছিল, আজাদদের বাড়ি থেকেই মুক্তিযোদ্ধা ক্রিকেটার জুয়েলসহ কয়েকজন ধরা পড়ে। ওই অভিযানেই গ্রেপ্তার হয় রুমী, বদি, বাকের প্রমুখ বিভিন্ন বাসা থেকে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদকে ধরা হয় ভোরবেলা।

ওদেরকে প্রথমে রমনা থানায়, পরে তেজগাঁও ড্রাম ফ্যাক্টরিতে আনা হয়। অকথ্য অত্যাচার চলে তাদের ওপর। আজাদ ধরা পড়ার পর তার মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়েছিল। মা তাকে বলেছিলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা, কোনো কিছু স্বীকার করবে না।’ মা ভাত নিয়ে গিয়ে দেখেন ছেলে নেই, এই ছেলে আর কোনোদিনও ফিরে আসেনি। এই মা আর কোনোদিন ভাত খাননি।

এই উপন্যাস লেখার জন্য আমি একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যাই, সাক্ষাত্কার নিই। আজাদদের পরিবারের অনেকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়, সেটা এখনো বিদ্যমান। কাজি কামাল, হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমি নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ি।

২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই আমরা একটা অনুষ্ঠান করি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। আমার কাছে শহীদ আজাদের কতগুলো ডকুমেন্ট ও ব্যবহূত জিনিস আছে, তা অর্পণ করার জন্য।

আজাদের মায়ের একটা প্রিয় গান ছিল, ‘আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।’ তিনি স্বাধীনতার পরে নিজে ভাত খেতেন না, কিন্তু তার ভাগনে-ভাগনিদের ভাত মেখে খাওয়াতেন আর এই গান গাইতেন। বাচ্চারা তাঁর আঙুল চেটে খেত—এটা তাঁরা আমাকে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করে জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠান শেষে আমি শিমুল ইউসুফকে অনুরোধ করি, আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে গানটা গাইতে। তিনি গাইতে শুরু করলে হঠাত্ আমার বুক ভেঙে কান্না আসে। আমি সবার সামনে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। বিগত একটা বছর আমি আমার বুকে পাথর বেঁধে এই গল্পের সন্ধান করেছি এবং এই গল্প নিরাবেগভাবে লেখার চেষ্টা করেছি। আমি আর পারি না।

আজকে, ১৭ জুলাই ২০১৩, দুপুরে ড. আনিসুজ্জামান ফোন করলেন। শোনো, তোমার উপন্যাসটার কথা মনে হচ্ছে। আমি বলি, স্যার, কোন উপন্যাস। স্যার বললেন, ‘মা’।

তাই তো। আলতাফ মাহমুদ, রুমি, বদি, বাকের, আজাদদের ওপরে টর্চার করা, তারপর তাদের মেরে ফেলা—এসব ঘটনা তো আছে ‘মা’ বইয়ে। তাই তো, আজকে তো সেই সব ঘটনার কথা আমরা জানতে পারছি আদালতের মাধ্যমে।

আজাদ আর আসবে না। বদি আর আসবে না। রুমি আর আসবে না। জুয়েল আর আসবে না। জানেন, আমি জুয়েলের মায়ের সঙ্গেও দেখা করতে গিয়েছিলাম। তা নিয়ে আমার লেখা আছে, মার কাছে যাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে, বদিউলের মা, বাকেরের মায়ের সঙ্গে কেন দেখা করার চেষ্টা ১০ বছর আগেই করিনি। এখন কি আর কাউকে পাব?

এই মায়েরা চলে গেছেন তাঁদের সন্তান হত্যার বিচার না দেখেই। এখন কি তারা দেখতে পাচ্ছেন?

যতই ভাবি, ততই কান্না পায়।

তাই তো বারবার স্ট্যাটাস দিচ্ছি জেমসের গান থেকে, ভোরের তারা রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস, অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারি না। গানটা গাই। আর চোখ মুছি। রাতের তারা, ভোরের তারা, শহীদদের মাকে জানিয়ে দিয়ো, বিচার হচ্ছে।

এখনো অনেকটা বাকি আছে। আমাদের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিঠমোড়া বেঁধে, চোখ বেঁধে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়েছিল জলা-জঙ্গলে। মুনীর চৌধুরীর মতো নাট্যকার আর আমরা পাব না। শহীদুল্লা কায়সারের মতো ঔপন্যাসিক। আনোয়ার পাশার মতো উপন্যাস কি আর কেউ লিখতে পেরেছেন? ফজলে রাব্বির মতো ডাক্তার। আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। এঁদের যারা ডেকে নিয়ে মারল, যারা তালিকা বানাল, যারা হত্যার নির্দেশ দিল, যারা হন্তারকদের নিয়ে বাহিনী গঠন করেছিল, যারা ছিল হন্তারক দলের প্রধান, তাদের বিচার হবে না? শাস্তি হবে না? এটা কি হয়? বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা, এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?

শেয়ার করুন