বিএনপির নীরবতা

0
159
Print Friendly, PDF & Email

মানুষ কখন নীরব হয়? যখন শোকে পাথর হয়ে যায় অথবা আনন্দে আত্মহারা। বিএনপির ক্ষেত্রে কোনটি ঘটেছে, তা বিএনপির নেতা-নেত্রীরাই ভালো বলতে পারবেন।
জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মামলার রায় নিয়ে গোটা জাতির মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নিশ্চুপ। রায় ঘোষণার দিন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, গোলাম আযমের রায়ের ব্যাপারে আপনাদের প্রতিক্রিয়া কী?
রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।’
গতকাল জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের রায়ের পরও বিএনপির কোনো নেতা মুখ খোলেননি। তাঁদের মুখ খোলা বারণ। গত সোমবারের রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযমের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে অভিহিত করলেও তাঁর বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনা করে ৯০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। ফলে ন্যায়বিচারপ্রার্থী মানুষের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গতকালের রায়ে আদালত আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
দেশের মানুষ এই রায়ে সন্তোষ এবং জামায়াতে ইসলামী অসন্তোষ জানালেও বিএনপি লা-জবাব। যুদ্ধাপরাধের আগের মামলাগুলোর ব্যাপারেও বিএনপির নেতারা কিছু বলেননি। রায়ের আগে বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ করেছেন, কিন্তু রায় ঘোষণার পর কিছুই বলেননি। বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ‘ভোট ও জোটের স্বার্থে কিছু বলা যাবে না।’
যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান এবং যে দলটি তাঁকে স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষক বলে দাবি করে, সেই দলটি যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে কোনো কথা বলবে না, এমনকি দলের কেউ ব্যক্তিগত মতও প্রকাশ করতে পারবেন না—এটি কী করে হয়? এরই নাম কি গণতন্ত্র?
বিএনপির নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ের ব্যাপারেও এ রকম অসৌজন্যমূলক নীরবতা পালন করেছিল। তবে দল নীরবতা পালন করলেও দলের নেতা-কর্মীরা করেননি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ পরবর্তীকালে অনুশোচনা করেছিলেন তাঁদের আমলে উচ্চ আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি না হওয়ায়।
তিনি লিখেছেন, ‘…আমার এ কারণে দুঃখ হয় যে আমার অক্লান্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমি সরকারের বিরোধিতার কারণে আপিল বিভাগে জমে থাকা সেই জঘন্য হত্যা মামলার শুনানি শুরু করতে পারিনি। আমি এমনও যুক্তি দেখিয়েছি যে মুজিব যখন নিহত হন, তখন বিএনপির জন্মই হয়নি। কাজেই আপিল শুরু না করে বিএনপি এর দায়ভার বহন করতে যাবে কেন? কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদের আমি তা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। এ জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি লজ্জিত এবং নিজেকেই আমার কাছে ছোট বলে মনে হয়।’ (পৃষ্ঠা-১৪১, কারাগারে কেমন ছিলাম ২০০৭-২০০৮)
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিএনপির বহু নেতা-কর্মী যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে বিবেকের তাড়না বোধ করছেন, তাঁরা ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত ও মর্মাহত হচ্ছেন, কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বের ভয়ে কিছু বলতে পারছেন না। ভবিষ্যতে হয়তো সময় ও সুযোগ এলে তাদের মনোবেদনার কথা প্রকাশ করবেন।
পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের অন্যতম প্রধান দল, যার প্রতি বিপুলসংখ্যক মানুষের সমর্থন আছে এবং জনগণের ভোটে একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে, আবার আসবে বলে আশা করছে, সেই দলটি কীভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে নীরব থাকে। এটি কি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখা নয়? তারা যদি মনে করে বিচারটি ভুলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা বলুক। যদি তারা মনে করে, বিচারের প্রয়োজন নেই, তা-ও বলুক। কিন্তু নীরবতা কেন? ভোট ও জোটই কি সব? এই দেশ, দেশের মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান—এসব কিছুই না?
গতকাল প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জোট ও ভোটের স্বার্থে বিএনপির মৌনতা শিরোনামে। আমরা জানি, রাজনীতিতে অনেক ক্ষেত্রে কৌশল নিতে হয়, অনেক সময় বিরোধী পক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। কিন্তু তাই বলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের সঙ্গে আপস করতে হবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে বিএনপির এই মৌনতা জোট রক্ষা করলেও ভোট বাড়াবে না। বিএনপির নেতারা এত দিন বলে আসছিলেন যে তাঁরা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধী নন। তাঁরা বিচারে আরও স্বচ্ছতা চান। কিন্তু বিচারের কোথায় কোথায় অস্বচ্ছতা রয়েছে, তা কিন্তু বলছেন না।
গোলাম আযমের মামলার রায়ের প্রতিবাদে হরতাল ডাকে জামায়াতে ইসলামী। আর সেই হরতালের অজুহাতে বিএনপির সাংসদেরা সংসদ অধিবেশনে গরহাজির থাকেন। পর পর দুই দিন। তাতে কী প্রমাণিত হয়? এভাবে বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতিতে জয়ী হতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপি যে চরম দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকে তার নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারক বলে দাবিদার দলটি যদি জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের ভেতরে ঢুকে যায়, তাহলে বিএনপি নামটি রাখারই বা কী যুক্তি আছে?
এ প্রসঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে ১৯৯২ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মী তাতে শরিক হয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন সুফিয়া কামাল, কাজী নূরুজ্জামান, বেগম মুশতারি শফি, শাহরিয়ার কবির প্রমুখ। তাঁরা কেউ আওয়ামী লীগার ছিলেন না। পরবর্তীকালে বিএনপির নেতৃত্ব জামায়াতে ইসলামীকে সর্বাত্মক সমর্থনের নীতি গ্রহণ করলে দলের নেতা-কর্মীরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান। আর বিগত শাসনামলে তো বিএনপি নামের দলটি নিজেকে মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী শক্তির দোসরে পরিণত করে, যার সহিংস ও সর্বগ্রাসী রূপ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে ২০০১-২০০৬ সালে।
কেবল যুদ্ধাপরাধের বিচার নয়, হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীর নারীবিরোধী অশালীন ও কুৎসিত বক্তব্য নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হলেও বিএনপির নেতৃত্ব নীরব। দলের একজন নারী সাংসদ তাঁর পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, বিএনপি আহমদ শফীর বক্তব্য অনুমোদন করছে? শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গিয়ে তাদের ১৩ দফার প্রতি বিএনপির নেতা খোন্দকার মোশাররফ হোসেন ও সাদেক হোসেন খোকা সমর্থন জানিয়েছিলেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকাবাসীকে হেফাজতের নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে বলেছিলেন। বিএনপির নেতৃত্ব কি একবারও ভেবে দেখেছেন, ১৩ দফা মানলে প্রচলিত আইন, সংবিধান, গণতন্ত্র ও সংসদ কিছুই থাকে না। দলের নারী নেতৃত্বও থাকে না। যে হেফাজতে ইসলামের নেতারা নারী সম্পর্কে অশালীন ও কদর্য উক্তি করেন, সেই হেফাজতে ইসলাম কীভাবে একজন নারীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে? আজ তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, আগামীকাল যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না, তার নিশ্চয়তা কী?
সম্প্রতি পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি বা ১৮ দল-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, এ কথা আমরা জানি। বিজয়ী দলের দাবি, সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ এ রায় দিয়েছেন। কিন্তু হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফীর ব্যাখ্যা ভিন্ন। সৌদি আরবের জেদ্দায় এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলামপ্রিয় ও আস্তিক। বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন আবারও পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রকাশ পেয়েছে। এ বিজয় বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় তৌহিদি জনতার।’ ওই ফলাফল থেকে তিনি আওয়ামী লীগকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘অন্যথায় আপনাদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।’ (নয়া দিগন্ত, ১৮ জুলাই ২০১৩)
আহমদ শফীর বক্তব্য সত্য হলে নির্বাচনটি হয়েছে আস্তিক ও নাস্তিকদের মধ্যে এবং বিজয়ী হয়েছে তৌহিদি জনতা। বিএনপির নেতারা যে এত দিন বলেছেন, সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ রায় দিয়েছে, সেই দাবিও অসার প্রমাণিত হয়।
সম্প্রতি গালফ নিউজ-এ বাংলাদেশের ওপর একটি নিবন্ধ লিখেছেন তারিক এ আল মায়িনার। তাঁর নিবন্ধের সারকথা হলো: মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর আদর্শগত সংঘাত যখন সারা বিশ্বের নানা মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার পাচ্ছে, তখন বিশ্বের অপর একটি অংশ বাংলাদেশে একই ধরনের সংঘাত চলছে। এর মূল কারণ, কোন আদর্শ গ্রহণ করবে দেশটি—ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি ইসলাম?
গালফ নিউজ আরও জানাচ্ছে, ‘২০১০ সালে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা হেফাজতে ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তারা চায়, ইসলামি আইন ও শরিয়া অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হবে।’
আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে এখন বিএনপি যদি জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের এই চাওয়াকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত করে, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কেননা, বিএনপি যদি জামায়াত ও হেফাজতের উদ্দেশ্যই সাধন করে, তাহলে কর্মী-সমর্থকেরা ওই দুটি সংগঠনে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করবে, বিএনপিতে নয়। এখন বিএনপির নেতৃত্বকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাঁরা কী করবেন?
রাজনীতিতে সব ক্ষেত্রে যেমন সরব হওয়া ভালো নয়, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নীরবতাও আত্মঘাতী হতে পারে। আমাদের কথাবার্তা বিএনপির নেতৃত্বের ভালো লাগবে না জানি। তবে তাঁরা অন্তত দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মনোভাবটি বোঝার চেষ্টা করতে পারেন।
গোলাম আযমের রায়ের পর মঙ্গলবার এলডিপির ইফতার অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গিয়েছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘দেশ আজ মহাসংকটে। মহাদুর্নীতিবাজ ও জালেম সরকারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। এই সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে মানুষ দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত হবে।’
খুবই ভালো কথা। দেশ দুর্নীতিবাজ সরকারের হাত থেকে মুক্ত হলে নিশ্চয়ই জনগণ খুশি হবে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তারা একটি আনন্দ মিছিলও বের করতে পারে। সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের কী হবে, দণ্ডিত অপরাধীরা দণ্ড ভোগ করবেন কি না, সে সম্পর্কে তিনি ইফতার অনুষ্ঠানে একটি কথাও বলেননি। তাঁর সেই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা দণ্ড ভোগ করবেন, নাকি মুক্ত হয়ে আবার গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়াবেন—বিএনপির চেয়ারপারসনের কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাওয়া কি খুব অন্যায় হবে?
সোহরাব হাসান: সাংবাদিক।
[email protected]

শেয়ার করুন