ভেজাল নকল মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে বাজার সয়লাব

0
96
Print Friendly, PDF & Email

ভেজাল, নকল, নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব হয়ে গেছে দেশের ওষুধের বাজার। এসব ওষুধ ব্যবহার করে দেশের বিপুল সংখ্যক অসুস্থ মানুষ আরোগ্য লাভের পরিবর্তে নতুন করে স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পড়ছেন। বাড়তি টাকা খরচ করেও তারা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না। ওষুধের বাজারে পর্যাপ্ত তদারকি ও নজরদারি নেই। ফলে, এক শ্রেণীর ওষুধ ব্যবসায়ী ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেডের মাধ্যমে মফস্বলে নিম্নমানের ওষুধ বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে অবাধে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দ্রুত বিকশিত হলেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওষুধনীতির আধুনিকায়ন করা হয়নি। এই সেক্টরের অনিয়ম রোধে জোরদার হয়নি প্রশাসনিক নজরদারি। এতে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজারে সহজে ঠাঁই করে নিচ্ছে। রোধ করা যাচ্ছে না ওষুধের লাগামহীন উচ্চমূল্যও। পুরনো নীতিমালার বাধ্যবাধকতায় ওষুধের মান ও কার্যকারিতা নিয়েও ক্রেতারা কোনো তথ্য জানতে পারছেন না। তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে কমিশন ভোগী ডাক্তারদের ওপর, যারা অজ্ঞাত, অখ্যাত কোম্পানির ওষুধ লিখে দিচ্ছেন ক্রেতাদের ব্যবস্থাপত্রে। সব মিলিয়ে যুগোপযোগী ওষুধনীতি না থাকায় দেশজুড়ে ওষুধ বাণিজ্যে চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য। সাধারণ ক্রেতারা ওষুধ বাণিজ্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। জানা গেছে, প্রশাসনের যথাযথ নজরদারির অভাবে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে মানসম্পন্ন ওষুধ। প্রযুক্তিগত সহায়তার সুযোগ নিয়ে অত্যাধুনিক মোড়কে অনুমোদনহীন অখ্যাত কোম্পানি মফস্বলের বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে নকল ওষুধ। এদিকে উচ্চমূল্যের বিদেশি ওষুধও নকল হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা এসব ওষুধ ব্যবহার করে কোনো সুফল পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারাত্দক পাশর্্ব প্রতিক্রিয়ায় ভুগছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, একটি যুগোপযোগী ওষুধনীতি থাকলে এই অরাজক পরিস্থিতি রোধ করা সহজ হতো। ওষুধ ও কোম্পানি ভেদে দামের হেরফের বন্ধ হতো। নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হতো। কিন্তু এসবের কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। পুরনো আইনের কারণে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ, গুণগত মান এবং কার্যকারিতা সম্পর্কে ক্রেতারা অন্ধকারে থাকেন। জানতে পারেন না কিছুই। অন্যদিকে কমিশন প্রলুব্ধ অধিকাংশ ডাক্তার অপ্রয়োজনীয় ওষুধ এবং টেস্ট লিখে দিচ্ছেন রোগীকে। এতে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও পর্যাপ্ত সুফল পাচ্ছেন না রোগী। বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের ওষুধের গুণগত মান ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জানার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে সেটি একেবারেই অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসব নিয়ম নীতির ফাঁক গলে বাজারে ঢুকে পড়ছে নিম্নমানের ভেজাল ওষুধ। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এক শ্রেণীর অসাধু সিন্ডিকেট ওষুধ নকল করছে, ভেজাল মেশাচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংগ্রহ করে মফস্বলের বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজধানীর মিটফোর্ডে ওষুধের মার্কেটের একটি চক্রের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে মানহীন ওষুধ। ওষুধ সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রচারের বাধা এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ওষুধের দাম নির্ধারণেও সরকারের ভূমিকা সীমিত। বর্তমানে দেশে প্রচলিত প্রায় ২৩ হাজার ওষুধের মধ্যে ১১৭টির গুণ, মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে সরকারের। অন্যগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে কোম্পানি নিজেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেছেন, তালিকাভুক্ত ১১৭টি ওষুধের বাইরে থাকা ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে উৎপাদক কোম্পানি। এতে বিক্রেতা পর্যায়ে ওষুধের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং কোনো কোনো সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নির্ধারিত কিছু ওষুধের বেশি মূল্য রাখা হয়। একই ওষুধের দাম কোম্পানি ভেদে দ্বিগুণ-তিনগুণ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। গর্ভবতী নারীদের ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট আদদ্বীন ফার্মাসিটিউক্যালসের ক্যালসিয়াম-এ ১০টির এক পাতার দাম ২৫ টাকা। স্কয়ারের ক্যালডি প্লাস এক পাতার দাম ৩৫ টাকা। অন্যদিকে আদদ্বীনের ফোলেট নামের ১০টি জিংক ট্যাবলেটের দাম সাড়ে ৪টাকা। একই গ্রুপের ওষুধ বেঙ্মিকোর জিফোলেট-এর দাম ১৪ টাকা এবং স্কয়ারের একই ওষুধের দাম ১৩ টাকা। গত এক বছরে ওষুধের দাম বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক হারে। বিশেষ করে জীবন রক্ষাকারী কোনো কোনো ওষুধের দাম ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওষুধনীতি এখন সময়ের দাবি। যুগোপযোগী নীতির অভাবে এ খাতের গুটিকয়েক কোম্পানি লাভবান হচ্ছে। বেশিরভাগ কোম্পানি অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছে। তিনি বলেন, যথাযথ মনিটরিং না থাকায় ওষুধ শিল্পে নকল ও ভেজালের দৌরাত্দ্য বেড়ে গেছে। এর ফলে টাকা খরচ করেও অধিকাংশ ক্রেতা ওষুধের সুফল পাচ্ছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ওষুধের জেনেরিক নাম প্রচলনের পাশাপাশি দেশে বিদ্যমান ওষুধগুলোর মধ্য থেকে একটি ওভার দ্য কাউন্টার-ওটিসি তালিকা তৈরি করতে আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছি। এতে মানুষ তাদের সাধারণ জ্ঞান থেকে চিকিৎসকের পরামর্শপত্র ছাড়াই ফার্মেসিতে গিয়ে ওই তালিকাভুক্ত ওষুধ কিনতে পারবে। এ ক্ষেত্রে শুধু ওটিসিভুক্ত ওষুধগুলোর জন্য বিজ্ঞাপন প্রচারণা চালানো যেতে পারে। তিনি বলেন, সবকিছুর জন্য একটি কার্যকর ওষুধ নীতি প্রয়োজন। সরকারি নজরদারির অভাবেই নিম্নমানের ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে। সরকার আন্তরিক হলে ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের কবল থেকে জনগণকে রক্ষা করা সম্ভব।

শেয়ার করুন