শেখ হাসিনা কি আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড় করাতে পারবেন

0
29
Print Friendly, PDF & Email

পীর হাবিবুর রহমান

হতাশার তরীতে ভাসমান আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড় করাতে পারবেন দলের সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা? দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর সরকারবিরোধী জনমতের ওপর আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রবল আত্দবিশ্বাস নিয়ে পথ হাঁটছে বিরোধী দল বিএনপি, সেখানে আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়ে আছে হতাশার তীরে। নেতা-কর্মীদের মনোবল গেছে ভেঙে। খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। এই ফলাফলের প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনে পড়বে। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম পরিষ্কার বলেছেন, এই পরিণতি যাদের জন্য তারা সরে দাঁড়ান। কেউ সরে দাঁড়ায়নি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই মর্মে খবর বের হলেও পরে তিনি নিজেই তা গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে এ খবর চাউর হয়েছে যে দলের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক পরিবর্তনের যে আওয়াজ উঠেছিল তা দলের সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে স্তিমিত হয়ে গেছে। সৈয়দ আশরাফ ছুটি নিয়ে যুক্তরাজ্য সফরে চলে যেতে চাইলেও প্রধানমন্ত্রী তা হতে দেননি। সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের উঁচু মাপের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ বিএনপির অতিশয় দুর্বল প্রার্থী অধ্যাপক আবদুল মান্নানের কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে যখন পরাজিত হন তখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন দেশের বাইরে। দেশে ফিরেই বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে আসা মন্ত্রী-নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময়কালে স্বভাবসুলভ রসিকতায় ‘হারু পার্টি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তারপর দলের নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রুপে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সবার মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে দলের দুর্বলতা, সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা ও নির্বাচনে ভরাডুবির কারণ মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। গোটা রাজনৈতিক মহল থেকে রাজনীতিমনস্ক পর্যবেক্ষকরা ভাবছিলেন আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলকে ঘুরে দাঁড় করাতে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা বড় ধরনের পদক্ষেপ নেবেন। ব্যাপক রদবদল আসছে দল ও সরকারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রণকৌশলে- এমন খবর চাউর হয়েছিল। বলাবলি হচ্ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দ্রুত বিশেষ জাতীয় কাউন্সিল ডেকে দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে দূরে সরে থাকা প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের সমন্বয়ে দলকে ঢেলে সাজাবেন। মন্ত্রিসভায় আসবে বড় ধরনের রদবদল। সেই সঙ্গে সাড়ে চার বছরের শাসনামলে সরকার ও দলের জনপ্রিয়তায় আঁচড় বসানো ব্যক্তিদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত দলকে সিটি করপোরেশন নির্বাচন-উত্তর পতিত বিপর্যয় থেকে টেনে তুলে দাঁড় করানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আদৌ নেওয়া হবে কি না এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে এখন সংশয় দেখা দিয়েছে। যারা দলের সভানেত্রী দেশে ফেরার পর পরই পরিবর্তনের আলোর ইশারা দেখে উজ্জীবিত, উল্লসিত হয়েছিলেন তারা এখন নিষ্প্রভ। দলের অভ্যন্তর থেকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল সবাই বলছে, আওয়ামী লীগের বিগত দুটি কাউন্সিলে এককালের আদর্শচ্যুত কমিউনিস্ট, অপরিপক্ব এবং হাইব্রিড নেতৃত্ব এনে বসিয়ে দেওয়ায় দলটি দুর্বল হয়েছে। এ দুর্বল রাজনৈতিক দলটি অতীতের দলীয় ঐতিহ্যের তেজস্বী ধারা ও সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে না পেরেছে দল গোছাতে, না পারল প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে জনমত টানতে। রাজনীতির ময়দানে আওয়ামী লীগের টিম প্রথম ডিভিশন নয়, তৃতীয় ডিভিশনে নেমে এসেছে। তাই ভরাডুবি ঘটেছে। সামনে মহবিপদ। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের লড়াইয়ে যোগ্যতার বিচারে সরকারি দলের প্রার্থীরা ছিলেন উচ্চতার শিখরে, তাদের ইমেজ, অভিজ্ঞতা ও ভাবমূর্তি ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু, সরকারবিরোধী জনমতের কারণে তাদের করুণ পরাজয় ঘটেছে বিএনপির অতিশয় দুর্বল প্রার্থীদের কাছে আর দল তাদের পাশে শক্তিশালী অতীতের মূর্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। গাজীপুরে যখন দল দাঁড়িয়েছে আজমত উল্লাহর পাশে তখন ভোটের মাত্র ৯ দিন বাকি। ব্যবধান কিছুটা কমে এলেও জনমতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত দুটি কাউন্সিলে নির্বাচিত দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অবদান দলের জন্য থাকলেও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিগত সাড়ে চার বছর তার কর্মকাণ্ড অদৃশ্য। তিনি নিজেই বেশির ভাগ সময় থাকেন দৃশ্যের বাইরে। তিনিই সেই সাধারণ সম্পাদক যিনি সাড়ে চার বছর না নিয়মিত বসেছেন দলের কার্যালয়ে, না দিয়েছেন কর্মী দর্শনের সুযোগ, না গিয়েছেন কোনো জেলা সফরে। এই প্রথম দলের দুজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন অতীতের গৌরবময় ভূমিকা ছাড়াই তেমনি একজন হয়ে বসেছেন ফুল মিনিস্টার। না পেয়েছে দল, না পেয়েছে সরকার। কারও জন্যই তিনি কিছুই বয়ে আনতে পারেননি। এই প্রথম দলের এমন সব সাংগঠনিক সম্পাদক বিভাগওয়ারি দায়িত্ব নিয়েছেন যারা জেলা নেতৃত্বের ওপরই প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। দলের অভ্যন্তরে রক্ত সঞ্চালনের মতো সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ‘৯৬-এর শাসনামলে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে যেমন ছিল নেতৃত্বের গুণাবলিতে তার দলীয় টিম, তেমন ছিল তার উজ্জ্বল মন্ত্রিসভা। দলের প্রেসিডিয়াম থেকে সম্পাদক হয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য পর্যন্ত নেতারা ছিলেন দীর্ঘ সংগ্রামের সিঁড়িপথে দল ও গণমানুষের আস্থায় উঠে আসা জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত যত মুখ। এবার সেই ধারা হোঁচট খেয়েছে। সেবার সরকারে মন্ত্রী থেকে উপমন্ত্রী পর্যন্ত সবাই ছিলেন জাঁদরেল প্রভাবশালী নেতা ও ব্যক্তি, যাদের দলের নেতা-কর্মীই নন, সাধারণ মানুষও সমীহ করত। দলের তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ছিল তাদের যোগাযোগ। এখন সেই কাঠামোর নেতৃত্বও নেই, সেই দক্ষ মন্ত্রীও নেই, দলের সঙ্গে নেই নৈকট্য। আছে কেবল যোজন যোজন দূরত্ব। সেবার আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও আ স ম আবদুর রব থাকলেও সরকারের স্পোকম্যান হিসেবে কখনই মিডিয়ায় তারা কথা বলেননি। এখন জোট শরিক মন্ত্রীদের হামেশাই দেখা গেছে সরকারের মুখপাত্রের ভূমিকায় টিভি পর্দায় আসতে। দলের ভেতর জোর আলোচনা মুজিব উৎখাতের রক্তমাখা রাজনীতির ব্যর্থ হঠকারী পথ পাড়ি দিয়ে সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয়ে জনমত আদায়ে ব্যর্থ হয়ে নৌকায় চড়ে জীবনে প্রথম এমপি-মন্ত্রী হওয়া শরিক নেতারা যখন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার কথা বলছেন তখন মানুষ তা গ্রহণ করেনি। উল্টো তাদের মাইনাস করার লাল কার্ড দেখিয়েছে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকে যে দল সমর্থন জানিয়েছিল সেই দলের ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দারের মতো রাজনীতির পথ হাঁটা কর্মী ও নির্বাচনী এলাকাহারা চীনা বিপ্লবী শরিক নেতাকে মন্ত্রী করেই থামানো যায়নি, তার কথাবার্তাও সরকারের অহমিকার চেহারা দৃশ্যমান করেছে। হাতেনাতে ধরা খাওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তীতে রেলের সেই কালো বিড়ালের মুখে হররোজ বয়ান শুনতে শুনতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়েছে। ক্ষুব্ধ হয়েছে। শেয়ার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি সরকার বা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তলানিতে এনে দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাস আগে দল ও জোটকে শক্তিশালী জনসমর্থনের ওপর ঘুরে দাঁড় করানো অনেকটা দিবাস্বপ্নের মতোই তাদের কাছে মনে হচ্ছে। কর্মীদের ভাষায় জনপ্রিয়তায় যখন ভাটা আসে তখন ব্যাংক, বীমা ও টিভি লাইসেন্স দান থেকে শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়কদের রক্ষা করার খেসারত একটু বেশিই দিতে হয়। দলকানা, দলদাস ও সুবিধাভোগীরা গণবিরোধী চরিত্র হিসেবে দলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আজকের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও সরকারের দায়িত্বশীল পদে থাকা অনেকেই দলের জন্য বোঝা হয়ে দৃশ্যমান হয়েছেন। তাদের প্রতি মোহাম্মদ নাসিমের সরে দাঁড়ানোর ডাক দলের লাখো লাখো নেতা-কর্মীর মনের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

দলের অভ্যন্তরে নেতা-কর্মীদের মতে সামনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি আওয়ামী লীগ। এই অল্প সময়ে অতিশয় দুর্বল দলকে শক্ত মাটির ওপর দাঁড় করিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ভোট লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে হলে এখনই বিশেষ কাউন্সিল ডেকে নেতৃত্বে ব্যাপক রদবদল আনতে হবে। এমনকি মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে সারা দেশের বিতর্কিত এমপিদের বাদ দিয়ে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বাছাই করে মাঠে নামাতে হবে। উপজেলা চেয়ারম্যানদের অভিমান ভাঙিয়ে তাদের ক্ষমতা দিতে হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের যেসব প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ নেতা বিগত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন, দলের জাতীয় কাউন্সিলে ঠাঁই পাননি দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে তাদের সসম্মানে দলীয় কাঠামোতেই নয়, দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার তাগিদেই কাছে টেনে নিতে হবে। জেলা পর্যায়ে দলের নিবেদিতপ্রাণ বিশেষ করে পঁচাত্তর-উত্তর সারা দেশে যারা মাঠ পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেসব নেতার মাঝ থেকে ক্লিন ইমেজের সংগঠকদের এনে দলকে ঢেলে সাজাতে হবে। দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া ও বিভিন্ন দলে ঠাঁই পাওয়া সাবেক নেতাদের যে কোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতে হবে জেলায় জেলায়। যারা দল থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট দলের বড় নেতা হয়েছেন তাদেরও ফিরিয়ে আনতে নিতে হবে আন্তরিক উদ্যোগ এবং তা নিতে হবে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকেই। অনেকেই বলছেন, এই সময়ে পাঁচ সিটি নির্বাচনের পরাজয়সহ দলীয় রাজনীতির পোস্টমর্টেম যে যাই করুন না কেন যদি একটি বর্ধিত সভা ডাকা যায় আর সারা দেশের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের সমাবেত করা যায় তাহলে তাদের ভূমিকায় চিহ্নিত হবে সাড়ে চার বছরে দল ও সরকারের জন্য কারা অ্যাসেট, কারা বোঝা। দলের মাঠ নেতা-কর্মীরা ওদের দিকে অভিযোগের অঙ্গুলি তুলবে। তবুও প্রশ্ন- এই অতি অল্প সময়ে এত তোষামোদকারী, এত এত দলকানা চারদিকে রেখে শেখ হাসিনা কি পারবেন আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড় করাতে? দলীয় সূত্র জানায়, দলের অভ্যন্তরে দুটি স্রোত বইছে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর। যারা সাদা চোখে সব পরিষ্কার দেখছেন তারা দল, সরকার ও নীতিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন চান। দূরের স্বজনকে কাছে টানতে চান। অন্যদিকে আরেক দল জনবিচ্ছিন্ন নেতা-মন্ত্রী এভাবেই তাদের কোঠারি স্বার্থ ও সিন্ডিকেট বহাল রেখে পথ চলতে চান। দুই সে াতের চাপের মুখে শেখ হাসিনা কী সিদ্ধান্ত নেন তা দেখার অপেক্ষায় নেতা-কর্মীরা।

শেয়ার করুন