আজ মুজাহিদের রায়

0
92
Print Friendly, PDF & Email

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল এ তথ্য জানিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি হবে ষষ্ঠ এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এর চতুর্থ রায়। প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) ও আসামি পক্ষে যুক্তিতর্ক (আরগুমেন্ট) উপস্থাপন শেষে ৫ জুন থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে যুক্তিতর্কে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে প্রসিকিউশন। আর প্রমাণিত হয়নি দাবি করে অভিযোগ থেকে মুজাহিদের অব্যাহতি চেয়েছে আসামি পক্ষ। এদিকে মুজাহিদের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর আজকের হরতাল ও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে ঢাকাসহ ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এর আগে প্রথম রায়ে ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন (সদস্য) আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। দ্বিতীয় রায়ে ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন একই ট্রাইব্যুনাল। তৃতীয় রায়ে দলের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হয়। পরে চতুর্থ রায়ে ফাঁসির আদেশ হয় দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানেরও। আর পঞ্চম রায়ে দলের সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১। প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই সাক্ষ্য ও দালিলিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছি। বিচারে তার সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করছি।’ অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক বলেন, ‘মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহের বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারেনি। তাই অভিযুক্তের খালাস হবে বলে আশা করছি।’
যত অভিযোগ : মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৩৪টির মধ্যে সাতটি অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ২১ জুন অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই ট্রাইব্যুনালে শুরু হয় তার বিচার। মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগে বলা হয়, দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার লেখা একটি প্রবন্ধে পাকিস্তানি সেনাদের এ-দেশীয় সহযোগীদের হাতে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিগ্রহের বিবরণ তুলে ধরেন। এই প্রবন্ধের বিরোধিতা করে ‘৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তাকে ‘ভারতের দালাল’ উল্লেখ করে সমালোচনা করা হয়। তিনি পরিণত হন জামায়াত ও আলবদরের টার্গেটে। এর জেরে ১০ ডিসেম্বর রাত ৩টার দিকে মুখঢাকা সাত-আট জন যুবক ঢাকার চামেলীবাগের ভাড়া বাসা থেকে সিরাজুদ্দীনকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফেরেননি। পাওয়া যায়নি তার মরদেহও।
দ্বিতীয় অভিযোগ : মে মাসের মাঝামাঝি মুজাহিদ, জনৈক হাম্মাদ মাওলানা এবং আট-দশ জন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনা ফরিদপুরের হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গিতে হামলা চালায়। ওই হামলায় নিহত হন ৫০-৬০ জন হিন্দু।
তৃতীয় অভিযোগ : জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত মুজাহিদের ইঙ্গিতে রাজাকার ও অবাঙালিরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে জনৈক আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন করে। পরে পালিয়ে যান বাবু নাথ।
চতুর্থ অভিযোগ : ২৬ জুলাই সকালে গোয়ালচামট খোদাবঙ্পুর গ্রামের জনৈক মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে রাজাকাররা অপহরণ করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মুজাহিদ সেখানে গিয়ে এক পাকিস্তানি মেজরকে কিছু বললে ইউসুফের ওপর শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন। এক মাসের বেশি সময় আটক থেকে সেখানে নির্যাতনের শিকার হন তিনি। পরে তাকে যশোর সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগ : ৩০ আগস্ট রাতে মতিউর রহমান নিজামীকে সঙ্গে নিয়ে মুজাহিদ নাখালপাড়ার পুরাতন এমপি হোস্টেলে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে যান। সেখানে আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে তারা গালাগাল করেন। মুজাহিদ একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই এদের হত্যা করতে হবে।’ পরে সতীর্থদের সহযোগিতায় তাদের অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেন মুজাহিদ।
ষষ্ঠ অভিযোগ : মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে শারীরিক শিক্ষা কলেজ) পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে দলীয় নেতাদের নিয়ে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করতেন মুজাহিদ। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা।
সপ্তম অভিযোগ : ১৩ মে বেলা ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে রাজাকার কালু বিহারি, ওহাব, জালাল ও অন্যান্যের সঙ্গে গাড়িতে করে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার খলিলপুর বাজারে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে যান মুজাহিদ। সেখানে সভার পর মুজাহিদ হিন্দু-অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান সঙ্গীদের নিয়ে। বীরেন্দ্র সাহা, নৃপেণ সিকদার, সানু সাহাসহ কয়েকজনকে হত্যা করা হয় তারই নির্দেশে। রাজাকাররা এক হিন্দু নারীকে এ সময় ধর্ষণও করে।
মামলার ধারাবাহিক কার্যক্রম : ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয় মুজাহিদকে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতারের পর একই বছর ২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক দেখানো হয় তাকে। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি মুজাহিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-১-এ ৬ হাজার ৬৮০ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ-সংবলিত ৩৪টি অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ এপ্রিল মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। গত বছরের ২১ জুন অভিযোগ গঠনের পর ১৯ জুলাই মুজাহিদের বিরুদ্ধে উদ্বোধনী বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। ৬ মে থেকে ৫ জুন মোট ছয় কার্যদিবস প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ও প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল। ২২ মে থেকে ৫ জুন আট কার্যদিবসে মুজাহিদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার মুন্সী আহসান কবির ও অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান।
সাক্ষ্য দিলেন যারা : মুজাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয় ১৭ জনের সাক্ষ্য। এরা হলেন_ শাহরিয়ার কবির, জহিরউদ্দিন জালাল ওরফে বিচ্ছু জালাল, মাহবুব কামাল, শাহীন রেজা নূর, মো. রুস্তম আলী মোল্লা, আবদুল মালেক মিয়া, রণজিৎ কুমার নাথ ওরফে বাবু নাথ, মো. আবু ইউসুফ পাখি, মীর লুৎফর রহমান, এ কে এম হাবিবুল হক মুন্নু, ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ, চিত্তরঞ্জন সাহা ও শক্তি সাহা, আবদুর রাজ্জাক খান (তদন্ত কর্মকর্তা)। এ ছাড়া জব্দ তালিকার সাক্ষীরা হলেন_ মো. এজাব উদ্দিন, আমেনা খাতুন ও স্বপন কুমার।
মুজাহিদের পক্ষে একমাত্র সাক্ষী : মুজাহিদের পক্ষে তিনজন সাক্ষী নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। তবে তাদের মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন একমাত্র তার ছেলে আলী আহমাদ মাবরুর।
জানতেন না মুজাহিদ : আজ বুধবার রায় ঘোষণার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হলেও গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এ খবর জানতে পারেননি নারায়ণগঞ্জ কারাগারে বন্দী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। তবে বিকাল সাড়ে ৫টার পর রায় ঘোষণার খবর জানানোর আধা ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় কড়া নিরাপত্তায় তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার দলের সাবেক আমির গোলাম আযমের রায় ঘোষণার পর গতকাল তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। তরে নিজের রায় ঘোষণার কথা জানতে না পারায় দিনটি কেটেছে তার অন্য সময়ের মতোই। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ কারাগারে আনা হয় মুজাহিদকে। এর পর থেকে তাকে এ কারাগার থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়া করা হতো। নারায়ণগঞ্জ কারাগারের একটি সূত্র জানায়, এখানে ডিভিশন পেয়েছিলেন মুজাহিদ। নারায়ণগঞ্জ কারাগারে তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। এ ছাড়া তিনি রোজাও রাখছেন। বাচ্চু রাজাকারের প্রথম রায় ঘোষণার পর কারাগারে মুজাহিদ কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। পরে সর্বশেষ সোমবার গোলাম আযমের রায় ঘোষণার পর বিষয়টি গতকাল পত্রিকা মারফত জানতে পারেন তিনি। তবে তাকে এ দিন খুব বেশি বিচলিত দেখা যায়নি। জেলা কারাগারের সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ কারাগারে সুস্থ ছিলেন মুজাহিদ।

শেয়ার করুন