ইফতারির নামে ‘বিষ’

0
86
Print Friendly, PDF & Email

সারা দিনের রোজা শেষে ইফতারির টেবিলে নানারকম মুখরোচক ইফতারি সামগ্রী ছাড়া নগরবাসীর ইফতার যেন জমেই না।ইফতারির নামে ‘বিষ’
এখন যে শুধু কর্মজীবীরাই ঘরের বাইরে থেকে ইফতার কিনে খান তা নয়, ইফতার পার্টি এবং ঘরে পরিবার নিয়ে ইফতার করলেও রোজাদাররা এখন খাবারে বৈচিত্র্য আনতে বাইরে থেকে ইফতারি সামগ্রী কিনে আনে। আপাতদৃষ্টিতে এ ইফতারি আইটেমগুলো দেখে মচমচ, মজাদার ও আকর্ষণীয় মনে হলেও এগুলো তৈরির পেছনে রয়েছে আরেক রহস্য। জেনে অবাকই হতে হয়। সারা দিন রোজার পর মানবদেহের প্রয়োজন পুষ্টিকর ও নির্ভেজাল খাবার। কিন্তু মানুষ টাকা দিয়ে কিনে খাচ্ছে বিষা মেশানো ইফতারি।

পুষ্টিবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা জানান, বাইরে বিক্রি হওয়া ইফতারি আইটেমে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কার্বাইড, ফরমালিন, ক্যামিকাল রং ও মবিলসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ। মানবদেহের জন্য এগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিষাক্ত এ পদার্থগুলো শরীরে ঢুকে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে জটিল সব ব্যাধিতে।

পিয়াজু, বেগুনিতে রং ও মবিল : ইফতারির মুখরোচক পিয়াজু, বেগুনি, সবজিবড়া, বিভিন্ন কাবাব, আলুর চপ ও জিলাপির রং আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকারক সিনথেটিক রং। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোয় লাল রং মেশানো হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট মাত্রায় খাবারের রং মেশানোর নিয়ম থাকলেও দাম বেশি হওয়ায় (প্রতি কেজি ৪ হাজার টাকা) ব্যবসায়ীরা কম দামি কাপড়ে ব্যবহৃত রংও (প্রতি কেজি ২০০ টাকা) খাবারে ব্যবহার করছে। এমনকি যে তেলে এগুলো ভাজা হচ্ছে তাতে মবিল ব্যবহার করা হচ্ছে এর ফলে খাবার মচমচে হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম দামি টেঙ্টাইল রং কিডনির জন্য মারাত্দক ক্ষতিকর। তা ছাড়া মবিলের ভাজা খাবার খেলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে দেহের ক্ষতি হয়। এতে ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া পরিপাকসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গেরও ক্ষতি হয়। জানতে চাইলে মগবাজারের এক ইফতারি দোকানি জানান, রং ব্যবহার না করলে খাবার রং সুন্দর হয় না। এতে ক্রেতারাও খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয় না।

জিলাপি ও ছোলায় হাইড্রোজ : জিলাপির খামির জমতে কিছুটা সময় লাগে আর একশ্রেণীর বিক্রেতা চটজলদি জিলাপি বানাতে এতে হাইড্রোজ ব্যবহার করছে। এতে জিলাপি মচমচে হয়। অন্যদিকে কাল ছোলা সাদা করতে দোকানিরা হাইড্রোজ দিয়ে তা সিদ্ধ করে বলে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়। আকর্ষণীয় করতে অনেক সময় জিলাপিতে লাল ও হলুদ সিনথেটিক রং মেশানো হচ্ছে।

মুড়িতে ইউরিয়া : ইফতারে মুড়ি প্রয়োজনীয় একটি খাদ্য। এটি ভাজা হচ্ছে হাইড্রোজ বা ইউরিয়া সার দিয়ে। মূলত আকারে বড় ও সাদা করতেই এমনটি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ীর এক মুড়ি বিক্রেতা জানান, ইউরিয়া সার ছাড়া মুড়ি ভাজলে তা লাল হয় আর লাল মুড়ির ক্রেতা নেই বলেই তিনি মুড়িতে সার ব্যবহার করেন।

ফল ছাড়া রাসায়নিকে জুস : বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ফলের জুসে ফলের রস বা রসের নূ্যনতম উপাদান না থাকলেও নির্দিষ্ট ফলের রং, গন্ধ, চিনি ও পানি মিশিয়ে জুস হিসেবে তা প্যাকেট বা বোতল জাত করা হচ্ছে। চিনির বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে স্লাইকোমেট নামের ক্ষতিকর রাসায়নিক তরল পদার্থ। এ ছাড়া ইফতারে শরবত হিসেবে বিভিন্ন প্লাস্টিকের প্যাকেটে তৈরি গুঁড়া শরবত দেহের জন্য ক্ষতিকর। এগুলোয় শুধু চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টি ও রং মেশানো হয়।

ফল ও দুধে ফরমালিন : ইফতারে ফল ও দুধ দুটি অত্যাবশ্যকীয় খাবার। কিন্তু আতঙ্কের বিষয় এ খাবার দুটিতেও এখন মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর ফরমালিন। বিশেষ করে আম, মাল্টা, খেজুর, আপেল, আঙ্গুর ও কমলায় এর ব্যবহার বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া তরল দুধে এ ক্ষতিকর রাসায়নিকটি মেশানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক, বিএসটিআইর সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা বলেন, কোনো ফলেই এখন আর স্বাদ পাওয়া যায় না। কার্বাইড ও ফরমালিন মেশানোর জন্য এমনটি হয়। ফরমালিনযুক্ত ফল খাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে আমাদের কিডনি ও যকৃৎ নষ্ট হতে শুরু করে। এর ফলে মানুষের মুখের স্বাদও নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা যায়, ফল গাছে থাকা অবস্থায়ই ফরমালিন, কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শুরু হয়। বিএসটিআইর মহাপরিচালক এ কে ফজলুল আহাদ বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন মেগা শপ ও রাস্তার পাশের দোকানে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে অভিযান চালাচ্ছেন। এতে ভেজাল ও বিষযুক্ত খাবার যেমন পাওয়া যাচ্ছে তেমনি অভিযুক্তদের শাস্তিও দেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিওর ফুড অর্ডিন্যান্সে জরিমানা মাত্র ৮০০ টাকা। এই অর্থ জরিমানা করে ভেজাল খাদ্যের রমরমা ব্যবসা থামানো সম্ভব নয়।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, পরীক্ষায় মানুষের দেহে আগের তুলনায় বেশি কার্বাইড, ফরমালিন, অর্গানো ফসফরাস ও হেভি মেটালের পরিমাণ পাওয়া গেছে। রোজায় এ রাসায়নিক পদার্থগুলো মানবদেহে আরো বেশি পরিমাণে প্রবেশ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় মানুষের কিডনি ও যকৃৎ তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

পুষ্টিবিজ্ঞানী গোলাম মাওলা বলেন, খাবারের ভেজালের কারণে আগের তুলনায় মানুষের কিডনি রোগে আক্রান্তের হার বেড়েছে। রোজায় এখন ফলও ভেজাল খেতে হচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের বিষয়টি আমাদের ‘জিরো টলারেন্সে’ নিয়ে আসতে হবে। সেইসঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

এ বিষয়ে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা বলেন, রমজানে তারা একজন ফরমালিন বিশেষজ্ঞ ও ডিসিসির খাদ্য পরিদর্শকসহযোগে ভেজাল খাদ্য অভিযান পরিচালনা করবেন। এতে অভিযুক্তদের তাৎক্ষণিক অর্থদণ্ড দেওয়া হবে।
– See more at: http://bd-pratidin.com/2013/07/16/5941#sthash.euNs4hkl.dpuf

শেয়ার করুন