ডিবি কর্মকর্তার ধর্ষণ চেষ্টায় কোমর ভাঙলো ষোড়শীর

0
133
Print Friendly, PDF & Email

ইজ্জত বাঁচাতে দৌড়ে ছাদে উঠেছিল আকলিমা আক্তার আঁখি (১৮)। রক্ষা হয়নি। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া হয় তাকে। আর এতে কোমর ভেঙে যায় তার। শ্লীলতাহানি আর ধর্ষণ চেষ্টার এ অভিযোগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া গোয়েন্দা পুলিশের আলোচিত এএসআই মো. জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে। আঁখির অভিযোগ, তাকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে ওই রাতেই তার ভাইকে গ্রেপ্তার করে ডিবির এই দারোগা। এরপর ফেনসিডিল আর ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেয় সে। আঁখির মা এ বিষয়ে পুলিশ সুপারের 
কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের ওই এএসআই’র দাবি, আঁখি ও তার মা মাদক ব্যবসায় জড়িত। এই এএসআই’র বিরুদ্ধে নিজের কেনা গাড়িতে করে মাদক পাচার এবং মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ধরছাড় বাণিজ্যের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটে ৯ই জুলাই রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ভাদুঘর এলাকায়। ঘটনার শিকার আঁখি গুরুতর আহত অবস্থায় জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি জানান, গত মঙ্গলবার রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় শহরের ভাদুঘরে তাদের ভাড়া বাসায় এসে দরজা ধাক্কাতে থাকে ৫-৭ পুরুষ। ঘরে তখন শুধু আমি আর আমার ছোট ভাই। এ অবস্থায় আমি দরজা না খুলে বসে থাকি। আমার মাকে ফোনে এ ঘটনা জানাই। এর মধ্যেই দরজা ভেঙে এরা ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন ডিবি’র এএসআই জাহাঙ্গীর আমাকে ঝাপটে ধরে। শরীরের বিভিন্ন গোপন স্থানে হাত দেয়। আমি তখন তার কবজা থেকে ছুটে পালাতে চাইলে সে আমাকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। তখন আমার ৭ বছর বয়সী ছোট ভাই সাকিব আমাকে বাঁচাতে এলে সে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এক সুযোগে আমি দৌড়ে ছাদে গেলে জাহাঙ্গীরও ছাদে গিয়ে আমার সঙ্গে দস্তাদস্তি করতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে আমাকে ফেলে দেয়। ওই সময় তার ভাই অটোরিকশাচালক সাকিল (১৫) বাসায় ফিরলে জাহাঙ্গীর তাকে আটক করে নিয়ে যায়। এরপর ৫টি ফেনসিডিল ও ১০টি ইয়াবা টেবলেট উদ্ধারের ঘটনা দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেয়। আঁখি আরও জানায়, ক’দিন আগে তার ভাইয়ের অটোরিকশা আটক করা হলে সে তার মায়ের সঙ্গে ডিবি অফিসে গিয়েছিল। তখনই সে জাহাঙ্গীরকে দেখে। এরপরই জাহাঙ্গীর খোঁজ নিয়ে ওই রাতে তাদের ঘরে গিয়ে হাজির হয়। তার উদ্দেশ্য ছিল খারাপ। তার মা পারুল বেগম জানান, ওই দিন সকালে চিকিৎসার জন্য আমি ঢাকা যাই। রাত সাড়ে ১১টায় আমার মেয়ে ফোন করে আমাকে জানায় কয়েকজন লোক ঘরের দরজা খোলার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। আমি আমার মেয়েকে দরজা না খোলার জন্য বলি। আধঘণ্টা পর প্রতিবেশীদের মাধ্যমে জানতে পারি আমার মেয়েকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে। আমার ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করেছে। রাতে ঢাকা থেকে ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসার পথে ডিবি পুলিশের এএসআই জাহাঙ্গীর ফোন করে আমাকে হুমকি দেয়। বলে এ ব্যাপারে কারও কাছে কোন অভিযোগ দিলে ছেলে ও পরিবারের অন্যদের মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে সারাজীবন জেল খাটাবে। পরে শাকিলকে আটক করার কথা জানিয়ে বলে, তাকে ছাড়িয়ে নিতে হলে এক লাখ টাকা দিতে হবে। পারুল বেগম মাদক ব্যবসার সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার মেয়ের ইজ্জত লুট করার জন্যই ওই রাতে ডিবি পুলিশ আমার খালি ঘরে ঢুকেছিল। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই জাহাঙ্গীর শ্লীলতাহানি এবং ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা মাদক ব্যবসায়ী। ফেনসিডিল, ইয়াবা বিক্রি করে- এ খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়েছি। অনেক ডাকাডাকির পর বাইরের লোহার গেট না খুলে মেয়েটি (আঁখি) ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে পালিয়ে যায়। পরে আমরা ঘরে ঢুকে চালের ড্রামের মধ্য থেকে ৫ বোতল ফেনসিডিল ও ১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করি। এদিকে ডিবি’র এই এএসআই তাদের মাদক ব্যবসায়ী প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন আঁখি ও তার মা। স্থানীয় লোকজনকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার আঁখির মা তার মেয়েকে নির্যাতনের বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার পর শুক্রবার সকালে স্থানীয় কাউন্সিলর আক্তার জাহানকে ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে আসা হয়। আঁখি আর তার মা মাদক ব্যবসায় জড়িত সেটি কাউন্সিলরের মুখ দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে বলানো হয়। জাহাঙ্গীর তার ফোন দিয়েই কাউন্সিলরের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলিয়ে দেয়। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান পিপিএম’র সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আঁখির মায়ের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এএসপি সদর সার্কেলকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে অভিযোগকারী মহিলা মাদক ব্যবসায়ী বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, পুলিশ সেখানে মাদক উদ্ধার করার জন্যই গিয়েছিল। তার ছেলের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ: তার প্রাইভেট কারে করে মাদক পাচারের অভিযোগ উঠেছিল এর আগে। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানা পুলিশ মাদকভর্তি জাহাঙ্গীরের প্রোভক্স প্রাইভেট কারটি (ঢাকা মেট্রো-১২-৭৭১২) আটক করেছিল গত বছরের ২৭শে নভেম্বর। গাড়িতে পাওয়া গিয়েছিল ১০ কেজি গাঁজা। এ সময় গাড়ির চালক সাদ্দাম ওরফে কামাল (২৪) ছাড়াও আটক হয় নবীনগর বাইপালের মৃত লাল মিয়ার পুত্র আক্কাস আলী (৩৫) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার ইয়াকুব আলীর মেয়ে নাজমা বেগম (২৪)। গাড়িটি আটক হওয়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শেরপুর ও পৈরতলা বাসস্ট্যান্ডের কয়েকটি রেন্ট-এ কার স্ট্যান্ডে প্রথমে খবর ছড়িয়ে পড়ে কামাল নিখোঁজ হয়েছে গাড়িসহ। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে তার পরিবার ও সহকর্মীরা। এরপরই খবর পাওয়া যায় ডিবি’র জাহাঙ্গীরের গাড়িটি গাঁজাসহ ধরা পড়েছে। আটক গাড়ির ড্রাইভার সাদ্দাম ওরফে পিচ্চি কামালের পরিবারসহ বিভিন্ন সূত্র তখন নিশ্চিত করে গাড়িটির মালিক ডিবি’র এএসআই জাহাঙ্গীর। আর এ গাড়ি নিয়মিত মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার হয়। তবে এ ঘটনা তখন ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন জাহাঙ্গীর। এ অভিযোগ ছাড়াও সীমান্ত এলাকায় দিনরাত অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আটক করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ আছে এএসআই জাহাঙ্গীরসহ ডিবি’র কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে। আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা কখনও সরাসরি টাকা দিয়ে কখনও বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে তাদের কাছ থেকে আটককৃতদের ছাড়িয়ে নেয় বলে অভিযোগ আছে।- মানবজমিন

শেয়ার করুন