এক দশকে লটারীর নামে ২৫ কোটি টাকা লুট

0
161
Print Friendly, PDF & Email

গত এক দশকে আর্ত মানবতার সেবায় আয়োজিত লটারির অন্তত ২৫ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের লটারি অনুমোদন শর্তে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে লটারি দেয়া নিষিদ্ধ হলেও তা মানছেন না আয়োজকরা। মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা ও লটারি এজেন্ট-আয়োজকের যোগসাজশে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে লটারি অনুমোদন নিয়ে তা বিক্রি করে দিচ্ছে চিহ্নিত একটি চক্র। লটারি আয়োজন ও ড্র নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়সহ বেশির ভাগ পুরস্কার দেয়া হয়নি। গত এক দশকে এমন ৩০টি লটারির নামে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২৫ কোটি টাকা।
সূত্র জানিয়েছে, অবিক্রীত টিকিটের ওপর ড্র অনুষ্ঠান হওয়ায় এবং ড্র শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক শ্রেণীর এজেন্ট-আয়োজক হাতিয়ে নেয় পুরস্কারের টিকিট।
লটারির অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্বেই বাংলাদেশ অরগানাইজেশন অব ডিজএবল এসোসিয়েশন (বোডা)-র নির্বাহী পরিচালক লায়ন এম খলিলুর রহমান খুন হন ২০১১ সালের ১লা জানুয়ারি। ২০০৪ সালে বোডা’র লটারি করে তিনি আয় করেন কমপক্ষে ১ কোটি টাকা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। অন্ধকল্যাণ সংস্থার লটারি কিনে নেন খলিলুর রহমান। কিনে নেন লায়ন এ বাদল চক্ষু হাসপাতাল লটারি ২০১০ এক কোটি টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে। লটারি ড্র হওয়ার পরপরই তিনি সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যান। লটারি কেনা ও ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করলেও পরে সেই তদন্তের গতি থেমে যায়।
সংগঠন বঞ্চিত হয় যেভাবে- অন্ধকল্যাণ লটারির ২৮ লাখ টিকিট, আধুনিক লটারির ৪০ লাখ টিকিট, অন্ধকল্যাণ ২-এর লটারির ৪০ লাখ টিকিট, ক্যান্সার সোসাইটির লটারির ৪০ লাখ টিকিট, সোসাইটি অব হাইপারটেরশন লটারির ৪০ লাখ টিকিট, লায়ন ফাউন্ডেশন লটারির ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টিকিট, ইউসেফ লটারির ৫০ লাখ টিকিট এবং আধুনিক লটারির ৪০ লাখ টিকিটের ওপর ড্র হয়। অথচ এসব সংগঠনের তহবিলে টিকিট বিক্রীর সঙ্গে আনুপাতিক হারে টাকা জমা হয়নি। সোসাইটি অব হাইপারটেনশন লটারি, ক্যান্সার সোসাইটি লটারি, অন্ধকল্যাণ সমিতির লটারি, আধুনিক লটারি, লায়ন্স লটারি, ইউসেফ লটারি এবং পিএলএফ লটারির ক্ষেত্রে বিক্রিত টিকিটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাউন্ডেশনের তহবিলে জমা হওয়া অর্থের কোন মিল নেই। এসব লটারির ক্ষেত্রে সংগঠনের তহবিলে জমা হয়েছে ১৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪২ লাখ টাকা।
আয়োজকরা যেভাবে জিম্মি- অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লটারির অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ খুব একটা জড়িত নন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লটারি এজেন্ট নামধারী একটি চক্র বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের লটারি পরিচালনার অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ভুল বুঝিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিপুল অর্থ ভাগ-বাটোয়ারার সুযোগ নেয়। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ তদন্ত করলে অনেক প্রতিষ্ঠানের লটারি আয়োজনের অনিয়ম ফাঁস হবে। উন্মোচিত হবে তাদের মুখোশ। আর্ত মানবতার সেবায় আয়োজিত লটারি নিয়ে তারা কি করছে- তা জানতে পারবেন মানুষ। এজেন্টদের একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে লটারি মাফিয়ারা তথ্য সংগ্রহ করে জেনে নেয় কোন প্রতিষ্ঠান কবে, কখন এবং কোন লটারি আয়োজন করবে। সে অনুযায়ী তারা আগেভাগেই কাজ শুরু করে দেয় লটারি কেনার জন্য। সব ফাঁকফোকর গলিয়ে এবং তদবির করে শেষ পর্যন্ত সফলও হয় তারা। ২০০৯ সালের ৩১শে মে থেকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আধুনিক লটারি কিনে নেয় দিশারী এন্টারপ্রাইজের মালিক দেলোয়ার হোসেন দিলদার। ৪০ লাখ টাকায় এ লটারি তিনি কিনে নেন বলে স্বীকার করেন। এছাড়া লায়ন্স ফাউন্ডেশনের লটারি যৌথভাবে ৩০ লাখ টাকায় কিনে নেন এডসফট কমিউনিকেশনের মালিক রফিকুজ্জামান নাসিম ও দিশারী এন্টারপ্রাইজের মালিক দেলোয়ার হোসেন দিলদার। লায়ন্স ফাউন্ডেশনের লটারি নিয়ে আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়। লটারির টিকিট বিজি প্রেসে ছাপানোর কথা থাকলেও তা বাইরের প্রেসে ছাপানো হয়। লটারির দ্বিতীয় পুরস্কার যশোরের সামসুল হক দাবি করলেও তাকে মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়ে ভাগিয়ে দেয়া হয়। আধুনিক লটারির প্রথম পুরস্কার ২৫ লাখ টাকা বরিশালের মুলাদির ওয়ার্ড কমিশনার শিউলি পারভীন দাবি করেন। তার পুরস্কারের টাকা নিতে সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে নিয়ে বৈঠক করতে হয়েছে। এ লটারির পুরস্কারের প্রাপ্ত অর্থ থেকে তাকে ৫ লাখ টাকা কম দেয়া হয়। এতে মিডিয়াম্যান হিসেবে কাজ করেন লটারি এজেন্ট নাসিম।
পুরস্কার ও লটারি কেনা- লটারি এজেন্ট রফিকুল ইসলাম খান ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন লটারির প্রথম পুরস্কারের ২৫ লাখ টাকা পান। দিশারী এন্টারপ্রাইজের মালিক দেলোয়ার হোসেন দিলদার যৌথভাবে ৩০ লাখ টাকায় লায়ন ফাউন্ডেশন লটারি কিনে টিকিট কেলেঙ্কারি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ২০০৯ সালের ৩১শে মে থেকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আধুনিক লটারি কিনে দেলোয়ার হোসেন দিলদার আয় করেন কমপক্ষে ২ কোটি টাকা। এছাড়া, খান এন্টারপ্রাইজ বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি লটারি-২০০৬, বাংলাদেশ সোসাইটি অব হাইপারটেনশন-২০০৮ ও ২০১০ সালের ৮ই নভেম্বর থেকে ২০১১ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বাংলদেশ সোসাইটি অব হাইপারটেনশন লটারি কিনে নেয়। এ লটারিরও প্রথম পুরস্কারের ২৫ লাখ টাকা একটি চক্র হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে।
অবিক্রীত টিকিটের ওপর লটারি ড্র: ২০১০ সালের শেষের দিকে লায়ন এ বাদল চক্ষু হাসপাতাল লটারির ড্র হয়। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়সহ বেশির ভাগ পুরস্কার দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এজেন্টরা জানান, অবিক্রীত টিকিটের ওপর ড্র হওয়ায় লটারি কিনে পুরস্কার পাননি অনেকে। এছাড়া লটারির টিকিট বিজি প্রেসে ছাপানোর কথা থাকলেও তা বাইরের প্রেসে ছাপানো হয়। সর্বশেষ গত ২১শে মে লায়ন এ বাদল চক্ষু হাসপাতাল লটারির ২-এর ড্র হয় প্রেস ক্লাবে। এ লটারিরও প্রথম পুরস্কার গত এক মাসে কেউ দাবি করেননি বলে এজেন্টরা জানিয়েছেন। প্রবীণ লটারি এজেন্ট মোসলেম সরদার মানবজমিনকে বলেন লটারির পুরস্কার না দেয়ায় বাজারে আগের তুলনায় টিকিট বিক্রি কমে গেছে। এ ব্যাপারে মোবাইলে দফায় দফায় যোগাযোগের চেষ্টা করেও লায়ন এ বাদল চক্ষু হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক এম রফিকুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। এর আগে ভিওএ ক্রীড়া উন্নয়ন দ্বিতীয় পর্ব লটারি ২০০৯-এর ড্র হয় ওই বছর ১৬ই মার্চ বেলা ২টায় ৬/৩ পুরানা পল্টন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাইজবন্ড শাখার কর্মকর্তারা ড্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ড্র শেষে প্রথম পুরস্কারের ২৫ লাখ টাকা পান ছ- সিরিজের ০৪৯০১১৮ নম্বর টিকিট। পরে জানা যায়, ওই টিকিট ছিল অবিক্রীত। সদরঘাট পোস্ট অফিস থেকে লটারি ড্রয়ের দুদিন আগে অবিক্রীত টিকিটের যে তালিকা দেয়া হয় তাতে প্রথম পুরস্কারের ওই টিকিট ছিল। আবার ড্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার দাবি করা হয়। এ নিয়ে মামলা চলে দীর্ঘদিন। এ অবস্থায় লটারি ক্রেতাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে অবিক্রীত টিকিটের ওপর ড্র হয়। আর ড্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজক-এজেন্টরা হাতিয়ে নেন পুরস্কারের টিকিট। কয়েকজন এজেন্ট তা স্বীকার করেছেন। সন্ধানীর এক কর্মকর্তা জানান, তারা লটারি করেন বিশেষ সফটওয়ার তৈরি করে অবিক্রীত টিকিট বাদ দিয়ে। টিকিটের নিয়মাবলীতে বলা হয়ে থাকে, কোন প্রকার লেখা, অঙ্কন, মুদ্রণ বা অন্য কোনভাবে টিকিট নষ্ট করা হলে তা পুরস্কারে অযোগ্য বিবেচিত হবে। তবে, লটারির এজেন্ট অথবা আয়োজক পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবেন না এ শর্তটি জুড়ে দেয়া নেই টিকিটের নিয়ামাবলী কিংবা অনুমোদন শর্তে। এর ফলে অনেকে বিজয়ী হওয়ার পরও পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হন।
লটারি অনুমোদনের শর্ত- লটারি অনুমোদনের শর্তে রয়েছে সরকার কর্তৃক নিবন্ধনকৃত কোন সিএ ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করে লটারির টিকিট বিক্রির আয় ও ব্যয়ের হিসাব বিবরণী ড্র অনুষ্ঠানের তিন মাসের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে হবে। অনুমোদন শর্তে আরও রয়েছে লটারির অনুমতি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কোন অবস্থাতে বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না। ড্র অনুষ্ঠানের দিন বা পুরস্কার বিতরণের দিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধির উপস্থিতি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ড্র অনুষ্ঠানের ২ মাসের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ নিশ্চিত করে তথ্যাদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে পাঠাতে হবে। শুধু বিক্রীত টিকেটের মধ্যেই লটারির ড্র নিশ্চিত করতে হবে। শর্তাবলী লঙ্ঘন বা অমান্য করা হলে, জাতীয় লটারি নীতিমালা ২০১১-এর ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবুও থেমে নেই লটারি কেনাবেচা। বিক্রীত টিকিটের মধ্যেই লটারির ড্র অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিশ্চিত করার শর্ত অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ দিলেও তা কেউ মানছেন না । পাশাপাশি এ পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। আয়োজকদের দাবি, অনেক সময় লটারির পুরস্কার ক্রেতারা দাবি না করায় পুরস্কার দেয়া যাচ্ছে না।
সমপ্রতি মানস-এর লটারি ছাড়া হয় বাজারে। ৯ই জুলাই হয় এর ড্র অনুষ্ঠান। এ পরিস্থিতিতে মানস সভাপতি অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী বলেছেন, বিশেষ সফট ওয়ারের মাধ্যমে অবিক্রীত টিকিট বাদ দিয়ে ড্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়- যাতে লটারি নিয়ে কোন প্রশ্ন না ওঠে।

শেয়ার করুন