বাজারদর নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে শক্তিশালী করল না সরকার

0
53
Print Friendly, PDF & Email

বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহ পর ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) নিয়ে কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, ‘বাজারে যাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সাধারণ মানুষের যাতে কষ্ট না হয়, সে জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য টিসিবির মাধ্যমে আমদানি করা হবে।’
এরপর কেটে গেল সাড়ে চার বছর। কিন্তু টিসিবির অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত টিসিবির শক্তিশালীকরণ-সংক্রান্ত ফাইল কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝখানে গত মার্চে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয় সংস্থাটির শক্তিশালীকরণ-বিষয়ক প্রস্তাব।
কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঢিলেমির কারণে আর কিছুই এগোচ্ছে না। নতুন প্রস্তাব যাচ্ছে না আর মন্ত্রিসভার বৈঠকে। বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে।
গত বৃহস্পতিবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাইল পড়ে রয়েছে অতিরিক্ত বাণিজ্যসচিব এটিএম মূর্তজা রেজা চৌধুরীর দপ্তরে।
গলদটি কোথায়, কোথায় আটকে রয়েছে—জানতে চাইলে মূর্তজা রেজা চৌধুরী কোনো জবাব দিতে রাজি হননি। তবে বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিসিবিকে শক্তিশালী করতে সব রকমভাবেই চেষ্টা চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই একটি ফল দেখা যাবে বলে আশা করছি।’ দুই বছর আগে তৎকালীন বাণিজ্যসচিব গোলাম হোসেনও প্রায় একই আশ্বাস দিয়েছিলেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাড়ে চার বছরে টিসিবি নিয়ে অনেক পরিকল্পনাই করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাধিক বৈঠক। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিসিবি, টিসিবি থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়—এ রকম চিঠি চালাচালিতেই পার হচ্ছে দিন, মাস, বছর। কিন্তু সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়েনি এক ফোঁটাও।
অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারভুক্ত পাঁচ বিষয়ের মধ্যে এক নম্বরটাই হলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করা হবে।’ বাস্তবতা হচ্ছে, সাড়ে চার বছরে বাজারে কোনো হস্তক্ষেপই করতে পারেনি সরকার। প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা দূরের কথা, টিসিবি স্থানীয় বাজার থেকেও প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।
টিসিবির কর্মপরিকল্পনা ও সচিব কমিটির অনুমোদন: ‘টিসিবিকে শক্তিশালীকরণ ও এর কার্যক্রম গতিশীলকরণ’ শীর্ষক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টিসিবিকে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয় ২০১০ সালে।
সে অনুযায়ী টিসিবি তখন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে। এর মধ্যে রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও নবগঠিত রংপুর বিভাগে আঞ্চলিক শাখা গঠন এবং পণ্য আমদানিতে গণখাতে ক্রয় আইন থেকে সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দেওয়া রয়েছে। আর আছে গুদাম ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ ও পণ্যের উৎপাদন মৌসুমেই রপ্তানিকারক দেশ থেকে পণ্য আমদানি করা-সম্পর্কিত বিষয়াদি।
যদিও সব পরিকল্পনা অনুমোদন করেনি সচিব কমিটি। কমিটি টিসিবির কার্যাবলি, পর্ষদ, মূলধনকাঠামো ও ভর্তুকির বিষয়ে কিছু প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। বলা হয়েছে, সাধারণ কার্যাবলির বাইরে টিসিবি সীমিত আকারে রপ্তানি বাণিজ্যও পরিচালনা করতে পারবে। টিসিবির কোনো মুনাফাপ্রবণতা থাকবে না।
পর্ষদের সদস্য হবেন চেয়ারম্যান ছাড়া আরও পাঁচজন। এর মধ্যে তিনজন হবেন টিসিবির সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা এবং দুজনকে নিয়োগ দেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মূলধন পাঁচ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হবে। পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার ভর্তুকিও দেবে।
দুর্বলতার নেপথ্য কথা: টিসিবিকে দুর্বল করার প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত এরশাদ সরকারের শেষ দিক থেকে। তবে সংস্থাটিকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে বিএনপি সরকার। ১৯৯৫ সালে এক হাজার ৩৩৬ জনের জনবল কমিয়ে আনা হয় ৭১৩ জনে।
আওয়ামী লীগ সরকার (১৯৯৬-২০০১) ক্ষমতায় এসে টিসিবিকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েও কিছু করেনি।
চারদলীয় জোট সরকার (২০০১-০৬) আবারও ক্ষমতায় এসে সংস্থাটিকে প্রায় মেরে ফেলার উদ্যোগ নেয়। শুরুর বছর ২০০২ সালেই এর জনবল ৭১৩ থেকে ২৩৫-এ নামিয়ে আনা হয়। এরপর সংস্থাটিতে আর নতুন নিয়োগ হয়নি। বর্তমান সরকার কিছু নতুন নিয়োগ দেয়।
টিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো টিসিবি কোনো লোকসানি প্রতিষ্ঠান নয়। ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করেও টিসিবি মুনাফা করে আসছে। প্রধান কার্যালয়সহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় টিসিবির ৪৩ বিঘা পতিত জমি রয়েছে।
এদিকে, পণ্য আমদানি করতে প্রতিবছর টিসিবিকে এক হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তাপত্র বা লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিট (এলটিআর) দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু রপ্তানিকারক দেশের মৌসুমের সময় যখন পণ্যমূল্য কম থাকে, তখন টিসিবি সক্ষমতার অভাবে পণ্য আমদানির জন্য এলসিই খুলতে পারে না।
টিসিবির চেয়ারম্যান সারোয়ার জাহান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সক্ষমতা বাড়ানো হলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে টিসিবি।’ কিন্তু সক্ষমতাটি কবে বাড়বে, সেটি তারও প্রশ্ন।

শেয়ার করুন