বেগম খালেদা জিয়ার সামনে যত চ্যালেঞ্জ……

0
78
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া টানা তিন দশক ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এই দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি দুইটি পূর্ণ মেয়াদ এবং একটি সংক্ষিপ্ত মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

একটি পূর্ণ মেয়াদে তিনি পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন এবং সেইবার বিএনপি ছিল জাতীয় সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দল। আর চলতি নবম জাতীয় সংসদেও তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী হিবেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এরমধ্যে অন্যতম হলো, আগামী জাতীয় নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হওয়া, নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ে ১৮ দলীয় জোটের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা, সংস্কারপন্থি হিসাবে পরিচিত বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে যথাযথ দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে পদক্ষেপ নেয়া এবং দণ্ডিত ও বিতর্কিত ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানদের মনোনয়ন দেয়া। তাদের অভিমত, এই চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করার উপর নির্ভর করছে বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলের ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কঠিন সময় তার জীবনে নতুন কিছু নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক তিরোধানের পর অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতিতে আসতে হয়েছিল তাকে। তিন দশকের রাজনীতির ক্যারিয়ারে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিয়েছেন বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অনমনীয় ভূমিকা তাকে দিয়েছিল আপসহীন নেত্রীর খেতাব।

এরপর কখনও প্রধানমন্ত্রী অথবা কখনও বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসনে বসেছেন তিনি।

২০০৭ সালের এক-এগারো বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে যে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে তার ধকল এখনও পোহাতে হচ্ছে তাকে। সেনা সমর্থিত সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে তার পুরো পরিবারকেই। বড় ছেলে তারেক রহমানকে সইতে হয়েছে নির্মম নির্যাতন। যিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে অবস্থান করছেন বৃটেনে।

ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও দেশের বাইরে। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে বিশেষ কারাগারে বন্দি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সমঝোতার চেষ্টা করেছিল জরুরি সরকার। যেখানে জেনারেল এটিএম আমিনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ক্ষুব্ধ করেছিল তাকে।

নানামুখী চাপে নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও বিপর্যয় কাটাতে পারেননি বিএনপি চেয়ারপারসন। ভূমিধস পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার দল ও জোটকে। এরপরের ইতিহাস তার জন্য আরও দুঃখজনক। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বেগম খালেদা জিয়া। সে দৃশ্য আসলেই বিরল। রাজপথের আন্দোলনে কখনও দাঁড়াতেই পারেনি বিএনপি।

তবে সর্বশেষ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্বস্তির হাসি ফুটিয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার মুখে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন পাঁচটি নির্বাচনেই। আর ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে দ্রুত। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৪শে অক্টোবর ভেঙে যাবে নবম সংসদ- যদি প্রেসিডেন্টকে সংসদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৪ সালের জানুয়ারির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে সে নির্বাচন?

বিএনপির এক যুগ্ম-মহাসচিবের ভাষাতেই, সেটি হতে পারে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ নির্বাচন। কিন্তু বিলিয়ন ডলারের প্রশ্নটি রয়েই গেছে। কোন পদ্ধতিতে হবে সে নির্বাচন। ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত অনড় অবস্থানে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া বলছেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া বিএনপি কোন নির্বাচনে যাবে না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে কোন সমঝোতা যদি না হয় তবে কি হবে?

সিটি নির্বাচনের ফল এবং বিভিন্ন জনমত জরিপের আলোকে এটা হয়তো বলা যায়, বিএনপিই এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। কিন্তু সাংগঠনিক দিক থেকে দলটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। রাজপথের আন্দোলনে জয়লাভের মতো সাংগঠনিক শক্তি বিএনপির রয়েছে কিনা তা নিয়ে খোদ দলটির অনেক নেতাকর্মীই সন্দিহান। গত প্রায় এক যুগ ধরে বিএনপির সাংগঠনিক বিষয় দেখভাল করছিলেন তারেক রহমান।

কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে কেউই সেভাবে হাল ধরতে পারছেন না। তারেক রহমানের অনুপস্থিতির কারণে সারা দেশে সংগঠন গোছানোর মতো কাউকে খুঁজে হয়রান হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। সার্বিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের রাজনীতিতে আসার খবরও শোনা গেছে কয়েকবার।

কিন্তু তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত পারিবারিকভাবে এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে বিএনপির পরামর্শদাতাদের একটি অংশ ডা. জোবায়দা রহমানকে রাজনীতিতে আনার পরামর্শ খালেদা জিয়াকে দিয়েছেন।

বহুমতের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত বিএনপিকে অতীতে অনেক অভ্যন্তরীণ সঙ্কট মোকাবিলা করতে হয়েছে। সর্বশেষ জরুরি অবস্থায় আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আবির্ভাব ঘটেছিল সংস্কারপন্থিদের। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখেও এ বিষয়টি চিন্তায় রাখতে হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে।

এই যখন অবস্থা তখন বেগম খালেদা জিয়াকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্দলীয় সরকার না হলে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে তিনি যাবেন কিনা। এ সিদ্ধান্তের ওপর আসলে নির্ভর করছে বহু কিছু।

শেয়ার করুন