কোটাবিরোধী বিক্ষোভ সংঘর্ষ

0
66
Print Friendly, PDF & Email

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ চলাকালে রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ঘটনাস্থলসহ আশপাশ এলাকা। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা ও প্রক্টরের কার্যালয়ে ভাঙচুর করেছেন। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় অন্তত ২৮ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন চারজন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে শাহবাগ, নীলক্ষেত ও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর দিয়ে কোনো গাড়ি চলাচল করতে না পারায় রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বেলা ১১টার দিকে ৩৪তম বিসিএসের অকৃতকার্য পরীক্ষার্থী ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা স্লোগানসহকারে শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশি বাধায় আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে সরে যায়। তবে আরেকটি অংশ তখনো শাহবাগে অবস্থান করে প্রশাসন ও পিএসসির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। এ সময় পুলিশ ১০-১৫ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে ঢুকে পড়ে। টিএসসি থেকে শাহবাগগামী রাস্তার পুরোটাই টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ধোঁয়া থেকে বাঁচতে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় তারা টিএসসির সামনে এটিএন নিউজ ও একাত্তর টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে চারুকলা অনুষদের সামনের রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।
বেলা ১টার দিকে চারুকলার সামনে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আহত হন একজন। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা এ সময় মিছিল বের করে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মিছিলসহকারে দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়রের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে নীলক্ষেতের দিকে এগিয়ে যায়। নীলক্ষেত এলাকায় পুলিশ মিছিলে বাধা দিলে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছোড়েন। পুলিশও পাল্টা কাঁদুনে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এ সময় মিছিলটি ফিরে এসে উপাচার্যের বাসভবনে ও প্রক্টর কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা কেন, জবাব চাই’ স্লোগান দিতে থাকে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজি চালিত একটি অটোরিকশা ভাঙচুর করেন। রমনা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার শিবলী নোমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতেই তাদের শাহবাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রলীগের হামলা : বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবন ও প্রশাসনিক ভবনে হামলার পর বিক্ষোভ করতে করতে শাহবাগের দিকে যেতে থাকেন। মিছিলটি মধুর ক্যান্টিনের সামনে পেঁৗছালে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর চড়াও হন। হামলায় নেতৃত্ব দেন জহুরুল হক হল ছাত্রলীগ সভাপতি রিফাত জামান ও সাধারণ সম্পাদক জয়। এতে সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। হামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান, কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে ছাত্রলীগ একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে শোডাউন করে। বেলা দেড়টার দিকে ঢাবি প্রক্টরের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ কর্মীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে পুনরায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান বলে জানিয়েছেন নির্যাতিত শিক্ষার্থীরা। বাসভবনে হামলার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে এ হামলা করা হয়েছে। আন্দোলনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করার কিছু নেই। পুলিশ ক্যাম্পাসে অনুমতি নিয়ে ঢুকেছে কি না_ জানতে চাইলে ঢাবি প্রক্টর আমজাদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পুলিশ কোনো অনুমতি নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা হয়েছে। এতে অজ্ঞাতনামা ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও প্রগতিশীল ছাত্রজোট মধুর ক্যান্টিনে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ, জাসদ ছাত্রলীগ সভাপতি শামসুল ইসলাম, ছাত্রমৈত্রী সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসের প্রতিবাদ ও তাণ্ডবের তীব্র নিন্দা জানাই। তাদের ধৃষ্টতার জন্য শাস্তি দাবি করছি।’ তিনি বলেন, আমরা কোটা পদ্ধতি সংকোচনের পক্ষে তবে তা হতে হবে পিএসসির সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে। দাবি আদায়ে স্মারকলিপি প্রদান করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা যায়। ছাত্রলীগের হামলাকে অস্বীকার করে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কেউ এখানে হামলা করেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের খাটো করে কথা বলায় ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ হামলা করতে পারে। অন্যদিকে, প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি এস এম শুভ, ছাত্র ফ্রন্ট সভাপতি সাইফুজ্জামান সাকন, ছাত্র ফেডারেশন সভাপতি সৈকত মলি্লক প্রমুখ। তারা পুলিশের এ হামলায় প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন।
দুর্ভোগ : বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত শাহবাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে নীলক্ষেতে যাওয়ার পথে সব ধরনের যান চলাচল একেবারে বন্ধ ছিল। ফলে ওই এলাকা দিয়ে শাহবাগে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতালে যেতে দুর্ভোগে পড়েন রোগীরা।
কোটা বাতিলে উকিল নোটিস : বিসিএসসহ সব পাবলিক পরীক্ষার কোটা পদ্ধতি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাতিলের দাবিতে উকিল নোটিস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। এখলাস উদ্দিন নামের এই আইনজীবী গতকাল এই নোটিস দেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা সময় দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংস্থাপন সচিব ও শিক্ষা সচিব ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিবকে নোটিসটি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোটা বাতিল না করলে আগামীকাল হাইকোর্টে রিট করা হবে।

শেয়ার করুন