জিম্মি যোগাযোগ ব্যবস্থা ভোগান্তিতে যাত্রী

0
157
Print Friendly, PDF & Email

মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে কম পরিমাণ সিএনজি দিয়ে বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, নিজেরা নগদ বিক্রি করলেও গ্যাস কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি টাকা বকেয়া রাখাসহ নানারকম অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার আখড়ায় পরিণত হয়েছে দেশের অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন। সিএনজি সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে সরকারি সহায়তায় গড়ে তোলা বেশ কয়েকটি স্টেশন রীতিমতো গ্যাস চুরি ও লুটপাটের মতো অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পান থেকে চুন খসলেই সিএনজি স্টেশনগুলোয় ধর্মঘট ডেকে সীমাহীন ভোগান্তির সৃষ্টি করাসহ যোগাযোগব্যবস্থাকে প্রায় জিম্মি করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি সিলেটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকে কেন্দ্র করে সিএনজি মালিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ উত্থাপন নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলে। এ পরিস্থিতিতে অন্য কোনো সংস্থা সিএনজি স্টেশনের তৎপরতা মনিটরিং করতেও সাহস পাচ্ছে না। রমজান মাসকে কেন্দ্র করে বিআরটিএ সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য যে রুটিন প্রস্তুত করেছে সেখান থেকেও বাদ রাখা হয়েছে সিএনজি স্টেশনগুলো। পেট্রোবাংলার ভ্রাম্যমাণ আদালত শীঘ্রই আর কোনো সিএনজি স্টেশনে অভিযান চালাচ্ছে না। তাদের মাসিক মনিটরিং-ব্যবস্থার মধ্যেও সিএনজি স্টেশনগুলোকে এড়িয়ে চলার কৌশল নেওয়া হয়েছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশে ৫৮৭টি অনুমোদিত সিএনজি স্টেশন রয়েছে। যন্ত্রপাতি সেটিংয়ের পর গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে আরও প্রায় ৬০টি সিএনজি স্টেশন চালুর অপেক্ষায় আছে। আরপিজিসিএলের পারমিশন অ্যান্ড মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা উপ-মহাব্যবস্থাপক ফেরদৌসী বেগম জানান, অন্তত ১৬টি সংস্থার ছাড়পত্র ও অনুমোদনের পরই আরপিজিসিএল সিএনজি স্টেশনের অনুমোদন দিয়ে থাকে।

কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটি ট্রেড লাইসেন্স আর বিস্ফোরক অধিদফতরের অনাপত্তি ছাড়পত্র নিয়ে শুরু করা সিএনজি স্টেশনগুলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) লাইসেন্স পর্যন্ত নেয়নি। আট বছর আগে থেকে আইন থাকা সত্ত্বেও এসব সিএনজি স্টেশন বিইআরসিকে কোনোরকম ফি দেয়নি এবং তাদের কাছ থেকে লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। শুধু বিইআরসি লাইসেন্স খাতেই সিএনজি স্টেশন ও পেট্রল পাম্পগুলো ৪০০ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশন মালিকদের দাবি, তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক পরিদর্শন দফতরের অনুমোদন ও আরপিজিসিএলের বৈধ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন। এর ওপর অতিরিক্ত ফি দিয়ে বিইআরসি লাইসেন্স করা তাদের দ্বারা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন সিএনজি মালিকরা। সিএনজি স্টেশনগুলোর বিরুদ্ধে বরাবরই মিটার টেম্পারিংয়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর আগে সুনামগঞ্জ শহরে একটি সিএনজি স্টেশনে মিটারে কারচুপির মাধ্যমে গ্যাস চুরির অভিযোগে ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময়ই মূলত মিটার টেম্পারিং ও বাইপাস গ্যাস লাইনের মাধ্যমে সরকারেরর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ে। শহরের মলি্লকপুরে অবস্থিত সজীব রঞ্জন দাস সল্টুর মালিকানাধীন সিনথিয়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে এ অভিযান চালানো হয়। জরিমানা ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ আদালত ফিলিং স্টেশনের মিটার খুলে নিয়ে যায়। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে মিটার টেম্পারিংয়ের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই শতাধিক পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনকে জরিমানাসহ বিভিন্ন শাস্তি প্রদান করেন।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কিছুসংখ্যক পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনে পরিমাপে জালিয়াতির মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলো জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত থাকলেও এর মিটারগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিএসটিআই। ছয় মাস অন্তর এসব মিটার চেক করে পুনরায় নবায়ন সিল লাগিয়ে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জনবলের অভাব দেখিয়ে বিএসটিআইর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত সিএনজি স্টেশনের মিটারগুলো সরেজমিন চেকিং করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএসটিআইর স্বাক্ষরিত নবায়ন সিলগুলো ঠিকই অসাধু ব্যক্তিদের হাতে চলে যায় এবং যথারীতি পরিমাপক যন্ত্রের গায়ে সেট করা থাকে। মিটার টেম্পারিংয়ের অভিযোগ নিয়ে এসব সিএনজি স্টেশনে অভিযান চালাতে গিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বাধার সম্মুখীন হয়। তবে সিএনজি স্টেশন মালিক সমিতির মহাসচিব সাজিদ হোসেন চৌধুরী দীপু বলেন, ‘পেট্রোবাংলা আমাদের ওপর অযাচিতভাবে হয়রানি চালিয়ে থাকে। যখন তখন ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে বিনা কারণে লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে। এতে ব্যবসায়িকভাবে যেমন ক্ষতির শিকার হচ্ছি, তেমনি সামাজিকভাবেও হেয়প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে।’ এদিকে সিএনজি স্টেশন চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। পান থেকে চুন খসলেই ধর্মঘট, বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের সব সিএনজি স্টেশন। এসব কথা ক্ষোভের সঙ্গে জানান গাড়িচালক, পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বেশ কিছু ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। সরকার গ্যাস রেশনিংয়ের ঘোষণা দিলে সিএনজি স্টেশনে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকা হয়, কোনো সিএনজিতে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটলেও সিএনজি স্টেশনে ধর্মঘট আহ্বানের নজির রয়েছে। চাঁদাবাজির মামলার আসামি গ্রেফতার করাতেও বাড়তি চাপ হিসেবে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন কেউ কেউ। এ ব্যাপারে সিএনজি মালিক সমিতির একাধিক নেতা বলেন, আমরা যে কোনো সমস্যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করি। পেট্রোবাংলা থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন স্তরে কথা বলেও যখন গোয়ার্তুমি দেখা যায় তখনই শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট পালন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

শেয়ার করুন