বিমানবন্দরেই তাঁর থাকা খাওয়া

0
58
Print Friendly, PDF & Email

লোকে শুনলে হাসবে। বলবে, পাগল নাকি লোকটা! স্রেফ একজনের সই সংগ্রহ করার জন্য এত্ত হ্যাপা! কিন্তু আমাদের চেনা স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, লাভ-ক্ষতির ক্যালকুলেটরের বোতাম চাপতে চাপতে আঙুল ক্ষয়ে ফেলা মানুষগুলোর সঙ্গে ভিক্টর নাভোরস্কিকে মেলালে চলবে না। সদ্য প্রয়াত বাবার অতৃপ্ত স্বপ্ন পূরণের জন্য দুরন্ত ষাঁড়ের চোখেও সে লাল রুমাল বেঁধে দিতে প্রস্তুত!
১৯৫৮ সালে হাঙ্গেরীয় একটি পত্রিকায় সে সময়কার বিশ্বখ্যাত ৫৭ জন জনপ্রিয় জ্যাজ শিল্পীর ছবি ছাপা হয়েছিল। এই ছবি চোখে পড়েছিল জ্যাক-অনুরাগী ভিক্তরের বাবার। একে একে ছবির ৫৬ জনের অটোগ্রাফ নিতে পেরেছিলেন। বাদ ছিলেন শুধু একজন। সেই সইটা পাওয়ার আগেই জীবননদীর ওপারে চলে যান নাভোরস্কি সিনিয়র। সেই একজন অবশিষ্ট শিল্পীর অটোগ্রাফের জন্য ভিক্টর পা রেখেছিলেন জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
চেক ইন যখন করছিলেন, ঠিক সেই সময় তাঁর দেশ ক্রাকোজিয়ায় ঘটে যায় সেনা অভ্যুত্থান। সেই দেশটির ওপর থেকে স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাতিল হয়ে যায় ভিক্টরের পাসপোর্ট। আইনিভাবে তিনি জেএফকে বিমানবন্দরে বৈধভাবেই প্রবেশ করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রবেশের অধিকার তাঁর আর নেই। উপায় নেই দেশে ফিরে যাওয়ারও। আইনের অদ্ভুত এক মারপ্যাঁচে পড়ে বিমানবন্দরের টার্মিনালেই থাকতে শুরু করেন ভিক্টর। অদ্ভুত এক জীবন!
আর সেই অদ্ভুত গল্পটাই টম হ্যাংকসকে দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ, তাঁর দ্য টার্মিনাল ছবিতে। টার্মিনাল ছবির এই গল্প কিন্তু নেওয়া হয়েছিল সত্য ঘটনা থেকে। প্যারিসের শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরের ১ নম্বর টার্মিনালে টানা ১৭ বছর (১৯৮৮-২০০৬) কাটিয়ে দিয়েছিলেন ‘দেশহীন’ ইরানি শরণার্থী মেহরান কারিমি নাসেরি।
ভিক্টর নাভোরস্কি কিংবা মেহরান নাসেরির গল্পটার সঙ্গে মেলানো কঠিন। তবে ঠিক কী কারণে কে জানে, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মেক্সিকোর কানকুন বিমানবন্দরের টার্মিনালে বসবাস করছেন এক নারী। তাঁকে দেশহীন বলার জো নেই। কারণ, তিনি নিজেই একজন মেক্সিকান। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমানে করে উড়ে দেশে ফেরার পর আর ঘরে ফেরেননি। বিমানবন্দরের রেস্তোরাঁয় খাচ্ছেনদাচ্ছেন। ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘুমোচ্ছেন মেঝেতে। বিমানবন্দরের ওয়াশরুমে গোসল করছেন। হাতমুখ ধুচ্ছেন, প্রয়োজনে কাপড়-চোপড়ও।
নাভোরস্কির মতো অবশ্য টাকার টানাটানিতে পড়তে হচ্ছে না। সঙ্গে এটিএম কার্ড আছে, দরকার পড়লেই টাকার একুশ শতকীয় সিন্দুকের ফুটোয় কার্ড ঢুকিয়ে কড়কড়ে নোট বের করে নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধ যেহেতু করেননি, ফলে পুলিশ তাঁর ওপর চড়াও হতে পারছে না। মার্সেলা সিলভিয়া মন্তানা মানসেরা নামের ৪৫ বছর বয়সী নারীটিকে নিয়ে কৌতূহল দিন দিন বাড়ছে।
ঠিক কবে থেকে বিমানবন্দরে এমন স্বেচ্ছানির্বাসন তিনি নিয়েছেন, বলা যাচ্ছে না। তবে মাঝবয়সী এক নারী যে বিমানবন্দরটাকেই অস্থায়ী আবাস বানিয়ে ফেলেছেন, সেটি নিরাপত্তাকর্মীরা বুঝতে পারেন গত ৩০ জুন। তিনি তো আর এডওয়ার্ড স্নোডেন নন যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অপেক্ষায় আছেন। টার্মিনাল-এর টম হ্যাংকস যে নন, সেটা তো আগেই বলা হয়েছে। এমনকি তাঁর যে টাকাপয়সা নেই, সেই কারণেই ঘরে ফিরতে পারছেন না, তেমনটাও বলা যাচ্ছে না।
সূত্র: দ্য নিউজ, অস্ট্রেলিয়া

শেয়ার করুন