পৌর নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিবেশীর চোখে ঘুম নেই: সিরাজুর রহমান

0
69
Print Friendly, PDF & Email

সাধারণ বুদ্ধিতে বলে, স্থানীয় সরকার নিতান্তই স্থানীয় প্রয়োজনে। সুতরাং স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে প্রতিযোগিতা হবে স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক। স্থানীয় অদিবাসীরা নিজেদের এলাকার চাহিদা বিবেচনা করে এমন প্রার্থীদের নির্বাচিত করবেন, যারা সেসব চাহিদা ভালোভাবে মেটাতে পারবেন। অন্য দিকে জাতীয় নির্বাচনে বিবেচ্য ইস্যুগুলো অনেক বেশি ব্যাপক। সে নির্বাচনের ক্ষেত্র অনেক বেশি প্রশস্ত।

অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন, সমাজকল্যাণ, অর্থনীতির উন্নয়ন ইত্যাদি থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি  বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকেরা ভোট দেবেন বলে প্রত্যাশা করা হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সাধারণভাবেই নির্বাচনবিমুখ। মাঝে মাঝে তারা স্পষ্ট করেও বলে যে, বাকশালী পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়াই তাদের কাম্য। আর আমরা জানি, নির্বাচনহীনতা এবং গণতন্ত্রকে হত্যা করাই ছিল বাকশালী পদ্ধতির উদ্দেশ্য। বেশি দূর যাওযার প্রয়োজন নেই, রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি বিবেচনা করাই যথেষ্ট। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল পাঁচ বছর আগে। কিন্তু সে নির্বাচন আজো হয়নি। কবে হবে, কেউ জানে না।

উন্নত সমাজে জনমত তাদের সাথে আছে কি না, প্রশাসনের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা কী ইত্যাদি যাচাই করার জন্যও অনেক সময় নির্বাচন দেয়া হয়। সুইজারল্যান্ডের নিজস্ব পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে জাতীয়ভাবে এবং স্থানীয় ইস্যুতে স্থানীয়ভাবে গণভোট করা হয়। গরিষ্ঠ নাগরিকদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে নীতিনির্ধারিত হয়ে থাকে।

ঢাকা মহানগর কিভাবে শাসিত হবে, এমন বিশাল নগরীর অধিবাসীদের স্বাস্থ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, পয়ঃপ্রণালী, পরিবেশ ও আবহাওয়া ইত্যাদি কিভাবে পরিকল্পিত ও পরিচালিত হবে, সে সম্বন্ধে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাগরিকদের মতামত দেয়ার অধিকার অস্বীকার করে আসা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটানোর অজুহাত হিসেবে সরকার রাজধানীকে দ্বিখণ্ডিত করেছে নজিরবিহীনভাবে। অথচ নাগরিকদের কাছ থেকে কর নেয়া হচ্ছে ঠিকই। ‘নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেনটেশন’ (প্রতিনিধিত্ব না দিলে কর দেয়া যাবে না) এ মহান আদর্শের কোনো মূল্য নেই বর্তমান সরকারের কাছে। তাদের ভয়, নির্বাচন হলেই তারা হেরে যাবে।

আসলেও হচ্ছে তাই। বাংলাদেশে সবার ধারণা, বর্তমান সরকারের কোনো জনসমর্থন নেই। বিদেশীদেরও এখন বোধোদয় হচ্ছে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষায় শেখ হাসিনার সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে, তারা এখন জনরোষে ভুগছে। অথচ এ সরকার গদি আঁকড়ে থাকতে চায়। যেকোনো মূল্যে তারা গদি ধরে রাখতে চাইবেই। স্থানীয়ভাবে নির্বাচন হলেও সবার জানা সত্যটা আবারো প্রমাণ হয়ে যাবে এ ভয়ে তারা রাজধানীতেও স্থানীয় নির্বাচন দিতে চায় না।

কিন্তু অনেক চাপ আছে তাদের ওপর; জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক। সেজন্য খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট এ চারটি সিটি বা পৌর করপোরেশনে তারা নির্বাচন দিয়েছিল। শাসক দল এবং হয়তো বিরোধীরাও জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও বেশি নিবিড় প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে সেখানে। কিন্তু ফলাফল যা হওয়ার, তাই হয়েছে।

চারটি পৌর করপোরেশনেই শাসক দলের সমর্থিত প্রার্থীরা ‘বেধড়ক মার’ খেয়েছেন। বলাবলি হচ্ছে, শাসক দল অসাধুতা না করলে তাদের সমর্থিত সব প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যেত। নতুন সৃষ্ট গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আগামী কাল (৬ জুলাই, শনিবার)।

এখানেও আওয়ামী লীগের ভরাডুবি এড়ানোর জন্য সরকার প্রার্থী আটক করার কৌশলসহ কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখেনি। যে চারটি সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তারাও কবে শপথ নেবেন, কবে তারা ক্ষমতা পাবেন, ইত্যাদি নিয়ে কেবল জল্পনা-কল্পনাই হচ্ছে। জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এভাবে ক্ষমতাবঞ্চিত রাখা রীতিমতো অপরাধ ও কেলেঙ্কারি।

কিন্তু বাংলাদেশের এই স্থানীয় নির্বাচনগুলো নিয়ে বিশাল প্রতিবেশী দেশ ভারতের ঘুমে ইতোমধ্যেই ব্যাঘাত ঘটতে শুরু করেছে। আমার এক ভারতীয় বন্ধু একবার বলেছিলেন, দিল্লির পররাষ্ট্র দফতরের মূল নিয়ামক রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) ডিম পাড়ে কলকাতার প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আনন্দবাজার আর টেলিগ্রাফ পত্রিকার অফিসে, সেখানে সে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানো হয়। এ দু’টি পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পৌর করপোরেশনগুলোর নির্বাচনও র-কে (এবং দিল্লির পররাষ্ট্র দফতরকে) দস্তুরমতো ভাবিয়ে তুলেছে।

ঋণেরও সমাপ্তি থাকে

টেলিগ্রাফ পত্রিকার একটি বক্তব্য আমার খুবই অসরল এবং কপট মনে হয়েছে। পত্রিকাটি লিখেছে : ‘সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহী পৌর নির্বাচনে বিএনপি’র বিজয় থেকে কী মনে হয় যে, এ দলটি জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন ফিরে পেয়েছে, বিশেষজ্ঞরা সে বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছেন।’ শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম বছরের পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, রাজনৈতিক হত্যা, ধরপাকড় ও নির্যাতন, পুলিশের সর্বাত্মক দলীয়করণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম-খুন এবং সর্বব্যাপী বেসামাল দুর্নীতির কারণে তারা সম্পূর্ণরূপে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সম্ভবত ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন অজুহাতে ইসলামবিরোধী আচরণ দেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মুসলমানকে সরকারের প্রতি বিমুখ করে তুলেছে। আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির হুকুম এবং ইসলাম-দ্রোহী ব্লগারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদীদের নির্যাতন, গ্রেফতার, হত্যা এবং ৬ মে অতি ভোরে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে বাংলাদেশের মানুষ এখন ‘ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা হিসেবেই দেখছে। বিগত বছর দুয়েকে ভারতের কূটনৈতিক সাংবাদিকেরাও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন হলে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং এ ব্যাপারটা দিল্লির সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে।

মনে হচ্ছে, টেলিগ্রাফ পত্রিকার ‘বিশেষজ্ঞরা’ এখনো মনঃস্থির করতে পারছেন না শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের চেয়ে বিরোধী দল বিএনপি বেশি জনপ্রিয় কি না। পত্রিকাটি অবশ্যই বিশেষজ্ঞ নির্বাচনে ভুল করেছে। নয়তো এই ‘বিশেষজ্ঞ’রা বিগত তিন বছর ঘুমিয়ে ছিলেন। সে যা হোক, প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত এ দু’টি পত্রিকার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারতের প্রত্যাশার শেষ নেই এবং কখনো শেষ হবে না। ৪২ বছর আগে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার আক্রমণে বাংলাদেশের মানুষ অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছিল।

সে সময় ভারত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে কিছু সহায়তা দিয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতের সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধও করেছিল। কিন্তু তাতে আমাদের যেমন অস্তিত্বের প্রশ্ন ছিল, তেমনি ভারতেরও বিরাট সামরিক স্বার্থ জড়িত ছিল।

পাকিস্তানের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাবদ ভারতকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছিল। ঢাকায় পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের পর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের বিশাল বাহিনীর যাবতীয় সমরোপকরণ ভারতীয়রা নিয়ে যায়। এ সবের মূল্য কয়েক হাজার কোটি ডলার হবে। ভারতীয় সৈন্যরা ঢাকার বাজারের প্রচুর বিলাসসামগ্রী এবং পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া শত শত বিদেশী মোটরগাড়ি বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় হঠাৎ করে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয়ও অর্ধেক হয়ে গেল। পূর্ব সীমান্তের প্রতিরক্ষা নিয়ে তার আর কোনো উদ্বেগ কিংবা ভাবনা রইল না। কিন্তু বাংলাদেশের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার প্রতিদান দাবি করার সময় ভারতীয়রা এ ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যেতে চায়। একাত্তরে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ভারতের কাছে ঋণী। সব ঋণেরই সমাপ্তি থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। ভারত যেন চক্রবৃদ্ধি হারের সুদে অনন্তকাল ধরে সে ঋণের পরিশোধ চায়।

আমাদের জাতীয়তাবাদকে কেন ওরা বৈরী মনে করে

অখণ্ড পাকিস্তানি আমলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ভারতের আচরণ যেমন ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেও কতকগুলো ব্যাপারে তারচেয়ে বিশেষ কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। কলকাতা ও আশপাশের আস্তানা থেকে একশ্রেণীর ভারতীয় পরগাছা বিভিন্ন নামে বাংলাদেশবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল ক্ষমতায় এলে ভারতীয় মদদপুষ্ট কোনো কোনো বাংলাদেশীও তাদের সাথে গিয়ে যোগ দেয়। এসব অবন্ধুসুলভ আচরণ সংযত করার জন্য ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেননি।

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সন্ত্রাসে ভারত থেকে চোরাচালান হয়ে আসা বোমাসহ অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ স্থল সীমান্ত যেখানে আছে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে। তা ছাড়া, স্মরণকালের মধ্যেই বহু বাংলাদেশী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিপীড়ন থেকে পালিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতেও গিয়েছিলেন।

তাদের অনেকে ভারতীয় পরিবারে আশ্রয় এবং অন্যান্য সাহায্য পেয়েছেন। তার জের ধরে বাংলাদেশ হয়ে সে রাজ্যগুলোর স্বাধীনতাকামীদের কাছে কিছু অস্ত্রশস্ত্র যাওয়া বিচিত্র নয়। টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী সেজন্য অতীতে খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের প্রতি ভারত বিরূপ ছিল।

প্রতিবেশী দেশকে একটা কথা মনে করিয়ে দেয়া দরকার। অতীতেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের অসহযোগ এ দেশের মানুষের মর্মপীড়ার কারণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কয়েকজন বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা একদলীয় সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। বাংলাদেশের মানুষ ছিল বাকশালবিমুখ। বিদ্রোহীরা আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা এবং মুজিব সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে বসায়। মোশতাক যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন, তাতে মুজিবের মন্ত্রিসভার আটজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু দিল্লি সে সরকারের সাথে কোনো প্রকার সহযোগিতা করেনি।

সে বছরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে ব্যাপকভাবে দিল্লি কর্তৃক অনুপ্রাণিত মনে করা হয়। সে অভ্যুত্থানের দিনে দিল্লির সাউথ ব্লকে (বিদেশ মন্ত্রক) মিষ্টান্ন বিতরণ করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে খালেদ মোশাররফ পালিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অনেকের ধারণা। সেনাসদস্যদের হাতে ধরা পড়ে তিনি নিহত হন। খালেদ মোশাররফ জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেছিলেন। সেনাসদস্যরাই জিয়াকে মুক্ত করে সেনা সদর দফতরে নিয়ে যান।

শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম কয়েক মাসের মতো ছিল জেনারেল জিয়া সরকারের জনপ্রিয়তা। কিন্তু তার সরকারের প্রতিও দিল্লি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। এমনকি জিয়ার উদ্যোগে যে সার্ক গঠিত হয়, তার প্রতিও দিল্লির মনোভাব ছিল হিমশীতল। তখন থেকেই স্পষ্ট যে, ভারত ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত এবং পদাবনত রাখতে চায়।

বন্ধুত্ব সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়

খালেদা জিয়ার ২০০১-২০০৬ সালের সরকারের বিরুদ্ধে টেলিগ্রাফ প্রতিবেদকের অভিযোগের তালিকায় একটা হচ্ছে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের গ্যাসবাহী পাইপলাইন বসাতে দেয়া হয়নি। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের ভেতর দিয়ে অপর দেশের পাইপলাইন, বিদ্যুৎ পরিবহন লাইন, ট্রানজিট প্রদানের অনুমতি ইত্যাদি অনেক কিছু বিচার-বিবেচনার বিষয়। তার সাথে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। সেজন্য দু’দেশের মধ্যে সদ্ভাব এবং আর্থিক বিচার-বিবেচনা অত্যাবশ্যকীয়।

আগেই বলা হয়েছে, শুধু খালেদা জিয়ার সরকারই নয়, বাংলাদেশের কোনো জাতীয়তাবাদী সরকারের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা ভারত করেনি। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদকের কাছে জিজ্ঞাস্য, ভারত কি অন্য কোনো দেশকে তার দেশের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন কিংবা ট্রানজিট করতে দেবে? নেপাল যদি পাকিস্তানের সাথে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি করতে চায় তাহলে দিল্লি কী জবাব দেবে?

শেখ হাসিনার সাথে গোপন চুক্তি করে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে এশীয় মহাসড়কের দুই ধারা আসামে নিয়ে গেছে। সড়ক, রেল ও নদীপথে ট্রানজিটের ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর দু’টির অবাধ ব্যবহারের সুযোগ আদায় করে নিয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে এ কারণে যে, এ সরকারের পেছনে জনসর্মথন নেই। এ সরকার গদি পেয়েছিল ভারত-মার্কিন আঁতাতের কারণে এবং তারা আশা করে, ভারতের সমর্থনের জোরেই তারা গদি আঁকড়ে থাকতে পারবে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক লিখেছেন, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর উত্তরপূর্ব ভারতকে ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশ আর্থিক লাভবান হবে। কিন্তু এ যাবৎ যা জানা গেছে ট্রানজিট কিংবা বন্দর ব্যবহার বাবদ কোনো মাশুল ভারত দেবে না। শেখ হাসিনার অর্থ উপদেষ্টা মশিউর রহমান তো আমাদের বলেই দিয়েছেন, ভারতের কাছ থেকে ফি কিংবা মাশুল চাওয়া হবে অসভ্যতা।

টেলিগ্রাফের নিবন্ধে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ঔদার্যের আরো কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে বাংলাদেশের কাছে ভারতের পানিবিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব। গরু মেরে জুতা দানের এমন নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আর বোধ করি কল্পনাও করা যাবে না। ভারত পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন নদীগুলোতে বাঁধ তৈরি করে। এ যাবৎ ৫২ কিংবা ৫৩টি অভিন্ন নদীতে এ ধরনের বাঁধ তৈরি করেছে ভারত। তার ফলে বাংলাদেশের যে অস্তিত্ব সঙ্কট দেখা দিয়েছে, ভারতীয়দের দৃষ্টিতে সেটা বিবেচ্য নয়।

আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী, এসব নদীর পানির ন্যায্য অংশ বাংলাদেশকে দিতে ভারত বাধ্য। কিন্তু সেসব আইনি বাধ্যবাধকতাকে ভারত গ্রাহ্য করছে না। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা সমঝোতা অনুযায়ী পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র তিন সপ্তাহের জন্য ফারাক্কা বাঁধটি চালু করা হয়েছিল। সে ‘তিন সপ্তাহ’ আজো শেষ হয়নি। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ার সাথে ফারাক্কায় পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করেন। সে চুক্তি অনুযায়ী ভারত কোনো বছরই বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। তারপর থেকে প্রায় সব অভিন্ন নদীতেই একতরফা বাঁধ তৈরি করেছে ভারত।
ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি
বাংলাদেশের নদীগুলো শুকনো মওসুমে পুরোপুরি শুকিয়ে হেজেমজে গেছে। বর্ষায় ভারত যখন বাঁধগুলো খুলে দেয়, সেসব নদীর প্লাবন ধরে রাখার মতো স্থান বাংলাদেশের নদী খাতগুলোতে আর নেই। খরার মওসুমে স্রোতবেগ থাকে না বলে বাংলাদেশে নদীর মোহনাগুলো পলি জমে উঁচু হয়ে গেছে। সামুদ্রিক জোয়ারের পানি একবার ঢুকলে আর নেমে যেতে পারে না। বাংলাদেশের বন্যা ক্রমেই বেশি ব্যাপক, বেশি ঘন ঘন এবং মারাত্মক হয়ে উঠছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমি বরাবরের মতো তলিয়ে যাচ্ছে।

এখন আবার টিপাই মুখে বরাক নদীতে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ তৈরি করছে ভারত। এ বাঁধ তৈরি হলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী শুকিয়ে যাবে। মেঘনা অববাহিকা শুকিয়ে বাংলাদেশের পূর্বার্ধের পরিবেশ বিপন্ন হবে। টিপাইমুখ বাঁধ থেকেও বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ বিক্রি করার প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। এ যদি উদারতা হয়, তাহলে বলতেই হবে ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’। এমন ঔদার্যে আমাদের কাজ নেই।

ভারত ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশীদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়াই উচিত। অবশ্য এমনও দেশ আছে যারা প্রতিবেশীদের সাথে বিরোধ নিয়েও টিকে আছে। আরব-ইসরাইলিরা একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু বন্ধুত্বের পূর্ব শর্তই হচ্ছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা। পারস্পরিক সহযোগিতা ও আন্তরিকতার প্রশ্ন পরে আসবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মুসলমান।

স্বভাবতই এ দেশের গরিষ্ঠ দলে মুসলিম প্রাধান্য থাকবে। সেটাকে বন্ধুত্বের পথের কাঁটা বলে মনে করা ভারতীয় মিডিয়া এবং বিশেষজ্ঞদের ঘোরতর অন্যায়। বাংলাদেশের বর্তমান শাসক দলের প্রধান ভোটব্যাংক হিন্দু সম্প্রদায়। আওয়ামী লীগ ঘোরতর অন্যায় করলেও হয়তো এই ভোটব্যাংক টিকে থাকবে। এটা গণতন্ত্রকে অস্বীকার করারই শামিল। সীমান্তের ওপারের তথাকথিত শুভকামীরা সে কথা সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়ে বলছেন কই?

বাংলাদেশের মানুষ ভারতের বন্ধুত্ব চায়। কিন্তু বন্ধুত্ব সমানে সমানে হতে হয়। মহাজন আর খাতকে বন্ধুত্ব হতে পারে না। বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে একশ্রেণীর ভারতবাসীর মনোভাবে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশ কামধেনু নয় যে, ভারতবাসী অনন্তকাল ধরে সে গরুর দুধ পান করে যাবে। একাত্তরের ঋণ পরিশোধ হয়ে গেছে। সে ঋণের অফুরন্ত ফল ভারত বরাবরই ভোগ করে যাবে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সাকল্য বাবদ। এখন দরকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে বন্ধুত্বের।

 
(লন্ডন)

বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান

[email protected]

শেয়ার করুন