২৮ হাজার পোশাক কারখানার জন্য পরিদর্শক মাত্র ৩৯ জন

0
64
Print Friendly, PDF & Email

সারা দেশে অনুমোদিত ২৮ হাজার পোশাক কারখানা পরিদর্শনের জন্য সরকারি একমাত্র প্রতিষ্ঠান— কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের পরিদর্শক আছেন মাত্র ৩৯ জন। অঙ্কের হিসাবে একজন পরিদর্শকের ৭১৭টির বেশি কারখানা পরিদর্শনের কথা। রাজধানীতে অনুমোদিত পোশাক কারখানা আছে ১৭ হাজার।
পরিদর্শনের জন্য এই পরিদপ্তরের নিজস্ব কোনো পরিবহন নেই। এসব তথ্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের।
২০০১ সালের করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে অনুমোদন নেই এমন পোশাক কারখানা আছে দুই লাখ ৪১ হাজার। তবে গত ১২ বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে না কমেছে, তার কোনো হিসাব নেই পরিদপ্তরের কাছে। পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, লোকবল ও আনুষঙ্গিক সংকটে অননুমোদিত কারখানা পরিদর্শন করতে পারছেন না তাঁরা।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর সূত্র জানায়, সারা দেশে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের ৩১৪টি পদের মধ্যে ১৮১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। দীর্ঘদিন ১৩৩টি পদ শূন্য আছে। সারা দেশে ১০৩টি পদের বিপরীতে পরিদর্শক আছেন ৫১ জন। তাঁদের মধ্যে পরিদর্শনে অবহেলা ও গাফিলতির জন্য ১২ জন পরিদর্শক সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন।
ঢাকা বিভাগে ও রাজধানীতে পরিদর্শনের জন্য ৩৬টি পদের বিপরীতে পরিদর্শক আছেন ২০ জন। পরিদপ্তরের অধীন ঢাকা, রংপুর ও চট্টগ্রামে মাত্র তিনটি বিভাগীয় কার্যালয় আছে। ঢাকা বিভাগের অধীন নারায়ণগঞ্জ, রংপুর বিভাগের রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লায় আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এসব কার্যালয়ে একজন করে পরিদর্শক আছেন।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের উপপ্রধান পরিদর্শক মঞ্জুরুল কাদের বলেন, প্রায় প্রতিদিন শ্রম আদালতে দায়ের হওয়া মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজিরা দিতে হয় বেশির ভাগ পরিদর্শককে। নিজস্ব পরিবহন ও পরিদর্শকের সংকটে সময়মতো কারখানা পরিদর্শন করা যায় না। পরিদর্শকদের যে ভ্রমণভাতা দেওয়া হয়, তা দিয়ে বাসভাড়াও হয় না।
গত মাসে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন ওবায়দুল ইসলাম। ওই সময় তিনি প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের জন্য দুই হাজার ২৯১ জনের জনবল কাঠামো উপস্থাপন করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। এই জনবল পাওয়া গেলে কলকারখানা পরিদর্শন জোরালো করা যাবে।
ত্রুটিপূর্ণ কারখানার বিরুদ্ধে মামলা: গত পাঁচ মাসে কারখানায় ত্রুটির জন্য শ্রম আদালতে পরিদপ্তর ১৮৩টি মামলা করেছে। এর মধ্যে ১৭৭টি মামলা করা হয় পোশাক কারখানায় বিকল্প সিঁড়ি না থাকা বা সিঁড়ি অপ্রশস্ত হওয়ায়। এগুলোতে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই।
গত বছর ত্রুটিপূর্ণ কারখানার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল এক হাজার ৫৬৬টি। আর ২০১১ সালে মামলার সংখ্যা ছিল এক হাজার ৯৬।
পরিদপ্তর সূত্র জানায়, শ্রম আইনের ৩২৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো কারখানা বা কোনো শ্রেণীর কারখানা নির্মাণ, প্রতিষ্ঠা বা সম্প্রসারণের জন্য এই পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শকের অনুমোদন নিতে হয়। কারখানার অনুমোদনের (লাইসেন্স) জন্য কারখানার ধরন অনুযায়ী ৫০০ থেকে ১৮ হাজার টাকা ফি দিতে হয়।
পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই পরিদপ্তরের দায়িত্ব হলো কারখানার ভেতরে পর্যাপ্ত স্থান, নিরাপত্তা, আলো-বাতাস, যন্ত্রপাতি ও কেমিক্যাল রাখার স্থান ও কারখানায় ওঠা-নামার সিঁড়ি প্রশস্ত আছে কি না, তা পরিদর্শন করা। এগুলোর ঘাটতি থাকলে পরিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। আর অবকাঠামো ঠিক আছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও পৌরসভার।
শর্ত পূরণে ব্যর্থ কারখানাগুলোকে ঝূঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা ঠিক করার জন্য চিঠি দেয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর। কারখানার মালিক পদক্ষেপ না নিলে শ্রম আদালতে মামলা করার নিয়ম। তবে শ্রম আইনে দায়ের হওয়া মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা। ফলে অনেক সময় মালিক জরিমানার এই টাকা দিয়ে কারখানা আর ঠিক করেন না। তাই আইন সংস্কার না হলে কারখানাগুলো ত্রুটিপূর্ণই থেকে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগে বরখাস্ত ১১: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের বিরুদ্ধে সময়মতো ও যথাযথভাবে কারখানা পরিদর্শন না করারও অভিযোগ আছে।
সাভারের নয়তলা রানা প্লাজায় ধসের আগে ফাটল দেখা দিলেও পরিদর্শনে যায়নি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর। পরদিন ২৪ এপ্রিল ভবনটি ধসে পড়লে এক হাজার ১৩১ জন পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েক শ শ্রমিক। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শককে প্রত্যাহার এবং তিনজন পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গত বছরের ২৪ নভেম্বর আগুনে পুড়ে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের ১২৩ পোশাকশ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা কারখানাটি পরিদর্শন করেননি। ওই ঘটনায় পরিদপ্তরের ছয়জন পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গত ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের পাশে স্মার্ট এক্সপোর্ট লিমিটেডে আগুন লেগে সাতজন পোশাকশ্রমিক মারা যান। এ ঘটনায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের দুজন পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কারখানা পরিদর্শন প্রসঙ্গে মো. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, পরিদপ্তরে পরিদর্শক ও অনুষঙ্গিক সংকট বর্তমানে চরম পর্যায়ে, তাই সব কারখানা সময়মতো পরিদর্শন করা যাচ্ছে না। তার পরও কারখানা পরিদর্শনে সাধ্যমতো চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তবে মিরপুরের শেওড়াপাড়ার শামীম গ্রুপের এম অ্যান্ড শার্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেন, মিরপুর ১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত ভার্টেক্স ফ্যাশন নামের পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক (কারখানা) নজরুল ইসলাম, খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডের কাছে মোহাম্মদী গ্রুপ লিমিটেডের একটি পোশাক কারখানার মানবসম্পদ কর্মকর্তা সৈয়দ এহতেশাম কবির প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের কারখানায় পরিদর্শক এসেছিলেন। সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে গেছেন।

শেয়ার করুন