টায়ার থেকে জুতো

0
100
Print Friendly, PDF & Email

ভার্সিটিজীবন শেষ হতে না হতেই যখন লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিসিএস গাইড বই মুখস্থ করতে কিংবা নামীদামি বিদেশি কোম্পানিতে চাকরির জন্য আবেদনপত্র লিখতে বসে যান, তখন সবার চেয়ে আলাদা কিছু স্বাধীনচেতা, উদ্যমী তরুণ খুঁজে বেড়ান নতুন প্রকল্পের আইডিয়া। তাঁরা মাস শেষে মোটা অঙ্কের বেতনের স্বপ্ন না দেখে উদ্ভাবনের নেশায় অনেক দিনের জমানো সঞ্চয়ও খরচ করে ফেলেন নির্দ্বিধায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের মির্জা জুনায়না সাবাহ, সৈয়দ আজিম হায়দার, সাকিফ নাঈম খান ও অর্থনীতি বিভাগের তাসমিয়া নাহরিন এমনই কয়েকজন উৎসাহী তরুণ উদ্যোক্তা। গত ১৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন আয়োজিত ‘ডেল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০১৩’ প্রতিযোগিতার ফাইনালে নিজেদের সামাজিক ব্যবসা পরিকল্পনা উপস্থাপন করে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩২ লাখ টাকা) পুরস্কার জিতে এসেছেন তাঁরা।
২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। এ বছর মোট তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যমানের পুরস্কারের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইনে জমা পড়েছিল মোট দুই হাজার ৬০৫টি প্রজেক্ট। অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এ প্রতিযোগিতার ফাইনালে জার্মানি, মেক্সিকো, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের দলকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দল ‘ফুট সোলজার’ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। প্রথম পুরস্কার পেয়েছে সিঙ্গাপুর ও ভারতের একটি যৌথ দল। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের কী এমন পরিকল্পনা, যা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কেও হারিয়ে দিল? দেশে ফিরে ‘স্বপ্ন নিয়ে’কে সে গল্পই শোনালেন বিজয়ী তরুণ উদ্যোক্তারা। (অনিবার্য কারণে যুক্তরাষ্ট্র যেতে পারেননি দলের অন্যতম সদস্য আজিম।) আমরা কথা বলি জুনায়না সাবাহ, সাকিফ ও তাসমিয়ার সঙ্গে।
জুনায়না বলেন, ‘গাড়ির বাতিল টায়ার ব্যবহার করে স্বল্প খরচে পরিবেশবান্ধব জুতা তৈরির প্রকল্প হচ্ছে “ফুট সোলজার”। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে গত শীতে আমরা সবাই পঞ্চগড়ে শীতবস্ত্র বিতরণ করতে যাই। সেখানে দরিদ্র মানুষের হাতে গরম কাপড় তুলে দিতে গিয়ে আমরা দেখি, সমস্যা শুধু কাপড়েরই নয়। তীব্র শীতের মধ্যেও তাদের অনেকের পা খালি, ঠান্ডা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে তারা। আমরা ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো, বাংলাদেশে এমন লাখ লাখ মানুষ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা খালি পায়ে কাটিয়ে দিচ্ছে, সাধারণ মানের জুতা কেনার সামর্থ্যও তাদের নেই। ফেরার পথে সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছিল, শুধু বছরে একবারের জন্য গরম কাপড় বিতরণ করেই কি আমাদের দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যায়? বিষয়টি আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দেয়, আর সে ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ফুট সোলজার।’
শুরুটা হয়ে যায় এভাবেই। স্বল্প খরচে কীভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই জুতা তৈরি করা যায়, এ নিয়ে পড়াশোনা করতে উঠেপড়ে লেগে যান চার বন্ধু। নানা ভাবনাচিন্তার পর মনে হলো, প্রতিবছর লাখ লাখ গাড়ির টায়ার বাতিল হয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশে সেগুলো নবায়ন করে ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি করার কোনো ব্যবস্থা নেই। অসংখ্য টায়ার পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, এতে শহরের বাতাস মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই ফেলে দেওয়া টায়ার হতে পারে রাবারের ভালো উৎস। ব্যস, হয়ে গেল! ‘কম খরচে জুতা তৈরির চেষ্টা আর গাড়ির বাতিল টায়ার—দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে দেরি হয়নি আমাদের’, যোগ করলেন তাসমিয়া।
একেই বলে সমস্যা থেকে সুযোগ সৃষ্টি করা। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যাঁরা আইডিয়া নিয়ে কেবল সঠিক সময়ের অপেক্ষায় বসেই থাকেন, কাজ আর শুরু করা হয়ে ওঠে না। ফুট সোলজার দলটির সদস্যরা কিন্তু তেমন নন। মাথায় আইডিয়া আসার পর থেকেই তাঁরা কাজ করতে মাঠে নেমে যান। প্রথমে কয়েকজন মুচির সঙ্গে কথা বলে অল্প কয়েকটি টায়ার থেকে কিছু জুতার নমুনা তৈরি করেন। শুধু নমুনা নয়, মাত্র এক মার্কিন ডলারে কীভাবে মানসম্মত, পরিবেশবান্ধব জুতা তৈরি করা যাবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা বানিয়ে ফেলেন তাঁরা। কিন্তু সবাইকে তো জানাতে হবে এই উদ্যোগের কথা। বিনা খরচে প্রচার করার জন্য তাঁরা বেছে নেন ফেসবুক। বাতিল টায়ার থেকে বানানো জুতাগুলোর ছবি তুলে ফেসবুকে ‘ফুট সোলজার’-এর ফ্যান পেজ তুলে দেন তাঁরা। অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করেন এই উদ্যোগে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার জন্য। বিশেষত অনেকেই তাঁদের গাড়ির বাতিল টায়ার তুলে দিতে চান এই তরুণ উদ্যোক্তাদের হাতে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এই চমৎকার সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগটি কি শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবেও হাজার হাজার পথশিশু বা দরিদ্র মানুষের পায়ে জুতা পরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে? ব্যবসা শুরু করে দেওয়ার জন্য ফুট সোলজারের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ছিল ন্যূনতম ৩০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪ লাখ টাকা)। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কীভাবে এত টাকা সংগ্রহ করা যাবে বুঝে উঠতে পারছিলেন না কেউই। তবুও হাল ছেড়ে না দিয়ে তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের প্রথম সাফল্য আসে প্রফেশনাল সোসাইটি অব সোশ্যাল বিজনেস ইন বাংলাদেশ আয়োজিত ‘সোশ্যাল বিজনেস প্ল্যান কম্পিটিশন ২০১২’-এ বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে। জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার জিতে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে তাঁদের, চোখ রাখেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতাগুলোতে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকল্প জমা দেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডেল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০১৩’ প্রতিযোগিতায়। এর পরের গল্প শুধুই সাফল্যের, বিদেশের মাটিতে দেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর।
এত বড় পুরস্কার জিতে দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে বলে মনে করেন দলের সদস্যরা। সাকিফ বলেন, ‘আমাদের যে প্রাথমিক পুঁজির দরকার ছিল, এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার জিতে সেটুকু অন্তত নিশ্চিত হয়েছে। এখন আমরা দেশের এনজিওগুলোর সঙ্গে যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাই। এ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি তাঁর পুরোনো টায়ার আমাদের প্রকল্পে দান করতে পারেন, এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য আমাদের ফেসবুক পেজে পাওয়া যাবে
জুনায়না, আজিম, সাকিফ ও তাসমিয়ারা প্রমাণ করে দিয়েছেন, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছে থাকলে প্রলয়ংকরী বন্যা কিংবা শৈত্যপ্রবাহের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, নিজেদের অবস্থান থেকেই অনেক কিছু করা যায়। নিজেদের অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রম দিয়ে তাঁরা স্বপ্ন দেখেন সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে সমাজকে বদলে দেওয়ার।

শেয়ার করুন