একজন মতিনের ভদ্রলোক হওয়ার গল্প

0
147
Print Friendly, PDF & Email

গল্পটা যে ভাবেই শুরু হোক নায়কের পরিচয়টা আগে দেই। নায়কের নাম আব্দুল মতিন। তার পিতার নাম- আদম মিয়া, দাদার নাম- কদম আলী। কদম আলীর পিতা ছুরত আলী একজন নামকরা মাতুব্বর ছিলেন। তার পিতা সাবুদ সেখ একজন কৃষক ছিলেন। তিনি ছিলেন খাটি গেরস্থ। সাবুদ শেখ রশিকনগর গ্রামে বসবাস করে জমি চাষ শুরু করেছিলেন। তখন কৃষকদের যৌবন ছিল। গোলায় ছিল ধান। অভাব তখনো তাড়া করেনি। রাজা-জমিদারদের হাত রশিকনগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না। আত্মীয় বান্ধবহীন সাবুদ শেখ তার পুত্র ছুরত আলী কে বিয়ে দিল খাঁ বাড়ীর কন্যা কৈতরীর সাথে। সে অনেক আগের কথা। ধনের সাথে মান বৃদ্ধি পেল। একটা তালুকের সামান্য অংশ কিনে ছুরত আলী তালুকদার বনে গেলেন। ছুরত তালুকদার কৃষকের সন্তানÑ ভদ্রলোকের ভাগ্নে। মাতুল বাড়ির খুব দাপট। বংশ মর্যাদার নেশায় পেয়ে বসল ছুরত তালুকদারকে। ছুরত তালুকদার নিজেকে গেরস্থঘরের সন্তান ভাবতে নারাজ। অভিজাত মানুষের সাথে উঠাবসা। তার ছেলে কদমকে মেট্রিক পাশ করালেন। কদম ছিলেন সহজ সরল। বাপের ইচ্ছায় বিয়ে নিলেন সলিমনগর জমিদার বাড়িতে। আসল তরফের মেয়ে জমিদার হাসান সাহেবের একমাত্র কন্যা। পরিবারের অভিজাত্য বৃদ্ধি পেল। কদম আলী তালুকদার জমিদার জামাতা খাটি ভদ্রলোকের মতো বসে বসে খান আর ঘুমান। যেই সেই কথা না খাঁ বাড়ীর ভাগ্নে আর জমিদার বাড়ীর জামাতা। জমি চাষ করলে কি আর চলে? ভদ্রলোকি চলে যাবে। ওসব করা অন্যায়। জমি চাষ করবে ছোটলোক চাষা-ভূষা যারা তারা। তারপর ও পরিবারের সবাই মিলে মিশে থাকতো। কৃষকের রক্ত তো। মিলে মিশে থাকার মধ্যেই স্বাচ্ছন্দ। কদম আলীর পুত্র আদম মিয়া জমিদার বাড়িতে বিয়ে না করলেও সমগোত্রীয় পরিবারে আমেনা খাতুনকে ঘরে তুললেন। আমেনা খাতুন তালুকদার কন্যা। অতীতে অবশ্য তারাও গেরস্থ ছিল। আদম মিয়া আর আমেনার সন্তান আমাদের গল্পের নায়ক আব্দুল মতিন। আব্দুল মতিনের পইত দাদা কৃষক ছিলেন, বড়বাপ ছুরত আলী মূর্খ মাতুব্বর ছিলেন, দাদা কদম আলী মেট্রিক পাশ ছিলেন, পিতা আদম মিয়া আইএ পাস বেকার ছিলেন (তখন ভদ্রলোকের    সন্তানরা চাকুরী করতো না বেকার থাকতে ভালবাসতো। বসে বসে খেতে পারলে বেকার থাকাই ভালো)। আর আব্দুল মতিন এমএ পাস করলেন। এই পরিবার কৃষিকাজ ছেড়ে দেওয়ায় কৃষি জমিও তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছে। সংসারে নিত্য অভাব। আব্দুল মতিন ভদ্রলোকের সন্তান। অভাবে দিশেহারা। পারিবারিক ঐতিহ্য ভেঙ্গে আব্দুল মতিন একটা কেরানীর চাকরিতে ঢুকে গেলেন। আব্দুল মতিন হয়ে গেলেন মতিন সাহেব।
মতিন সাহেবের চাকরিটা বেশ মজার। মাসে মাসে কিছু উপড়ি পাওয়া যায়। বেতন ছাড়াও সংসার চলে। মতিন সাহেব ইচ্ছা করলেই বাজারের বড় মাছটা কিনে আনতে পারেন। টাকার অনেক ক্ষমতা। মতিন সাহেবের মধ্যে ভদ্রলোকের লক্ষণ না থাকলেও তিনি অভিজাত হওয়ার নেশায় মশগুল। মনে মনে ভদ্রলোক খোঁজেন আর খাতির করেন। মতিন সাহেব কে পরিপূর্ণ ভদ্রলোক হতেই হবে। মতিন সাহেব তার পইত দাদার নাম ভুলে গেলেন। বড়বাপের আমলের গল্প করেন। দাদার আমলের গল্প করেন। মতিন সাহেবের বাবার ইচ্ছা ভদ্রলোক ছাড়া আত্মীয় করবেন না। রক্ত নষ্ট করা যাবে না। মতিন সাহেবের রক্ত তিন সিঁড়ি পর্যন্ত বিশুদ্ধ (যদিও তার পূর্বে কি ছিল কেউই জানেনা)। মতিন সাহেব আর তার বাবা শুধু ভদ্রলোক খোঁজেন। অবশেষে পেয়ে যান তারা (খোঁজার মতো খুঁজলে নাকি আল্লাকেও পাওয়া যায়)।
    এমন এক পরিবার পাওয়া গেল যাদের মধ্যে বিগত একশ বছরে কোন ত্রুটি পাওয়া যায়নি। সেই পরিবারের কন্যা হচ্ছে নীলা। ধনে জ্ঞানে তারা আব্দুল মতিনের চেয়ে অনেক উর্দ্ধে (মানুষে বলে থাকে)। আব্দুল মতিন ধন নিয়া ভাবেন না, জ্ঞান নিয়া ভাবেন না- শুধু ভদ্রলোক নিয়া ভাবেন। লক্ষ টাকা কাবিন দিয়া আব্দুল মতিন নীলাকে ঘরে তুলে আনেন। আব্দুল মতিনের মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ। আব্দুল মতিনের সন্তান হবে খাটি ভদ্রলোকের সন্তান । দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। আব্দুল মতিন পরিপূর্ণ ভদ্রলোক হয়ে উঠেন। মতিন সাহেবের ভদ্রলোক হয়ে উঠার রাস্তা খোলে যায়। এই রাস্তা তিনি কোনো দিন দেখেননি। সে এক অন্য সমাজ। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। গাড়ি আছে, বাড়ি আছে কিন্তু প্রাণ নাই, প্রেম নাই। এখানে মানুষ্যত্ব নাই, কালো পাথরে চুম্বন করে এরা বেহেসতের টিকেট কিনে। আব্দুল মতিন মনে করে খাঁটি ভদ্রলোকদের এমনই হওয়া উচিত। আব্দুল মতিন কিছু মনে করেন না (পাছে ভদ্রলোকের মুখোশটা পড়ে যায়)। আংঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়, আব্দুল মতিন বিত্তশালী হয়ে যায়। আব্দুল মতিন যতই ভদ্রলোক হতে থাকলেন ততই তিনি একা হতে থাকলেন। তিনি একাÑ একজন ভদ্রলোক। সবাই তাকে ছেড়ে গেছে বন্ধু-আত্মীয় সবাই (তাহলে কি সবাই ছোট লোক?)।
    মতিন সাহেব চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। আলিশান বাড়িতে বসবাস করেন তিনি আর তার স্ত্রী। ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া। মাঝে মাঝে একাকীত্ব হানা দেয়। এদিক সেদিক ঘুরাফেরা করেন। শহরের বস্তির পরিবারগুলো দেখে মতিন সাহেবের খুব হিংসা হয়। মাঝে মাঝে গ্রামে যান তিনি। ওখানে গেরস্থ বাড়িতে থেকে যেতে ইচ্ছে করে। ওখানে মতিনের সমবয়সী ছিলো মজিদ। মজিদ আজ খুব সুখে আছে। বউ, ছেলে, নাতি নিয়ে আনন্দে দিন কাটায়। মাঝে মাঝে মতিন ভাবেন, কে বেশি সুখী মতিন না মজিদ? নীলা না মজিদের বউ? কে বেশি ভালো…
এলোমেলো চিন্তায় আব্দুল মতিনের মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটে… পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকেন… বুকে ব্যথা…
মতিন সাহেব হাসপাতালে। একা। তাকে দেখার কেউ নাই। মতিন সাহেব মুখোশটা খুলে ফেলতে চান। নাকে লাগানো অক্সিজেনের মাস্কটা অসহ্য মনে হয়। মতিন সাহেব মনে মনে প্রস্তুতি নেন চিৎকার করবেন… সবাইকে জানাবেন তার পূর্বপুরুষ কৃষক ছিলেন। তিনি ভদ্রলোক হতে চান না…. তিনি কৃষক হতে চান। কিন্তু পারেন না। তিনি কোমায় চলে গেছেন।

শেয়ার করুন