নাটের গুরু কাজী জাফর

0
49
Print Friendly, PDF & Email

জোট মহাজোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি(জাপা) এখন তুরোপের তাস। পার্টি চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ আওয়ামী লীগ-বিএনপির কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার বাজির ঘোড়ার মতো। আর সেই এরশাদের  নিয়ন্ত্রক এখন পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমেদ। জাপা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহাজোটে থাকবে কী থাকবে না, বিএনপির সঙ্গে ১৮ দলীয় জোটে যোগ দেবে কী দেবে না, বা অন্যকোন নির্বাচনী জোট গড়ে তুলবে কী না তার ঠিক করছেন কাজী জাফর। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে  জাপার অনেক নেতা বলছেন, পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদের নাটাই এখন কাজী জাফরের হাতে। এরশাদের কাছে পরীক্ষিত এই নেতা, এরশাদের শাসনামলের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর এখন জাপার বড় ফ্যাক্টর। 
 
হেভিওয়েট কয়েকজন নেতাসহ দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী আছেন তার সঙ্গে। মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসতে দলের চেয়ারম্যানকে শুরু থেকেই জোর তাগিদ দিয়ে আসছেন তারা। তবে দলের অপর একটি অংশ মনে করে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে জাতীয় পার্টিকে মহাজোট ছাড়তে হবে।  
 
দলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, কাজী জাফর আহমেদ খুব করে চাইছেন মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টি বের হয়ে আসুক। গত সাড়ে চার বছরে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টির যে বঞ্চনার শিকার হয়েছে সেসব ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসছেন তিনি। তার যুক্তি মহাজেটে গিয়ে জাতীয় পার্টি খুব বেশি গুরুত্ব পাননি। বরং মহাজোটের অন্য শরিকরা জাতীয় পার্টির চেয়ে কম শক্তিশালী হওয়ার পরও গুরুত্ব পেয়েছে বেশি। সর্বশেষ পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভাতেও পদ পেয়েছেন অনেকে। কিন্তু সে তুলনায় জাতীয় পার্টিকে গুরুত্বও দেয়া হয়নি। তাছাড়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর তা রাখা হয়নি। সবমিলিয়ে জাপা নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। এ নিয়ে দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকেও একাধিকবার বুঝিয়েছেন কাজী জাফর।
 
তাছাড়া বিগত নির্বাচনে কুমিল্লা-১৪ আসনটি ওপেন রাখায় বর্তমান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সেখান থেকে নির্বাচিত হন। কিন্তু ওই আসনটি জাতীয় পার্টিকে দিলে কাজী জাফর আহমদ সেখান থেকে সাংসদ হতে পারতেন। অন্যদিকে দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হওলাদারও মহাজোটের প্রতি সন্তুষ্ট নন। আশা করেছিলেন জাতীয় পার্টি মন্ত্রিপরিষদে আরও কয়েকটি পদ পাবে। তিনি সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন হতে পারতেন।   
 
সূত্রে জানা গেছে, এরশাদও মনে করেন সরকারের অনেক   কর্মকাণ্ড ইসলামের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর খেসারত মহাজোটকে দিতে হবে। তাই তিনিও চাইছেন মহাজোট থেকে বের হয়ে আসতে। দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছেন। তবে দলের অপর একটি অংশ চান না জাতীয় পার্টি মহাজোট ছাড়ুক। এ অংশে আছেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু, ব্যারিস্টার আনিসুল হক মাহমুদ। তারা মনে করছেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টিকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া সরকার এখনও শক্তিশালী বলে তারা বিশ্বাস করেন। বিচ্ছিন্ন কিছু অসন্তোষকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত এরশাদের জন্য সুখকর হবে না বলেও মনে করেন তারা। প্রভাবশালী একটি অংশের বিপরীতে তাদের এ অবস্থান নিয়ে দলে বেকায়দায় আছেন তারা। 
 
এদিকে সম্প্রতি যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। সূত্রে জানা গেছে, দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে এরশাদের মান ভাঙাতে এরশাদের প্রেসিডেন্ট পার্কে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই নেতা। তারা এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে চায়ের নিমন্ত্রণ করেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু এরশাদ যাই-যাচ্ছি করে সময় কাটাচ্ছেন। অথচ এর আগে প্রধানমন্ত্রীর চায়ের দাওয়াতের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন জাপা চেয়ারম্যান।  
 
দলের একটি সূত্র জানায়, মহাজোট থেকে বের হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন মহাঐক্যের সঙ্গে যোগ দেয়ার চিন্তা করছে জাতীয় পার্টি। এমতের পক্ষে থাকা কাজী জাফর ও রুহুল আমিন হাওলাদাররা মনে করছেন বিএনপির সঙ্গে জোট বাধলে জাতীয় পার্টি মহাজোটের তুলনায় বেশি আসন পাবে । পাশাপাশি এরশাদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভবনাও রয়েছে।
 
তবে মহাজোট ছাড়ার ব্যাপারে দলীয়ভাবে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।  দলের চেয়ারম্যান এর সঙ্গে একমত। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন আমরা তাই মেনে নেব।’
 
এদিকে জাতীয় পার্টি একক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতেও অনেকে জাপাকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় গিয়েছে। ভবিষ্যতেও যেতে চাইছে। কিন্তু জাতীয় পার্টি আর কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হবে না। ৩০০ আসনে জাতীয় পার্টি নিজস্ব প্রার্থী দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
 
মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা শিগগির আসছে কি না জানতে চাইলে জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, ‘জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক শক্তি আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই ভবিষ্যতে কারো ওপর নির্ভরশীলতা নয় বরং আমাদের ওপর অন্যদের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাক এটা আমরা চাই।’

শেয়ার করুন