এইসব পাগলামি কি গরমের কারণে?

0
116
Print Friendly, PDF & Email

খুব আতঙ্কিত হবার মতো কিছু আচরণ চলছে আমাদের সংসদে। সবাই অংশ নিচ্ছেন সেইসব আচরণের প্রতিক্রিয়ায়। এগুলো কি আসলেই ঘটছে না কি সবই গরমের কারণে আমার বিভ্রম?

পর্ব-১
১। বিএনপি দলীয় সাংসদ রানু আক্তার বললেন সংসদে, ‘চুদুর বুদুর চইলত ন’। শব্দটি অশ্লীলও নয়, অপ্রচলিতও নয়। হয়তো আমাদের কানে বা প্রমিত ভাষায় অভ্যস্ত শব্দ নয়। কিন্তু খুব হৈ চৈ হলো। সাংসদ রানুকে এক হাত নেয়া হলো আমাদের সামাজিক মিডিয়ায় । এ পর্যন্ত আমার কোন আপত্তি নেই, আলোচনা চলতেই পারে। কিন্তু তাকে যে ভাষায় আক্রমণ করা হলো, তা অত্যন্ত দুঃখজনকই নয় শুধু আতঙ্কজনক। তাকে বস্তির মেয়ে, খারাপ পাড়ার মেয়ে বানিয়ে দেয়া হলো।

২। ফের বিএনপি সাংসদ শাম্মী আক্তার কবি হেলাল হাফিজের একটি কবিতার দুটি লাইন আবৃত্তি করলেন, যেখানে বললেন, ‘আমিও গ্রামের পোলা, চুতমারানি গাইল দিতে জানি।‘ ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কবি হেলাল হাফিজের কবিতাকেই দোষ দেবার কোন ইচ্ছা আমার নেই। এখানে মুশকিল হলো, কবিতা নির্বাচন ও আবৃত্তির স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা মাননীয় সাংসদের ছিলো না। উদ্দেশ্যও মহৎ নয়। হৈ, হৈ, রৈ রৈ হবে- সেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে আক্রমণ করা হলো যে ভাষায় আমাদের সামাজিক মিডিয়ায়, তাও কিছু কম যায় না। ‘বেশ্যালয়ের শব্দ’, ‘নিষিদ্ধ পল্লীর শব্দ’, ‘বেশ্যা, ‘খানকি’, মাগী… এগুলো তবু উচ্চারণযোগ্য। অন্য যেসব ইচ্ছে প্রকাশ পেয়েছে নানা জনের স্ট্যাটাসে, ছবিতে, তারা কীভাবে সাংসদ শাম্মী আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারেন নিজেরাই এইসব শব্দ, বাক্য, ছবি এবং ইচ্ছে প্রকাশের পরেও, আমি বুঝতে পারি না। অতি উৎসাহী কেউ কেউ ফের শাম্মী আক্তারকে জব্দ করার জন্য হেলাল হাফিজের-ই অন্য একটি কবিতার কিছু লাইন বা গোটা কবিতা তুলে দিলেন। আমরা কি একটি ধর্ষকামী জাতিতে পরিণত হতে চলেছি?

৩। তবে, সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে আজ আওয়ামী নারী সাংসদ অপু উকিলের বক্তব্য। তিনি জানালেন, ভরা সংসদে, ‘খালেদা জিয়া এক ইহুদী চা মালিকের ঔরসজাত’। কেনো? এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য কী? দেশের বড় বড় সব সমস্যা নিয়ে, সিটি নির্বাচনে এমন হারের পরে যখন আওয়ামী লীগের ত্রাহি মধুসূদন হবার কথা, সবচেয়ে বেশি সংযত হবার কথা, কেনো তারা বাজেট অধিবেশনের মত মূল্যবান অধিবেশনে এসব আলোচনা করছেন? বড় বড় সমস্যা থেকে মনোযোগ এসব কদর্যতায় সরিয়ে রাখবার জন্যই কি?

আমার খারাপ লাগা নানা প্রস্থে। এসব আলোচনা করছেন মূলত নারী সাংসদরা, দুই দলেরই। তারা কি ব্যবহৃত হচ্ছেন? এইসব পদ কি তবে দলের হয়ে অন্য দলের সাথে নোংরা ভাষায় কাইজ্জা করার জন্য শুধু? সে কাইজ্জাও কোন না কোন নারীর সম্মান ধরে টান। অন্যদিকে, তাদের বক্তব্যের বিপরীতে যে প্রতিক্রিয়ার স্রোত, সে তো নারীর তথাকথিত সতীত্ব ধরেই টান শুধু। সব অর্থেই সম্মানহানি করা হচ্ছে নারীর। কখনো পুরুষতন্ত্রের অন্তর্গত নারীকে দিয়ে নারীর প্রতি সম্মানহানিকর শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, ফের পুরুষতন্ত্রের নারী-পুরুষ প্রবল প্রতাপে ঝাপিয়ে পড়ছে সেইসব নারীদের প্রতি যে শব্দ-সম্ভার আর ইচ্ছের ডালি উজাড় করে সে বড় বেশি নারী-বিদ্বেষী। নারীকে অপমান করে না যেসব শব্দ, গালি হিসেবে সেসব শব্দ জুতসই হয় না বোধহয়। নারীকে অপদস্থকারী শব্দ-সম্ভার দেখা যাচ্ছে কবিরও বড় পেয়ারা। হায়!

আমার কাছে এই সব কিছুকে অ্যাবসার্ড নাটক বলে মনে হচ্ছে। না কি গরমে কারো মাথার ঠিক নেই? সবাই প্রলাপ বকছে? এমন নিরীহ কিছু হলে কতোই না ভালো হত! সবচেয়ে ভালো হতো যদি কেউ এসে আমায় বলতো, ওহে, তুমি ভুল শুনেছো। গরমে তোমার মাথার ঠিক নেই। কেউ কি আমাকে নিশ্চিত করবেন, আমি কি ভুল শুনছি? আমি কি স্রেফ গরমের কারণেই এসব শুনছি?
পরম শ্রদ্ধেয় সাংসদগণ আর আমার চোখে আইকন ব্লগার, বন্ধু বা লেখকদের যেসব ভাষার আর মনোভাবের প্রকাশ আমি পড়ছি, এ নিশ্চয় আমারি মনোবিকলন।

গরম, গরম, গরমের কারণেই সব ?।

পর্ব-২
তুতুন, আমার মণিদার পাঁচ বছুরে ছেলে। যেমন দুষ্টু, তেমনি না খাওয়া বাতিক। হাঁড়্গুলো গোনা যায়। সেও লেখক হতে চায়। মাথায় তার আইডিয়ার অন্ত নেই। দিদি কাল গোপাল্গঞ্জে গিয়েছিলো। ভাঙ্গা থেকে অনেক বড় বড় রসগোল্লা নিয়ে এসেছে। তাই তাদের ডাক পড়েছিলো বাসায়। সবাইকে অবাক করে তুতুন ওই বিরাট রসগোল্লা তো বটেই, মাংস-পোলাও খেয়ে নিলো বেশ তমিজের সাথে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি রে, তোর এতো পরিবর্তন? সবকিছু ভদ্র ছেলের মত খাচ্ছিস যে আজ?’ ঝকঝকে হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে বললো, ‘খুব গরম তো তাই।’

ইশানা, তুতুনের ছয় বছুরে দিদি। সে খুব সিরিয়াস। পড়াশুনায় খুব মন। গ্রীন হেরাল্ডের ছাত্রী। ভালো ছবি আঁকে। খাওয়া নিয়ে তার কোন বায়না নেই, বরং খেতে সে মোটামুটি পছন্দই করে। মণিদা প্রায় দিন-ই তাকে খ্যাপায়, ‘আমার মা’র প্রিয় কথা হলো, খাবো’। আর সে লজ্জা পেয়ে যায়, বাবাকে ভ্রু-কুঁচকে শাসায়। সে রসগোল্লার অর্ধেক খেয়ে প্লেট সরিয়ে রেখে বললো, ‘আরে, এত মিষ্টি কি খাওয়া যায় না কি?’ পোলাও তার প্রিয়। খানিক নাড়াচাড়া করে রেখে দিলো। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হলো মা, খাও না কেনো?’। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, ‘এতো গরমে খাওয়া যায় না কি? উহ, এতো গরম!’
মধুর তোমার শেষ যে না পাই…

পর্ব-৩
বিএনপি দলীয় সাংসদ রেহানা আক্তার রানুকে শিক্ষার্থী জীবন থেকে চিনি। তিনি তীব্র-ভাষী। রাজনৈতিক নেতাদের তীব্রভাষা ন্যায়ের পক্ষে গর্জে উঠবে, সেটাই আকাংক্ষা। কৈশোর-তারুণ্যে সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়ার বিতর্ক শুনেছি। খর-তীব্র বিতর্ক। আমি যখন শামসুন নাহার হলের হয়ে বিতর্ক করতাম বিটিভি-তে, তখন মনের খুব গভীরে একটা আকাঙ্ক্ষা থাকতো, যেনো এই অগ্রজ তার্কিকের মুখোমুখি না হতে হয়। স্রেফ ভয় থেকে এই আকাংক্ষা। আর নিলুফার সুলতানা মণি। তিনি তীব্র ছিলেন না, বরং খানিকটা জড়তা ছিলো তার আচরণে। মণি আপা (ছাত্রদল)-ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পি (ছাত্রলীগ) আর আমি(ছাত্র ইউনিয়ন) একসাথে শামসুন নাহার হল সংসদে সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলাম ১৯৯০ সালে। এঁরা আমার চেনাজানা মানুষ কোন না কোনভাবে। সবার সাথেই আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ দূরত্ত্বের আবার নৈকট্যের একটা সম্পর্ক ছিলো।

সুখবর যে তাঁরা সবাই এখন সংসদে। তাঁরাই একটার পরে একটা কান্ড ঘটিয়ে চলেছেন সংসদে। কখনো বা টেলিভিশনে। কখনো কৌতুহল নিয়ে, কখনো বা আতঙ্কিত হয়ে তাদের বক্তব্য শুনি।

এবারের বাজেট বক্তৃতায় তাঁরা বেশ মরীয়া হয়ে উঠেছেন। লাগাতারভাবে তাঁরা বলেই চলেছেন। আজ পত্রিকায় দেখলাম, সাংসদ রেহানা আক্তার রানুর বক্তব্যের সময় তার মাইক সাতবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কদর্য বক্তব্যের জন্য। এবার বাজেট বক্তৃতায় তিনি কয়েকদিন আগেই একটি শব্দ ব্যবহার করে আলোচনার শীর্ষে চলে আসেন। তোলপাড় হয় দেশ ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পর্যন্ত। তারপর বিএনপি’র নারী কোটার সাংসদরা এতটাই বেপরোয়া আচরণ করেন যে দলপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া স্বয়ং সিঙ্গাপুর থেকে তিন সাংসদ রেহানা আক্তার রানু, সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়া এবং শাম্মী আক্তারকে সতর্ক করে দিয়েছেন সংসদে সংযত ভাষায় কথা বলার জন্য। আমি এই সতর্ক-বার্তাকে বেশ ইতিবাচকভাবে নিয়েছিলাম। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! দুইদিন পরেই ফের বিস্ফোরণ সংসদে।

প্রথমে রেহানা আক্তার রানু, তারপর আশরাফী পাপিয়া, তারপর শাম্মী আক্তার, তারপর অপু উকিল এবং সবশেষে আজ আবার রেহানা আক্তার রানুর বক্তব্য শুনে খুব বিমর্ষ বোধ করছি। অনেকেই হয়ত বলবেন কোন কোন পুরুষ সাংসদের কথা, যারা অশ্লীল কথা বলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা মনে করা যেতে পারে জয়নাল হাজারীর কথা। তাঁদেরকেও নিন্দাই করা হয়েছে। কিন্তু নারী সাংসদদের ক্রমাগত এইসব এবং শুধুই এইসব বক্তব্যে মনটা খুব ছোট হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা সবাই শিক্ষিত, তরুণ, নানা গুণ রয়েছে তাঁদের। কী ভীষণ অপচয় তাঁদের যোগ্যতার!

ভাবছি, কেনো এই মরীয়া বক্তব্য? দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান কোন তলানিতে ঠেকেছে, বোঝাই যায়। তবে নারী কোটায় নির্বাচিত সাংসদদের এই মরীয়া বক্তব্যের একটি কারণ হয়তো এই যে, তাঁদের কোন নির্বাচনী এলাকা থাকে না, এলাকার কোন কাজ করতে হয় না। তবুও নিজের উপযোগিতা, দৃশ্যমানতাকে ধরে রাখতে হয় দলের সামনে। কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচন। অস্তিত্বের জানান এখন না দিতে পারলে তো ঢের দেরি হয়ে যাবে! হয়তো এটি একটি কারণ।

এদেশের নারী-নেতারা দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের সংসদে আসার ব্যাপারে আন্দোলন করে আসছেন। কাজ হয়নি। প্রয়োজনে এমন বিধান করা হোক যেনো দলে নারীদের অনেক বেশি সংখ্যায় মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু তাঁদের জিতে আসতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, তাদের নির্বাচনী এলাকা থাকবে, দায়িত্ব থাকবে সংসদে সেসব নিয়ে কথা বলার। বাজেট বক্তৃতায় এলাকার উন্নয়ন বাজেট নিয়ে তাঁরা কথা বলবেন। দায়িত্ব ছাড়া দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না।

নয়তো এইসব দারুণ গরম সময়ে, গরম বাজেট বক্তৃতায়, পরবর্তী নির্বাচনের টিকেট পাবার আশায় এইসব অবমাননাকর বক্তৃতার জোয়ার ঠেকানো যাবে না।

এখন আষাঢ় মাস।
বৃষ্টি নামুক। ঘোর বৃষ্টি। রুক্ষতা মুছে যাক।
শেষতক প্রকৃতির কাছেই সমর্পণ, ‘জল দাও।’

— ফেসবুক থেকে

শেয়ার করুন