কারাগারে বসেই ‘ইয়াবাকন্যা’ রিক্রুট করে ম্যানিলা

0
79
Print Friendly, PDF & Email

হত্যা মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে গিয়েছিল লিপি। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল ‘ইয়াবাকন্যা’ ম্যানিলা চৌধুরীকে। তার কথামতো ‘লাভজনক’ ইয়াবা ব্যবসা করবে বলে মনস্থির করে। পরে জেল থেকে বেরিয়ে শুরু করে ইয়াবা ট্যাবলেটের খুচরা ব্যবসা। একই ভাবে বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে কারাবন্দি ছিল দিলরুজা, ফরিদা ও কুলসুম। ম্যানিলার নির্দেশিত কৌশলে তারাও নেমে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ব্যবসার শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। গতকাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ম্যানিলা চৌধুরী এসব তথ্য জানিয়েছে। সে জানায়, বছরখানেক আগে রাজধানীর শ্যামলী থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। তারপর জেলে যায়। সেখানে গিয়ে পরিচয় হয় অন্তত ডজন খানেক নারী অপরাধীর সঙ্গে। দীর্ঘদিন কাছাকাছি থাকার সুবাদে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই একপর্যায়ে লাভজনক ইয়াবা ব্যবসার প্রস্তাব দিলে তারা লুফে নেয়। ম্যানিলার সহযোগী আবু তাহের (৪২)। গেঞ্জি ও চাল ব্যবসার আড়ালে ইয়াবার পাইকারি বিক্রেতা। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, শাকু’র বাড়ির কাছেই ফিরিঙ্গী বাজারে তার চালের আড়ত আছে। তার কাছ থেকেই ম্যানিলা পাইকারি চালান নিতো ইয়াবার। যদিও শাকু’র মাধ্যমে বেশির ভাগ চালান ঢাকায় পাঠাতো। তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাহেরের কাছ থেকেই নিতো।
রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার অসংখ্য ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছে। এদের মধ্যে গাজীপুরের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতো গৃহবধূ কুলসুম। সে গাজীপুরে একটি মুরগির ফার্মে কাজ করে। গোপনে ইয়াবা ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে দেশে মাদকাসক্তের শতকরা ২৫ ভাগ এখন ইয়াবা ট্যাবলেটে আসক্ত পরিবহন ও সেবন সহজ হওয়ায় দ্রুত এর থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ ও মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীরা এ ব্যবসার এখন প্রধান টার্গেট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১২,৩০৪ জন মাদকাসক্ত চিকিৎসাধীন। এদের বেশির ভাগই ইয়াবার নেশায় আসক্ত। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের এডিসি মশিউর রহমান বলেন, ইয়াবা ট্যাবলেটের পরিবহন ও সেবন সহজ হওয়ায় সহজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়ানো যায়। একারণে এই নেশার চোরাচালান বাড়ছে। পাশাপাশি ইয়াবা আসক্তদের সংখ্যা বাড়ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পরিচালক মজিবুর রহমান জানান, বর্তমানে মাদকাসক্তের শতকরা ২৫ ভাগই ইয়াবা আসক্ত। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট আটক করেছে। এর বাইরে র‌্যাব, পুলিশ এবং সীমান্ত এলাকায় বিজিবি মাঝে-মধ্যেই বড় বড় ইয়াবার চালান আটক করেছে। গত শুক্রবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার এবং চোরাচালান ও অবৈধ ব্যবসা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ম্যানিলা চৌধুরীসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দারা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ইয়াবা ব্যবসায়ীরা মূলত ঢাকায় ইয়াবা বিক্রি চক্রের সদস্য। কিন্তু যারা চোরাচালানের মাধ্যমে ইয়াবা ঢাকায় নিয়ে আসে, তাদের এখনও আটক করা যায়নি। অন্যান্য মাদক ছেড়ে তরুণেরা এখন ইয়াবার দিকেই ঝুঁকছে। ইয়াবা মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার এবং টেকনাফ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। এসব পরিবহনের জন্য নারী ছাড়াও নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, তাদের গ্রেপ্তার করেও কোন কাজ হয় না। কারাগারে গিয়ে উল্টো ফল হয়। গোয়েন্দাদের হাতে আটক মাদক ব্যবসায়ী ম্যানিলা চৌধুরীকে দু’বছর আগে তারা ঢাকা থেকেই ১৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করেছিলেন। আটকের পর তার ছয় মাসের জেল হয়। জেল থেকে বেরিয়ে সে আবার ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। ঢাকা মহানগর পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে অন্তত ইয়াবা ব্যবসার ২০টি সিন্ডিকেট সক্রিয়। এদের সঙ্গে নানা পেশা ও শ্রেণীর লোক জড়িত। এমনকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের জড়িত থাকার তথ্যও রয়েছে তাদের কাছে। তিনি জানান, যারা এই ব্যবসা করে তারাও ইয়াবায় আসক্ত। ক্রেতা হিসেবে তাদের টার্গেট উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা। গোয়েন্দারা জানান, ইয়াবা বিভিন্ন রঙ ও ফ্লেভারে পাওয়া যায়। এর বিক্রি ও সেবন দু’টোই সহজ। পাইকারি এক পিস ইয়াবার দাম ১২০ টাকা হলেও, খুচরা বাজারে ২৪০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ইয়াবা ট্যাবলেটের উপকরণে উত্তেজক এমসিটামিন ও ক্যাফেইন আছে। এই উপকরণের প্রভাবে ইয়াবাসেবীরা মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। এর বাইরে যৌনক্ষমতা হ্রাস, মস্তিষ্ক ও কিডনির ক্ষতি এবং স্বাভাবিক কাজকর্মের ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গোয়েন্দারা জানান, গ্রেপ্তারকৃত ম্যানিলা চৌধুরী, তাহের, কুলসুম, জানে আলম, খালেদ ও আসিফকে তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দেয়া তথ্য অনুয়ায়ী বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ম্যানিলা আরও জানায়, তার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। তারা ৩ ভাইবোন। ভাল ফল করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ভর্তি হয় তিতুমীর কলেজে। তার পিতার এনজিও’র চাকরির সুবাদে পরিচয় হয় কুখ্যাত ডাকাত শাকু’র সঙ্গে। তার হাত ধরেই ইয়াবা ব্যবসায় নামে সে। তার দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রাম থেকে আসা ইয়াবাগুলো গ্রহণ করা। এ জন্য প্রতি পিস ইয়াবায় এক টাকা করে পেতো। প্রতি মাসে অন্তত ১৫ হাজার পিস করে কমপক্ষে ১০টি চালান আসতো। ইয়াবা গ্রহণ ও সরবরাহ করা বাবদ তার আয় ছিল প্রতিমাসে ন্যূনতম দেড় লাখ টাকা। তদন্ত সূত্র জানায়, ইয়াবা ট্যাবলেট ব্যবসার গডফাদার শাকু। তার সঙ্গে ম্যানিলার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার আগে শাকু ২০০৭ সালে রাজধানীর শুক্রাবাদে ব্র্যাক ব্যাংক ডাকাতি করে। ডাকাতির ২ কোটি টাকা ইয়াবা ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্থল সীমান্ত পয়েন্ট, পোস্ট অফিস ও কুরিয়ার সার্ভিসকে মাদক আনা-নেয়া ও পাচারের জন্য ব্যবহার করছে। জব্দ করা হেরোইনগুলো বিশ্বখ্যাত কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি ডিএইচএল-এর মাধ্যমে চীনে পাঠানোর জন্য চেষ্টা চলছিল। দেশের প্রতিটি প্রবেশপথে চেকিং ব্যবস্থা জোরদার ও কড়া নিরাপত্তা গড়ে তোলা সম্ভব হলে মাদক পাচার কমানো সম্ভব। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, সারাদেশে সংঘটিত শতকরা প্রায় ৮০টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোন না কোনভাবে মাদকদ্রব্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে। খুনের ক্ষেত্রে মাদক বড় ধরনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। খুন, রাহাজানি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বেশির ভাগ অপরাধের সঙ্গে মাদক সরাসরি জড়িত। দেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তাদের শতকরা ২৫ ভাগই ইয়াবায় আসক্ত। বাংলাদেশে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমপক্ষে এক কোটি। তবে দেশে প্রকৃত মাদকসেবীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে।

শেয়ার করুন