সংসদ ভবনের নকশায় আবার আঘাত!

0
93
Print Friendly, PDF & Email

জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশায় আবারও আঘাত করল সরকার। আবার সরকারই একে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থায় (ইউনেসকো) আবেদন করতে যাচ্ছে।
বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই ইসাডোর কানের নকশা নষ্ট করে সংসদ ভবনের উত্তর ফটকে সংসদ টেলিভিশন কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। এর জন্য ভবনের উত্তর ফটকের প্রবেশদ্বারটি কার্যত বন্ধ করে দিতে হবে। এর আগে ভবনের ভেতরে কাচ ও কাঠের বিভাজন দিয়ে ‘অসংখ্য’ কক্ষ তৈরি করা হয়। নকশা অমান্য করে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি বানানো হয়।
২ জুন সংসদ সচিবালয়ের কমিশনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতীয় সংসদ ভবন বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শন। এর স্থাপত্যমান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। লুই কানের মূল নকশার বাইরে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সংসদ সচিবালয়ের নির্দেশে গণপূর্ত বিভাগ ভবনের উত্তর ফটকে টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ করছিল। ওই বৈঠকে সংসদ ভবনে নকশাবহির্ভূত কোনো কাজ হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সংসদের মূল ভবনের প্রবেশপথের শেষ অংশে ষড়ভুজ বা ছয় কোনাকৃতির একটি প্রশস্ত জায়গা আছে। এর উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে ইটের দেয়াল তুলে একটি কক্ষ বানানো হয়েছে। আসা-যাওয়ার জন্য দুই দিকেই ছোট দুটি দরজা করা হয়েছে। নতুন তৈরি বিশাল কক্ষটির পশ্চিম পাশে মূল নকশা অনুযায়ী একটি বড় কক্ষ ছিল। সেটিকেও ইটের দেয়াল তুলে খুপরি আকৃতির চারটি কক্ষ এবং একটি বাথরুম করা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগ ও সংসদ ভবনের স্থাপত্য সৌন্দর্য বিশ্লেষক স্থপতি মীর মোবাশ্বের আলী বলেন, লুই কান প্রকৃতির সঙ্গে তালমিল রেখে ভবনটি নকশা করেছেন। ভবনের ছাদে কাচের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। বাতাস ও সূর্যের আলো যাতে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য প্রতি ব্লকের চার ভাগের এক ভাগ খালি বা ভয়েড হিসেবে রাখা হয়েছে, যাতে বৈদ্যুতিক আলো ছাড়াই দিনের বেলায় কাজ করা যায়।
কিন্তু বর্তমানে সংসদ ভবনে বৈদ্যুতিক আলো ছাড়া কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ, আলো ও বাতাস ঢোকার বেশির ভাগ পথ সংসদ সচিবালয় বন্ধ করে দিয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে। গণপূর্ত বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, লুই কানের নকশায় ভবনের কক্ষের সংখ্যা থাকার কথা চার শ। কিন্তু এখন আছে পাঁচ শরও বেশি। সংসদ সচিবালয় বড় কক্ষগুলোতে কাঠের বিভাজন দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করেছে। এই ভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলেও নকশাবহির্ভূত এসব কক্ষের জানালার পাশে আলাদা শীতাতপ যন্ত্র লাগানো হয়েছে। এটা করতে গিয়ে অনেকগুলো জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পশ্চিম ব্লকে সচিবের কক্ষের সামনের উন্মুক্ত জায়গা কাচ দিয়ে ঘিরে নতুন একটি কক্ষ বানানো হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে আলোকিত এই জায়গাটি এখন প্রায় অন্ধকার।
জানতে চাইলে মীর মোবাশ্বের আলী বলেন, সংসদ ভবনের ওপর থেকে আলো ঝরনার মতো ভেতরে পড়ার কথা। কানের দর্শন ছিল প্রকৃতির আলো ও বড় পরিসর মানুষকে বড় করে ভাবতে শেখায়। তাই তিনি সংসদের মর্যাদা ও আবহের কথা ভেবে বড় বড় কক্ষ করেছিলেন। এখন সেগুলোকে টুকরা টুকরা করে ছোট করার মাধ্যমে সংসদ ও তার স্থাপত্যকে অমর্যাদা করা হচ্ছে।
মীর মোবাশ্বের আলী আরও বলেন, নকশা অনুযায়ী, গরমের সময় দক্ষিণ দিক দিয়ে ভবনে যে বাতাস ঢুকবে, তা উত্তরের ফটক দিয়ে বের হবে এবং শীতের সময় উত্তরের ফটক দিয়ে বাতাস ঢুকে তা দক্ষিণ দিক দিয়ে বের হবে। এতে সারাক্ষণ ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক বাতাসের প্রবাহ থাকবে। এখন উত্তরের ফটক বন্ধ করে দিলে ভবনের ভেতরের সার্বিক বায়ু চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। বাতাস বের হওয়ার সুযোগ কম থাকলে বাতাস ঢোকার সুযোগও কমে যায়।
সংসদ সচিবালয়ে গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ভবনে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তাতে মূল নকশার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। কংক্রিটের করা স্থায়ী দেয়ালকে এই প্রকৌশলী অস্থায়ী দেয়াল আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে এটা আবার ভেঙে ফেলা হবে।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় সংসদের মূল ভবনের নকশায় কোনো ধরনের পরিবর্তনমূলক কাজ করতে গেলে তা স্থাপত্য অধিদপ্তরকে জানানোর কথা। কিন্তু ভবনের উত্তরের ফটক বন্ধ করে দিয়ে সেখানে স্থাপনা করার ব্যাপারে সংসদ সচিবালয় তাদের কিছু জানায়নি।
জানতে চাইলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংসদের কমিশন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংসদ ভবনে নকশাবহির্ভূত কোনো কাজ হয়েছে কি না, তা চলতি অধিবেশন শেষে স্পিকারের নেতৃত্বে পর্যালোচনা করা হবে। নকশাবহির্ভূত কিছু হয়ে থাকলে সেটা ভেঙে ফেলা হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শিরিন আখতার জানিয়েছেন, সংসদ ভবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিতে তাঁরা বাংলাদেশ ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ইউনেসকোর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। পরামর্শ অনুযায়ী, প্রামাণিক দলিলপত্র সংগ্রহের পাশাপাশি সংসদ ভবনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে হবে। এখন সেই প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে প্যারিসের বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রে (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার) প্রস্তাব পাঠানো হবে।
আগেও আঘাত হয়েছিল লুই কানের নকশায়: সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংসদ এলাকার চারপাশে ১০ ফুট উঁচু দেয়াল এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দুটি ফুটওভারব্রিজ করার পরিকল্পনা হয়েছিল। পরে পরিবেশবাদী ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের আপত্তির মুখে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।
বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে মূল নকশাবহির্ভূতভাবে সংসদ এলাকায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের জন্য বাড়ি তৈরি করা হয়। ২০০২ সালে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু হলে পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদ জানান। হাইকোর্টে রিট হয় এবং স্থাপনা নির্মাণের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। তখনকার সরকার আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৮ আগস্ট আপিল বিভাগ তিন মাসের জন্য হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করলে গণপূর্ত বিভাগ নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় লুই কানের নকশাবহির্ভূত যেকোনো ধরনের স্থাপনাকে বেআইনি ঘোষণা করে রায় দেন। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি সংসদ ভবনকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণার নির্দেশ দেন।
ওই বছরই এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করে এবং আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। এরপর আরও কয়েক দফায় স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
মামলা চলাকালীন ২০০৫ সালের মধ্যেই গণপূর্ত বিভাগ স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি নির্মাণের কাজ শেষ করে। নির্মাণকাজ শেষ হলেও তখনকার স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ও ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী ওই ভবনে ওঠেননি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাড়ি দুটিকে সাব-জেলে রূপান্তর করা হয় এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে আটক করে ওই বাড়ি দুটিতে রাখা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরুতে বাড়ি দুটি পরিত্যক্ত থাকলে ২০১১ সালে স্পিকার আবদুল হামিদ (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) ও ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী সেখানে ওঠেন।

শেয়ার করুন