মুমিন বান্দাকে ডাকছে সিয়াম

0
113
Print Friendly, PDF & Email

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী : মাবুদ বড় মেহেরবান, তিনি বান্দাদের জন্য এমন কিছু মুহূর্ত ও সুবর্ণ সুযোগ নির্ধারণ করে রেখেছেন, যখন স্বল্প সময়ে অফুরন্ত সওয়াব ও কল্যাণ হাসিল করা যায়। এগুলোর মধ্যে শবেবরাত তথা পুরো শাবান মাসটি একটি বিশেষ তাৎপর্যময় স্থান দখল করে আছে। শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে আমাদের ধর্ম ও ঐতিহ্যের ভাষায় বলা হয়, পবিত্র লাইলাতুল বারআত বা শবেবরাত। আর এর পক্ষকাল পরই রহমত, রবকত ও নাজাতের মাস মাহে রমজানুল মোবারক। উল্লেখ্য, রজব এবং রমজান মাসের মধ্যবর্তী মাসটির নাম শাবান। শাবান অর্থ শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হওয়া। যেহেতু এ মাসে রোজাদারদের সওয়াব গাছপালার শাখা-প্রশাখার মতো বাড়তে থাকে, তাই মাসটিকে শাবান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসের সুসংবাদদাতা এবং পরবর্তী নিকটতম মাস হিসেবে এ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত অনেক। এ মাস আমল করে কাটাতে পারলে রমজান মাসও আমল করেই অতিবাহিত হবে বলে আশা করা যায়। পবিত্র বরকতময় রজনী শবেবরাতের ফজিলত ও গুরুত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে হাদিসে নববীর অসংখ্য স্থানে। আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তো বলেই ফেলেছেন, শাবান আমার মাস আর রমজান আল্লাহর মাস। রাসূল (সা.) এ মাসে প্রায়ই রোজা রাখতেন। হজরত আনাস বিন মালিক (র.) সে যুগের মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে বলেন, যখন শাবান মাসের আগমন হতো, তখন মুসলমানরা বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করত এবং বিত্তশালীরা তাদের মালামালের জাকাত-সাদকা বিতরণ করতে থাকত ফকির-মিসকিনদের কাছে, যাতে অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলো একটু স্বস্তি ও শক্তি সঞ্চয় করে ভালোভাবে পালন করতে পারে রমজানের রোজাগুলো। শাবান মাস আল্লাহর রহমত ও রেজামন্দি হাসিলের এক সোনালি সুযোগ নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত। এ মাসে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি দরকার তা দেহমন উজাড় করা, প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে প্রভুর ইবাদত-বন্দেগিতে ডুবে থাকা। এ মাসে কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল পাঠ, রোজা ও নফল নামাজ আদায় করা আর যথাসাধ্য দান-খয়রাত করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ, মধ্য শাবানের পর রমজান মাসের আগমনের আর বেশি সময় থাকে না। মাত্র ১৪-১৫ দিন। এ সময় ইবাদত ও তিলাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে। চাকরি-বাকরিতে সততা, ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল পথ অনুসরণ করতে হবে। সহায়তা করতে হবে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার কাজে। মস্জিদ-মক্তবগুলো আবাদ করতে হবে রোজাদার মুসল্লিদের সুবিধার্থে। তাহলেই কেবল পুণ্যময় মাসগুলোর (রজব, শাবান ও রমজানের) আগমন আমাদের জীবনে সফলতা বয়ে আনবে। আমরা যারা কোরআন পড়তে জানি তারা রমজান মাসে কমপক্ষে দশজনকে কোরআন পড়া শিখাতে পারি। সমাজের বিত্তবান লোকদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে নানা পেশার শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোরআন শিক্ষা কোর্স চালু করতে পারি। এ ক্ষেত্রে শ্রমজীবী এ জনগোষ্ঠীকে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা সময় কোরআন শিখতে আসার কারণে মাস শেষে কিছু সম্মানীর ব্যবস্থা করা হলে অশেষ সওয়াব হাসিল হবে। বাসা-বাড়িতে মহিলাদের মধ্যে যারা কোরআন পড়তে পারেন তারা তাদের বাড়ির কিছু বোনদের কোরআন পড়তে শেখানোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু রমজান মাসে অফিসের সময়সূচি এগিয়ে নেয়া হয়, সেহেতু আমরা যারা কোরআন পড়তে পারি তারা অফিস শুরুর আগে বা অফিস সময় শেষ হওয়ার পরে আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে যারা কোরআন পড়তে পারে না তাদের প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কোরআন পড়া শেখানোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারি। আমরা যারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী তারাও ক্লাস শেষ হওয়ার পর সম্মিলিতভাবে একজন শিক্ষকের মাধ্যমে প্রতিদিন নিজ প্রতিষ্ঠানে ১ ঘণ্টা করে কোরআন শিখতে পারি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা নিতে হবে। যারা বয়স্ক তাদের জন্য প্রতিটি মসজিদে সম্মানিত ইমাম সাহেবরা কোরআন শিক্ষা কোর্স চালু করতে পারেন। বিভিন্ন বাসায় যারা বুয়ার কাজ করে গৃহকর্তা তাদের নিজ খরচে দৈনিক ২ ঘণ্টা করে কোরআন শেখানোর ব্যবস্থা করা পারেন। বাংলাদেশে যতগুলো কওমী মাদ্রাসা ও আলীয়া মাদ্রাসা আছে সব মাদ্রাসার ছাত্ররা শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিজ এলাকায় একজনকে কোরআন শিখানোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারি। যখনই আল্লাহর বান্দারা কোরআন পড়তে পারবে তখনই কোরআন জানার ও মানার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। তখন কোরআন নাজিলের এ মাসে আমাদের সবকিছু হয়ে যাবে কোরআন কেন্দি ক।
লেখক : খতিব, হাতিরপুল বায়তুল মোমিন জামে মসজিদ, ঢাকা।

শেয়ার করুন