মহাজোট ছাড়তে এরশাদের ওপর দলীয় চাপ বেড়েছে

0
129
Print Friendly, PDF & Email

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ছাড়ার ব্যাপারে এত দিন এইচ এম এরশাদের ওপর তাঁর দল জাতীয় পার্টির (জাপা) ভেতর থেকে যে চাপ ছিল, সম্প্রতি চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর তা আরও বেড়েছে। এমনকি জাপার সভাপতি-মণ্ডলীর সদস্যদের বড় একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে আগামী নির্বাচনে সমঝোতার ব্যাপারে তৎপর হয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
এরশাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, চার সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরাজয় এবং খুলনায় মেয়র পদে জাপার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর তাঁর মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনের পরদিন এরশাদ সিঙ্গাপুর থেকে ফোনে এক ঘনিষ্ঠজনের কাছে মন্তব্য করেন, এ ফলাফল প্রত্যাশিত ছিল। এ কারণে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে জাপার সমর্থিত প্রার্থী মাহমুদুল হাসান নির্বাচন না করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে এরশাদ আপত্তি করেননি। আর জাপার প্রার্থী সরে দাঁড়ানোতে গাজীপুরে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থীর জন্য সুবিধা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকারের মেয়াদের শেষ সময়কার নির্বাচনগুলোতে মাঠপর্যায়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে জাপাকে অবহেলার বিষয়ে আওয়ামী লীগকে একটি বার্তা দেওয়ার কৌশলও রয়েছে দলটির। এ কারণে চার সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে গাঁটছড়া ছিল না জাপার। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
জাপার সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য কাজী জাফর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আলাদা নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে এরশাদ অনেক আগেই মহাজোট ত্যাগ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। চার সিটি নির্বাচনের ফলাফলের পর নিশ্চয়ই এখন তিনি এ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবছেন।
তবে দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এরশাদের ওপর প্রভাব রাখেন, জাপার এমন একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, রাজনীতিতে বড় ধরনের কিছু না ঘটলে আগামী অক্টোবর মাসের আগ পর্যন্ত জাপার মহাজোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত আসছে না।
জানতে চাইলে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, জাপার মহাজোট ছাড়ার আপাতত কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
জাপার একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, ৫ মে রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে হেফাজতে ইসলাম ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর সরকারের দিক থেকে বেশ চাপে পড়েন এরশাদ। একই সঙ্গে এরশাদের বিরুদ্ধে চলমান মেজর জেনারেল মনজুর হত্যা মামলা নিয়েও নড়াচড়া শুরু হয়। এর পর থেকে সরকারবিরোধী কথা বলা থামিয়ে দেন তিনি। ঢাকায় হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিতে ‘বাড়াবাড়ি পর্যায়ের’ ভূমিকা রাখার অভিযোগে দলের তিন নেতার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখানোরও চেষ্টা করেন এরশাদ। সরকারের উচ্চপর্যায়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন, হেফাজতের বড় ভোটব্যাংক আছে। এটি যাতে একতরফা বিএনপির দিকে না যায়, সে জন্য তিনি হেফাজতকে সমর্থন দিয়েছেন। অবশ্য চার সিটির নির্বাচনের পর সরকারের তরফ থেকে জাপার ওপর হেফাজতকেন্দ্রিক চাপ কমেছে।
জাপার কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা জানান, দলের সভাপতিমণ্ডলীর ৪১ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ৩৫ জন ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে দলের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এরশাদকে মহাজোট ছেড়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল। এ অংশটি মনে করে, এখনই মহাজোট না ছাড়লে দেশ পরিচালনায় সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের দায়ভার আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ওপরও পড়বে।
অবশ্য এরশাদ নিজেও দুই বছর ধরে দলীয় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মহাজোট ছাড়ার হুমকি এবং ৩০০ আসনে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রসঙ্গে এবং পদ্মা সেতু প্রকল্প ও পুঁজিবাজারে দুর্নীতি, রেলওয়ে ও হল-মার্ক কেলেঙ্কারিসহ দেশ পরিচালনায় সরকারের ‘সীমাহীন ব্যর্থতা’ নিয়ে সমালোচনামুখর ছিলেন।
জাপার নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করছে, সদ্য সমাপ্ত চার সিটি নির্বাচনের ফলাফলে সরকারের বিরুদ্ধে যে মনোভাবের প্রকাশ ঘটছে, তা আমলে না নিয়ে স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিলে দল ভেঙে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। চার সিটি নির্বাচনের পরদিন রাতে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে জাপার কেন্দ্রীয় এক নেতার বাসায় অপর একজন নেতা প্রকাশ্যেই এ আশঙ্কার কথা বলেন।
গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে শরিক হয়ে জাপা ২৭টি আসনে জয়ী হয়। দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের সরকারের মন্ত্রিসভায় আছেন। এ সময়ে এরশাদ নিজে একটি ব্যাংক ও একটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন নিয়েছেন। জাপার একাধিক প্রভাবশালী নেতা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের ঠিকাদারির কাজ পাওয়াসহ সরকারি আনুকূল্যে একাধিক ব্যবসা পেয়েছেন।
রাজনীতিতে এরশাদের ‘সুবিধাবাদী’ বা ‘সুযোগসন্ধানী’ কৌশলের কথা উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার একজন নেতা বলেন, ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা যেদিকে থাকবে, এরশাদও সেদিকে যাবেন। সেটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো পক্ষ—যা-ই হোক না কেন। এ কারণে এরশাদ এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েছেন।
অবশ্য জাপার মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার দাবি করেন, ‘রাজনীতিতে কেউ চিরশত্রু বা চিরমিত্র নয়। তাই জাতীয় পার্টি দেশের স্বার্থেই উপযুক্ত ভূমিকা নেবে।’

শেয়ার করুন