রাসিক নির্বাচন: উন্নয়ন না রাজনৈতিক পরিবর্তন?

0
66
Print Friendly, PDF & Email

দৃশ্যমান উন্নয়ন নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তন- এমন জটিল হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) ভোটাররা। আর এ হিসাব কষতে গিয়েই স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত এখন পুরো রাজশাহী নগরী।

তাই ১৫ জুনের ভোটকে তারা দেখছেন উন্নয়ন ও উন্নয়নের বিরোধী শক্তির মল্লযুদ্ধ হিসেবে।

তবে সব কিছু ছাড়িয়ে গিয়ে এবারের এ স্থানীয় সরকারের নিদর্লীয় নির্বাচনযে জাতীয় নির্বাচনের মতো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নির্বাচনে পরিণত হয়েছে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তাই কেবল উন্নয়ন বা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, রাজনৈতিক মেরুকরণই হবে ভবিষ্যত নগরপিতার ভাগ্য নির্ধারণের নিক্তি এ কথা বলাই যায়।

২২ বছরের সিটি কর্পোরেশনে রাজশাহীবাসী দু’জন মেয়র পেয়েছেন। তাদের একজন বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু। তিনি দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘ ১৭ বছর। অপরজন সদ্য বিদায়ী মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের মেয়াদ ছিল শেষ চার বছর নয় মাস।

রাজশাহী নগরীতে প্রবেশের পরই যে চিত্রটি চোখে পড়ে, তা হলো আর দশটি শহরের চেয়ে এর দৃশ্যগত ভিন্নতা। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, যানজটমুক্ত খোলামেলা নগরী রাজশাহী। রয়েছে সুপ্রশস্ত রাস্তা ঘাট, সুদৃশ্য রঙ্গিন পাথর বসানো ফুটপাত, শৈল্পিক রোড ডিভাইডার ইত্যাদি।

পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে রাজশাহী নগরীর এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত সুন্দর পর্যটন এলাকাও রয়েছে রাজশাহীতে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে এ এলাকাকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে সুন্দর ওয়াইফাই জোন। এ জোনে যে কেউ যে কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও আপলোড ও ডাউনলোড করতে পারেন দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এখানে হাজার হাজার মানুষের ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধার্থে বানানো হয়েছে সুন্দর শৈল্পিক বেঞ্চ, উন্মুক্ত মঞ্চ। আছে খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্ট।

রাতের রাজশাহীর চিত্র আরো অন্যরকম। সারা শহর ঝলসে ওঠে নানা রঙের রঙ্গিন বাতিতে।  গাছে গাছে বা ল্যাম্পপোস্টে ঝুলে আছে ঝাড়বাতি। নিয়নের আলোর সঙ্গে রঙ্গিন মরিচাবাতির লাফালাফি। রাতের এ শহরে প্রথম এলে মনে হবে, এটা বোধহয় কোনো চানরাত বা বিজয় দিবস বা শব-ই বরাতের রাত। রোড ডিভাইডারগুলো আরো তাক লাগানো। দূর থেকে মনে হয়, তরতাজা সবুজ বাঁশ পেরেক মেরে গেঁথে রাখা হয়েছে অথবা গাছের বাকল দিয়ে তৈরি করা হয়ছে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়, এগুলো বাঁশ বা বাকল কিছুই নয়। সূক্ষ ও শৈল্পিক ভাবে কংক্রিট দিয়েই তৈরি করা হয়েছে এগুলো।

নগরীতে তেমন কোনো ভাঙ্গা রাস্তা নেই। কেবল সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট থেকে রেলগেট বিন্দুর মোড় সড়কটি ছাড়া। এ সড়কটিকে শহরের অন্য সড়কগুলোর মতো ফোর লেনে রুপান্তর ও সরল করতে গিয়ে অনেক বাড়ি-ঘর সরাতে হচ্ছে। যে জায়গাগুলোতে এ কাজ শেষ হয়েছে সেখানে আগেই তৈরি হচ্ছে ফুটপাত ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা। বাড়ি সরাতে গিয়েও নাকি বাড়িওয়ালাদের দেওয়া হয়েছে তিনগুণ টাকা।

কেবল এ সড়কই নয়, রাজশাহীর প্রায় প্রতিটি সড়কেরই একই অবস্থা ছিল। বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে, দোকানপাট সরিয়ে, জমির মালিককে ক্ষতিপূরণ দিয়েই নাকি সব সড়কগুলোকে প্রশস্ত করা হয়েছে।

শহরের কোথাও ময়লা নেই। ময়লা ফেলার স্থানগুলো পদ্মা নদীর পাড় হওয়ায় সে জায়গাগুলোরই উন্নয়ন করা হয়েছে। ভাগাড় এখন পর্যটনস্পট। আর আসল ভাগাড় শহরের বাইরে। পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে তৈরি করা বাঁধে রাতে জ্বলে লাল- নীল-সবুজ বাতি। তৈরি হয়েছে ফুটপাত ও ওয়াকওয়ে। আছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও।

মাস আটেক আগে শিল্প কারখানায় লেগেছে গ্যাস সংযোগ। আবাসিক গ্যাস সংযোগের বয়স ও আট দিন পেরিয়ে গেছে।

এতো কিছুর মধ্যেও কাঁটার মতো বিঁধে আছে কয়েকটি মাদকস্পট ও মাদক পাচার ঘাট। আর সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যেই বিশাল চর থাকায় সেখানকার নির্জনতাকে ব্যবহার করা হয় খুন, গুম আর চোরাচালানির কাজে।

নগরীর এতোসব উন্নয়ন নিয়েও আছে বিতর্ক। গত চার বছর সাত মাসে হয়েছে এ উন্নয়ন- এ দাবি সদ্য বিদায়ী মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের। তার সমর্থকরা ও এমনই দাবি করছেন। তাদের দাবি, গত সাড়ে চার বছরে কেবল সিটি কর্পোরেশনেরই উন্নয়ন হয়েছে ৮০০ কোটি টাকার। আর আগের সতেরো বছরের হিসেব মাত্র ৩০০ কোটি টাকার। আবার নির্বাচিত হলে লিটন আরো চারগুণ উন্নয়ন করবেন বলে কথা দিয়েছেন।

কিন্তু সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু বাংলানিউজকে বলেন, “শহরের যে উন্নয়ন দেখছেন, এর সবই আমার সময়ের এবং চার দলীয় জোট সরকারের করা উন্নয়ন। আমার সময়েই এসব প্রকল্প পাস করা হয়েছিল, একনেকে অনুমোদন হয়ে বাস্তবায়নের পর্যায়ে ছিল।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “দৃশ্যগত যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তা আমিই সংসদ সদস্য থাকাকালে সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলে পরিকল্পনা কমিশনে নিয়েছিলাম। আর এগুলো বাস্তবায়নে সদ্য বিদায়ী মেয়র কেবল লুটপাট করেছেন এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মোটা-তাজা করেছেন।”

মিনু বলেন, “এসবে ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষ এখন পরিবর্তন চান।”

বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলেরও দাবি, “সদ্য বিদায়ী মেয়র কেবল আমাদের আগের মেয়রের উন্নয়ন কাঠামোয় কাপড় পরিয়েছেন।”

তিনি বলেছেন, “কেবল লোক দেখানো উন্নয়ন নয়, নির্বাচিত হলে শহরে ভারী শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে করা হবে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ। গড়া হবে গার্মেন্টস পল্লীসহ নানা শিল্পদ্যোগ।”

আবার সদ্য বিদায়ী মেয়র লিটন দাবি করেছেন, “নগরীর সকল দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রায় শেষ। এখন হাতে থাকা প্রকল্পগুলো শেষ করতে চাই। শিল্প-কারখানায় গ্যাস গেছে। এখন বাড়ি-বাড়ি গ্যাস যাচ্ছে। ঘরে ঘরে গ্যাস পৌঁছানোর পর রাজশাহীতে কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে হবে। প্রস্তাবিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন, প্রাণিসম্পদের ওপর গুরুত্বারোপ, বেকার সমস্যার সমাধানেও ভূমিকা রাখারও সময় হয়েছে।”

অবশ্য সাহেববাজারের একজন অটোরকিশা চালক বললেন, “রাস্তা হয়েছে। রাস্তা দিয়ে কি মানুষ ভাত খাবে?” সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজন যাত্রী বলে উঠলেন, “মেয়রের কাজ কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঁচতলা বিল্ডিং করে দেওয়া?” তখন আবার ওই চালক বললেন, “তবুও পরিবর্তন দরকার। পরিবর্তন না হলে উন্নয়ন হয় না।”

তবে লিটন যে একটু রাশভারী টাইপের জণবিচ্ছিন্ন মেয়র ছিলেন, এ কথা বলছেন অনেকে। এমনকি যারা কেবল তার কুশলাদি জানতে চাইলেই ধন্য হতেন, বাস্তবে তা না ঘটায় তা নাখোশ মেয়রের ওপর।

অন্যদিকে মেয়র প্রার্থী বুলবুল কোনো দিনই কোনো জণপ্রতিনিধিত্ব না করায় তার আছে ক্লিন ইমেজ। আবার মানুষ হিসেবেও আছে বুলবুলের খ্যাতি। তবে হেফাজত ও জামায়াত সংশ্লিষ্টতা তার জন্য ভোগান্তির কারণও হতে পারে বলে ভাবছেন ভোটাররা। এছাড়া ইজিবাইক বন্ধের ঘোষণাও তার জন্য হিতে বিপরীত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, “এবারের ভোটে রাজনীতি কোনো ভূমিকা রাখবে না। এ নির্বাচন হবে উন্নয়নের পক্ষে এবং বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে।”

সাবেক মেয়র মিনু বলছেন, “সারা দেশের অপশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে মহাজোট সরকারকে হলুদ কার্ড দেখাবেন রাজশাহীবাসী।”

তবে বেশির ভাগ ভোটারই মুখ খুলছেন না নির্বাচন নিয়ে। এই মুখ না খোলা বিপুল পরিমাণ ভোটারই গড়ে দেবেন নতুন নগরপিতার ভাগ্য এটা বলাই যায়।

এটাই হলো রাজশাহীর বর্তমান চিত্র। মানুষ হিসাব মেলাচ্ছেন দৃশ্যমান উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া হবে নাকি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আবারো পরিবর্তন? নাকি জাতীয় নির্বাচনের জটিল ছকে বাধা পড়বে রাজশাহীবাসীর ভাগ্য।

শেয়ার করুন