সিলেটে নির্বাচনে সরকারি গাড়ি

0
76
Print Friendly, PDF & Email

সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সিলেট ও আশপাশ জেলার উপজেলা চেয়ারম্যানরা। এটি নির্বাচনী আচরণবিধি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের গাড়ি ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিমালা—দুটিরই লঙ্ঘন।
সিলেট ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যানরা এভাবে নীতিমালা লঙ্ঘন করে নিজ নিজ দলের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নেমেছেন। এই নিয়ম ভাঙার কাজে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থক চেয়ারম্যানরা কেউ কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই।
শুধু গাড়ি ব্যবহার নয়, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রাস্তায় মঞ্চ তৈরি করে সমাবেশ এবং সরকারি সার্কিট হাউসও ব্যবহার করা হচ্ছে।
নির্বাচনী আচরণবিধির ১৪(গ) ধারায় বলা আছে, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো প্রার্থী বা তাঁহার পক্ষের কেহ নির্বাচনী কাজে সরকারি প্রচারযন্ত্র, সরকারি যানবাহন, অন্য কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে ব্যবহার করিতে পারিবেন না।’
উপজেলা চেয়ারম্যানদের বরাদ্দ করা গাড়ি ব্যবহারসংক্রান্ত পরিপত্রে বলা হয়েছে, সাধারণভাবে সরকারি গাড়ি উপজেলার বাইরে ব্যবহার করা যাবে না। তবে সরকারি কাজে জেলা সদরে কিংবা জেলার মধ্যে গাড়ি ব্যবহার করা যাবে। বিশেষ কাজে উপজেলার বাইরে গাড়ি ব্যবহার করতে হলে স্থানীয় সরকার বিভাগের পূর্বানুমতি নিতে হবে।
জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা এস এম এজহারুল হক বলেন, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করা নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাস্তায় মঞ্চ তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা জানা নেই। এখনই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সব দলের নিয়ম লঙ্ঘন: আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান এবং বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে প্রতিদিনই কোনো না কোনো উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। কয়েক দিন ধরে সরেজমিন দেখা গেছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১৪-১৫ জন উপজেলা চেয়ারম্যান নিয়মিত প্রচার অভিযানে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবাই সরকারি গাড়ি নিয়ে নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন।
গতকাল সোমবার বেলা দেড়টায় নগরের তালতলা এলাকায় কামরানের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন খানের সরকারি গাড়ি পাওয়া যায়। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ইকবাল আহমদ দাবি করেন, তিনি রোগী দেখতে গাড়ি নিয়ে সিলেটে এসেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দেননি। কিন্তু তাঁর গাড়িটি দুপুরে সিলেট নগরের তালতলায় কামরানের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে কেন ছিল, এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি।
বিকেলে গুলশান সেন্টার নামে একটি হোটেলের সামনে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেনা বেগমের গাড়ি দেখা যায়। জানতে চাইলে হেনা বেগম বলেন, ‘আমি যাইনি। স্থানীয় এমপি আবদুল মজিদ খান গাড়ি নিয়ে গেছেন। এমপি সাহেবের ড্রাইভার অসুস্থ। তাই আমার গাড়ি নিয়েছেন।’
সাংসদ আবদুল মজিদ খান বলেন, ‘আমি আমার গাড়ি নিয়ে সিলেটে এসেছি। উপজেলা চেয়ারম্যানের গাড়ি অন্য কেউ আনতে পারেন।’
স্থানীয় লোকজন জানান, বদরউদ্দিন আহমদ ও আরিফুল হকের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে প্রতিদিনই উপজেলা চেয়ারম্যানদের গাড়ি দেখা যায়। কয়েক দিন ধরে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অন্তত সাতজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে সরকারি গাড়ি নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাতে দেখা গেছে। তাঁরা হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের আকমল হোসেন, শাল্লার অবনিমোহন দাস, সিলেটের বালাগঞ্জের মোস্তাকুর রহমান, জামালগঞ্জের ইউসুফ আল-আজাদ, বানিয়াচংয়ের ইকবাল আহমদ খান, কোম্পানীগঞ্জের ইয়াকুব আলী (ভারপ্রাপ্ত)।
ইউসুফ আল-আজাদ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, সিলেট বিভাগের সভাপতি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কিংবা চিকিৎসার জন্য সিলেটে আসি। নির্বাচনী প্রচারও করি। তবে গাড়ি দূরে থাকে।’ উপজেলার বাইরে গাড়ি আনা আইনের লঙ্ঘন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপ্যায়ন করারও তো নিয়ম নেই। এটাও তো চলছে। আর নির্বাচনী কাজে গাড়ি নিয়ে এলে নিজের টাকায় তেল কিনে আনি।’
বিএনপি-সমর্থক যেসব চেয়ারম্যান সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন তাঁরা হলেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মিজানুর রহমান চৌধুরী, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ফারুক আহমেদ, সুনামগঞ্জ সদরের দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, সিলেট গোয়াইনঘাটের আবদুল হাকিম চৌধুরী। এ ছাড়া জামায়াত-সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুরের জয়নাল আবেদীন, ফেঞ্চুগঞ্জের সাইফুল্লাহ আল হোসাইন ও সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের আবদুল কুদ্দুস। তাঁরা আরিফুল হকের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।
ফেঞ্চুগঞ্জের সাইফুল্লাহ আল হোসাইন বলেন, ‘আমাদের বাসা-বাড়ি শহরে। আসতে তো হবেই। প্রচার চালানোর সময় গাড়ি ব্যবহার করি না।’
সরকারি সার্কিট হাউস ব্যবহার: নির্বাচনী আচরণবিধিতে প্রার্থী কিংবা তাঁর পক্ষে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সরকারের ডাকবাংলো, রেস্ট হাউস কিংবা সার্কিট হাউস ব্যবহারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু গত রোববার আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহামঞ্চদ নাসিম সিলেট সার্কিট হাউসে ওঠেন। তিনি অবশ্য সেখানে রাত যাপন করেননি। গতকাল সেখানে নাসিমের সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। পরে সেটা তালতলায় বদরউদ্দিনের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়।
আরিফুল হকের পক্ষে প্রচারণায় এসে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনে বিএনপির সাংসদ শেখ সুজাত মিয়া সিলেট সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন।
সার্কিট হাউসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এনডিসি মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনারা রাত যাপন করেননি। শুধু ফ্রেশ হয়ে চলে গেছেন। নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কি না, আমাদের জানা নেই।’
রাস্তায় সভা: নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, জনসাধারণের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এমন সড়কে পথসভা করা নিষিদ্ধ। সড়কে মঞ্চ তৈরি করার ব্যাপারেও বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু গতকাল নগরের শাহী ঈদগাহ্ এলাকায় মূল সড়কের একাংশ দখল করে বদরউদ্দিন কামরানের পক্ষে পথসভা করা হয়েছে।
সড়ক দখল করে জনসভা করায় যান চলাচল করতে পারেনি। অটোরিকশা চালক আবদুল মান্নান বলেন, ‘রাস্তা দখল কইরা সভা করতাছে। গাড়ি নিয়া ওই রাস্তা দিয়া যাইতা পারতাছি না।’ রিকশাচালক ফারুক মিয়া বলেন, ‘রাস্তাঘাট বন্ধ কইরা, গরিবের পেটে লাথি দিয়্যা নির্বাচন কইরা লাভ কিতা?’

শেয়ার করুন